মেইন ম্যেনু

খালেদার নয়া রাজনীতি: হালে পানি পাবে তো?

বিএনপির নতুন কমিটি ঘোষণার পর নেতাদের মধ্যে সৃষ্ট ক্ষোভ ও অসন্তোষকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। আগামি দিনে সরকার বিরোধী আন্দোলনের কথা মাথায় রেখে কমিটির বেশ কিছু পদে পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন বলে অনেকে মতামত দিলেও সে ব্যাপারে আগ্রহ নেই বেগম জিয়ার। খবর রাইজিংবিডি’র।

বরং তিনি দ্রুতই কঠোর পথে যেতে পারেন বলে দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র জানাচ্ছে। নেতারা মনক্ষুন্ন ভাব প্রকাশ অব্যাহত রাখলে ও ‘বাড়াবাড়ি’ করলে হিতে বিপরীত হতে পারে এবং তারা পদও হারাতে পারেন।

দলের কমিটি পুনর্বিবেচনা করার সুযোগ নেই জানিয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘কোনো ব্যক্তি বা কেউ যদি মনে করেন তিনি বঞ্চিত হয়েছেন, তাহলে তার উচিৎ হবে অপেক্ষা করা পরবর্তী কাউন্সিলের জন্য।’

গত ১৯ মার্চ বিএনপির ষষ্ঠ কাউন্সিলে দলের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে চেয়ারপারসন নির্বাচিত করার মাধ্যমে তাকে নতুন কমিটি গঠনের একক ক্ষমতা দেন কাউন্সিলররা। এর প্রায় চার মাস পর গত শনিবার দুটি পদ ফাঁকা রেখে ১৭ সদস্যের স্থায়ী কমিটি, ৭৩ সদস্যের উপদেষ্টা পরিষদ এবং ৫০২ সদস্যের নির্বাহী কমিটি ঘোষণা করা হয়।

কমিটি ঘোষণা হওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন পর্যায়ে ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করে প্রতিক্রিয়া আসতে থাকে। বিশেষ করে পদ অবনমনের বিষয়টি এবার সবচেয়ে আলোচিত হয়ে ওঠে। এছাড়া জেষ্ঠ্যতা লঙ্ঘন করে পদোন্নতি দেওয়ায় অনেকের কাছে তা সম্মান ক্ষুন্ন হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই পরিস্থিতিতে অনেকে নিস্ক্রিয় হওয়ার চিন্তা করেছেন। এরই মধ্যে কমিটি থেকে পদত্যাগ করেছেন ভাইস চেয়ারম্যান মোসাদ্দেক আলী ফালু, সহ-প্রচার সম্পাদক শামীমুর রহমান শামীম। অভিমানে রাজনীতি থেকে বিদায় নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন কেউ কেউ।

অভিযোগ উঠেছে, বিএনপির কোনো মিটিং-মিছিল, কিংবা কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ না করেও কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হয়েছেন বরিশাল কোতোয়ালি থানা বিএনপির প্রাক্তন সভাপতি অ্যাডভোকেট আজিজুল হক আক্কাস। মাত্র ৭ বছর আগে বিএনপির রাজনীতিতে এসে এস সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টুও স্থান পেয়েছেন নির্বাহী কমিটিতে। শুধু বরিশালই নয়, দেশের বিভিন্ন জেলায়ও কমিটি নিয়ে সৃষ্ট ক্ষোভের ঢেউ আছড়ে পড়ছে।

এর অংশ হিসেবে এক সময়ের প্রভাবশালী নেতা মাগুরার প্রাক্তন সাংসদ কাজী সালিমুল হক কামাল বুধবার নির্বাহী কমিটি থেকে পদত্যাগ করেছেন।

পদত্যাগপত্রে কাজী কামাল বলেন, ‘ওয়ান ইলেভেনের সময় বিতর্কিত ভূমিকা রাখা ব্যক্তিকে দলের ভাইস চেয়ারম্যান করা হয়েছে, যিনি গ্রুপিং করে মাগুরা জেলা বিএনপিকে দ্বিধাবিভক্ত করেছেন। স্থায়ী কমিটিতে এমন ব্যক্তিদের স্থান দেওয়া হয়েছে, যাদের সঙ্গে নিজের মানসম্মান ক্ষুন্ন করে রাজনীতি করা সম্ভব নয়। তাই তিনি সদ্য ঘোষিত বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটি থেকে পদত্যাগ করে সরে দাঁড়াচ্ছেন।’

১৯৯৪ সালের সমালোচিত মাগুরা উপনির্বাচনে বিজয়ী হন সালিমুল হক কামাল। ওই সময় তাকে নির্বাচিত করতে ক্ষমতাসীন বিএনপির বিরুদ্ধে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ উঠেছিল। যার প্রেক্ষিতে পরবর্তী সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়। ২০০১ সালের নির্বাচনে একই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। ওই বছর তিনি মাগুরা জেলা বিএনপির সভাপতিও হন।

