মেইন ম্যেনু

গণতন্ত্রের চেহারা দেখে গণতন্ত্র হাসে

আমরা জানি, বর্তমান বিশ্বে রাষ্ট্র পরিচালনায় যতগুলো ‘মন্ত্র-তন্ত্র’ বা ‘পদ্ধতি’ প্রচলিত রয়েছে, তার মধ্যে গণতন্ত্র সবচেয়ে জনপ্রিয় পদ্ধতি। হাতেগোনা কয়েকটি দেশ ছাড়া বিশ্বের প্রায় সব দেশই এই গণতন্ত্র চর্চা করছে। হতে পারে এর রকমফের। এক সময়ের সমাজতন্ত্র, রাজতন্ত্র, স্বৈরতন্ত্র বা একনায়কতন্ত্রের ব্যর্থতার ওপরই প্রতিষ্ঠা পাওয়া গণতন্ত্রের আজ জয়জয়কার অবস্থা।
আর আব্রাহাম লিংকনের ভাষায় “Democracy is the government of the people, by the people, for the people” । গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে আরেকটু খোলাসা করলে বলা যায়, জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে রাজনৈতিক দল গঠিত হয়, জনগণের ভোটের মাধ্যমে কোনো একটি বা একাধিক দল সরকার গঠন করে, আর বাকি দলগুলো সরকারকে সঠিক পথে রাখতে গঠনমূলক সমালোচনায় লিপ্ত থাকে।
এছাড়া সরকারকে সঠিক পথে রাখতে এবং জনগণের অধিকার নিশ্চিত করতে আইন-আদালত, সংসদ, গণমাধ্যম, সুশীল সমাজ এবং বিভিন্ন বেসরকারি সামাজিক উন্নয়ন সংগঠনগুলো কাজ করে। আর এসব প্রক্রিয়াকে গতিশীল রাখতে গণতন্ত্রে তাই রয়েছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষোভ প্রকাশের সুযোগ এবং সভা-সমাবেশের অধিকার। এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকা ও ওশেনিয়ার প্রায় সব দেশে এ প্রক্রিয়াতেই গণতন্ত্র কার্যকর ও চর্চা রয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে কোন প্রক্রিয়ায় কার্যকর সেটা অবশ্য প্রশ্নবিদ্ধ বিষয়।
বলা যায়, বর্তমানে বাংলাদেশের ‘গণতন্ত্র’ এর ন্যায় পৃথিবীর আর কোথাও এমন বিরল প্রজাতির গণতন্ত্র খোজেঁ পাওয়া যাবে কী না তা আমার জানা নেই। যেখানে সরকার-বিরোধী দল একাকার, আইন-শাসন ও বিচার বিভাগের অভিনবত্ব রূপ, আমলাদের অনাধিকার রাজনৈতিক চর্চার অভিনবত্ব একবারেই নজিরবিহীন।
প্রসঙ্গত: আমার বৃটেন প্রবাসী বন্ধু সুমনের সাথে মাঝেমধ্যেই কথা হয়। প্রসঙ্গক্রমে একদিন উঠে আসে দু’দেশের রাজনীতি ও গণতন্ত্রের বিষয়। এক পর্যায়ে তিনি বলেন- সেদেশের নাগরিকরা আমাদের গণতন্ত্রের চরিত্র দেখে হাসে। অবশ্য হাসারই কথা। যেখানে সরকারের তলবিবাহক বিরোধ দল।
গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মডেল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিংবা যুক্তরাজ্যের কথা না হয় বাদই দিলাম, আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের কথাই ধরি। জনসংখ্যায় বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অবস্থানে থাকা ভারত আজ শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অন্যতম উদাহরণ। জনগণের ভোটাধিকার, গঠনমূলক রাজনীতি চর্চা, সরকারের জবাবদিহীতা, বিরোধী মতের প্রতি শ্রদ্ধা, গণমাধ্যমের অবাধ স্বাধীনতা, কার্যকর সংসদ, স্বাধীন বিচারব্যবস্থাসহ গণতন্ত্রের সব উপকরণই মোটামুটি কার্যকর বলা যেতে পারে। ভাষা ও সংস্কৃতির ব্যাপক বৈচিত্রতা থাকা সত্ত্বেও ভারতে আজ গণতন্ত্র অনেকটাই সফল রুপ লাভ করেছে। সুষ্ঠু নির্বাচন প্রক্রিয়ায় ক্ষমতার পালা বদলেও অনন্য নজির এই দেশটি।
বিশ্বের বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের প্রতিবেশী আমাদের এই বাংলাদেশ। আমাদের দেশেও গণতন্ত্র আছে; কিন্তু সেটা শুধু আক্ষরিক অর্থেই। ঠিক তেমনই, যেমন- ‘কাজীর গরু কিতাবে আছে কিন্তু গোয়ালে নেই’। আমরা এমন এক বিরল প্রজাতির গণতন্ত্র চর্চা করছি- যেখানে বিরোধীদল ও মতকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অনুমতি না দিয়ে সন্ত্রাসে উৎসাহিত করছি। জনগণের সেবক আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে লেলিয়ে দিচ্ছি জনগণের বিরুদ্ধে। নির্বাচন প্রক্রিয়াকে সুষ্ঠু না করে প্রতিনিয়ত নির্বাচন ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে চলেছি আমরা। আর সুশীল সমাজ ও সাংবাদিকদের গায়ে লাগিয়ে দিয়েছি রাজনীতির তকমা। যাতে ওরা সক্রিয়ভাবে প্রকৃত গণতন্ত্র চর্চা না করতে পারে।