দলীয় সূত্র বলছে, কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তারকারী একটি সিন্ডিকেট খালেদা জিয়াকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছে, কমিটি নিয়ে যারা বিভিন্ন মাধ্যমে তাদের অসন্তোষের কথা জানাচ্ছেন সেই সংখ্যা খুব বেশি নয়। বিভিন্নভাবে তারা প্রভাবিত হচ্ছেন। তাছাড়া কমিটি গঠনের পর এমন ক্ষোভ হয়েই থাকে। কাউন্সিল গঠনের পর যেহেতু তাকে একক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে সুতরাং কমিটি নিয়ে ক্ষোভ মানে তার সিদ্ধান্তের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ হচ্ছে।

কমিটি গঠনের পর এখন পর্যন্ত সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হচ্ছে স্থায়ী কমিটিতে পদ প্রত্যাশাকারী আবদুল্লাহ আল নোমানের ভাইস চেয়ারম্যান পদ পাওয়া নিয়ে। এ নিয়ে গণমাধ্যমের সামনে সরাসরি তিনি তার অভিমানের কথা জানিয়েছেন। তবে সূত্র বলছে, শ্রমিক দলের কমিটি গঠন নিয়ে সৃষ্ট জটিলতাই তার স্থায়ী কমিটির পদ পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায়।

তখন অভিযোগ উঠেছিলো, শ্রমিক দলের সভাপতি পদে বরিশালের প্রাক্তন মেয়র মজিবুর ‘যোগ্য’ থাকলেও তাকে বাদ দিয়ে ‘নিজেদের অনুগত’ আনোয়ার হোসাইনকে সভাপতি করে নতুন কমিটি গঠনে স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান ও ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমানের হাত ছিলো। এ নিয়ে খালেদা জিয়ার কাছে তখন নালিশও যায়। বিএনপি নেত্রীর কাছে নোমানের ব্যাপারে ভুল বোঝানো হয়েছে বলে দলীয় পরিম-লে কথা ওঠে।

সূত্র বলছে, শ্রমিক দলের ওই কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করেই নোমানের স্থায়ী কমিটির পদ আটকে যায়। আর নজরুল ইসলাম খান আগের কমিটিতে স্থায়ী কমিটির ১০ নম্বর সদস্য থাকলেও এখন তাকে অবনমন করে ১৪ নম্বর সদস্য করা হয়েছে।

বিএনপি নেত্রীর ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, কমিটি গঠন নিয়ে দলের বিভিন্ন পর্যায়ের যেসব নেতা তাদের অসন্তোষের কথা জানাচ্ছেন, সে বিষয়ে খোঁজখবর রাখছেন তিনি। তাঁকে সব তথ্যই জানানো হচ্ছে। এ নিয়ে খালেদা জিয়া এখনও কোনো ধরনের মন্তব্য না করলেও শিগগিরই তিনি এ বিষয়ে তার কঠোর মনোভাবের কথা জানাতে পারেন। কমিটির ব্যাপারে পুনর্মূল্যায়নের কোনো বিষয়ই ভাবা হচ্ছে না বলে জানান ওই নেতা।

কমিটি নিয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘কাউন্সিলে কাউন্সিলররা সর্বসম্মতিক্রমে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে দলের কার্যনির্বাহী কমিটি গঠনের দায়িত্ব দিয়েছেন। সেই দায়িত্ব নিয়ে তিনি (খালেদা জিয়া) পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করেছেন। এই কমিটিকে নিয়ে বিএনপি আগামী তিন বছর রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করবে।’

তিনি বলেন, ‘প্রতিটি রাজনৈতিক দলের যখন একটা কমিটি করা হয়, তখন দেখা যায় সেখানে কিছু যোগ্য মানুষও পদবঞ্চিত হচ্ছেন। এটা স্বাভাবিক যে, এতো যোগ্য লোক থাকেন যে, সবাইকে স্থান দেওয়া সম্ভব হয় না। সেই দিক থেকে বিএনপিতে স্বাভাবিকভাবে সবাইকে একমোডেট করা সম্ভব হয়নি আমাদের চেয়ারপারসনের পক্ষে।’

‘কাউন্সিল দ্বারা ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়ে উনি (খালেদা জিয়া) যাদেরকে দায়িত্ব দিয়েছেন, তারা বিএনপির আগামি তিন বছরের যে কাজ, সেই কাজগুলো সুচারুরূপে পালন করতে পারবেন, এটা তিনি মনে করেন,’ বলেন ফখরুল।

মির্জা ফখরুল বলেন, ‘কেউ বাদ পড়তেই পারেন। সবাইকে স্থান দেওয়া সম্ভব তো নয়। এটা হতেই পারে। একটা দলের মধ্যে শত শত হাজার হাজার যোগ্য লোক আছেন, তাদের সবাইকে তো আর যুক্ত করা সম্ভব না।’

তিনি বলেন, ‘বিক্ষোভ করে কোনো লাভ হবে না। আর ধৈর্য তো ধরতেই হবে। কারণ, শেষ কথা বলতে কিছু নেই। সব সময়ই পরবর্তনের একটা বিষয় থাকে।’






মন্তব্য চালু নেই