এরপরও আজ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় যা ঘটছে তার সবই কিন্তু চলছে গণতন্ত্রের নামে। গণতন্ত্রের মাধ্যমে বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলো শান্তি ও সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জনগণ স্বস্তি খুঁজলেও আমরা যেনো আজ গণতন্ত্রকে গলাটিপে হত্যার চেষ্টা করছি। ফলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় গণতন্ত্রের আজ নাকানি-চুবানি অবস্থা। আমরাই আজ গণতন্ত্রকে এক ব্যর্থ ‘তন্ত্র’ হিসেবে প্রমাণিত করতে চলেছি। যাক এসব গুরু তথ্যের কথা, এবার আসি বাংলাদেশী গণতন্ত্রের সর্বশেষ মহারণের দিকে।
আমরা জানি, সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য বিরোধী দল অপরিহার্য।এখানে বিরোধী দল যত বেশী শক্তিশালী হয় সরকার তত কার্যকর ও সুশাসন নিশ্চিত করতে পারে।কিন্তু আমাদের দেশের বর্তমান বিরোধী দল কতটা অর্থবহ তা ভাববার সময় এসেছে।
ক’দিন আগে জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় এক নেতার ‘বিশেষ বক্তব্য’ শোনার পর থেকে হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। তাহলে দেশে গণতন্ত্রের নামে কি হচ্ছে? আসলে দেশের অবস্থান কোন দিকে গড়াচ্ছে?
গত ১৬ জুন (২০১৫-১৬) অর্থ বছরের বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী ফিরোজর রশিদ বলেন, ‘আমার দলের চেয়ারম্যান, তিনি আবার মন্ত্রি মর্যাদায় রয়েছেন। এটা থেকে রেহাই চাই। জাতীয় পার্টি একটি বড় দল। আমাদের দলটাকে বাঁচতে দেন।’
স্পিকারের উদ্দেশ্য তিনি আরোও বলেন, ‘মাননীয় স্পিকার আমরা কি সত্যিকারের বিরোধী দল? আমি একসময় বেশি টকশোতে যেতাম। এখন কম যাই। মানুষ বলে তোমরা কেমন বিরোধী দল। লাউয়ের আগাও খাবা, গোড়াও খাবা। আমি আপনার কাছে এই প্রশ্নের জবাব চাই। কি করলে আমরা সত্যিকারের বিরোধী দল হব।’
এর আগে গেল বছরের ২২ অক্টোবর জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হুসেইন মুহমামদ এরশাদ স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী সিপিএ’র চেয়ারপার্সন ও সাবের হোসেন চৌধুরী আইপিইউ’র সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন বার্তায় বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর কারণে বাংলাদেশের পরিচয়, তেমনি একজন শেখ হাসিনার কারণে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের পরিচয়।‘
‘অতিউচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন এই দু’টি আন্তর্জাতিক সংগঠনের সর্বোচ্চ পদের নির্বাচনে বাংলাদেশের দু’জন সম্মানিত প্রার্থীর বিজয় বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এই বিজয় শুধু বাংলাদেশের দু’জন প্রার্থীরই বিজয় নয়, এই বিজয় প্রধানমন্ত্রীর মতো একজন সুদক্ষ- দৃঢ়চেতা- সাহসী এবং সৎ রাষ্ট্রনায়কের আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে গগনচুম্বী ভাবমূর্তিরই বিজয়। এই বিজয় বাংলাদেশের গণতন্ত্রের বিজয়।’
এরশাদ একনায়কতন্ত্রের রাজদরবার- ছাড়ার পরও মূলধারার রাজনীতিতে এখনও সক্রিয়। এখনও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত। বিশ্বের অন্য স্বৈরশাসকেরা কি তা কখনো ভাবতে পারেন?
বরাবরই স্বৈরাচারী শাসকরা ধরার বুকে অসাম্য ও অন্যায়ের দাবানলে দ্বগ্ধ করে বণী আদমকে পদপিষ্ট করে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে চরম নিষ্ঠুরতম পথ বাছাই করে নেয়। ফলেস্বৈরাচারী কোন শাসক যখন একটি জনবসতির উপর কর্তৃত্ব লাভ করে তখন তারা সেই জনপদের মানুষদের সবকিছু তথা সব নিয়ম-নীতি ধ্বংস করে ফেলে। তাই আজ Lord Acton এর সেই বিখ্যাত উক্তি -Power tends to corrupt and absolute power corrupts absolutely এর কথা স্মরণে পড়ে।

কলাম লেখক, শিক্ষা ও সমাজবিষয়ক গবেষক। ই-মেইল:[email protected]






মন্তব্য চালু নেই