মেইন ম্যেনু

গুলশান হামলা: অপারেশনের নেতৃত্বে ছিল রোহান

হলি আর্টিজানে হামলা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনার নেতৃত্বে ছিল রোহান ইমতিয়াজ। সে রেস্তরাঁর সিকিউরিটি গার্ড হায়দারকে প্রথম আক্রমণ করে। তার মুখে পিস্তলের বাঁট দিয়ে আঘাত করে মাটিতে ফেলে দেয়। এরপর ফাঁকা গুলি ছুড়তে ছুড়তে রেস্তরাঁর ভেতরে প্রবেশ করে। রোহানের আগেই ছয় জঙ্গি সদস্য দুজন করে খদ্দের বেশে ভেতরে প্রবেশ করে অবস্থান নেয়। পরে তারাও অস্ত্র বের করে জিম্মি করে ফেলে সবাইকে। জিম্মি ঘটনার পর উদ্ধার করা ১৩ জিম্মি ও রেস্তরাঁ কর্মচারীদের কাছ থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। জিম্মি ঘটনার অবসান হওয়ার পর থেকেই মিন্টো রোডের গোয়েন্দা কার্যালয়ে নিয়ে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট ও ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার রাত ৮টার দিকে গুলশানের-২ নম্বর সেকশনের ৭৯ নম্বর সড়কের ৫ নম্বর প্লটের হলি আর্টিজান বেকারি নামে ওই রেস্তরাঁয় উপস্থিতদের জিম্মি করে সাত অস্ত্রধারী জঙ্গি। এর কয়েক মিনিট আগে জঙ্গিদের দুজন দুজন করে রেস্তরাঁর খদ্দের হিসেবে প্রবেশ করে। সবার শেষে এগিয়ে যায় লম্বা এক তরুণ। যার ছবি দেখিয়ে পুলিশ রোহান ইমতিয়াজকে শনাক্ত করেছে। হাতে অস্ত্র নিয়ে রোহান ওই রেস্তরাঁয় প্রবেশ করে। হলি আর্টিজান রেস্তরাঁর দোতলা ভবনের সামনে একটি টালির ছাউনি দেয়া কফিঘর ছিল। সেখানেই গেটে দায়িত্ব পালন করছিলেন দারোয়ান হায়দার। অস্ত্র হাতে রোহান দারোয়ান হায়দারকে আঘাত করে। মুখে আঘাত লাগায় মাটিতে পড়ে যান হায়দার। এর পরপরই ফাঁকা গুলি ছুড়তে ছুড়তে ভবনের মূল দরজার দিকে এগিয়ে যায় রোহান। খবর: মানবজমিন

সূত্র জানায়, রোহান রেস্তরাঁয় প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে অপর জঙ্গিরাও অস্ত্র বের করে জিম্মি করে ফেলে সবাইকে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা রেস্তরাঁর দেশি-বিদেশি খদ্দেরদের এক জায়গায় করা হয়। রেস্তরাঁর বাইরের লেকের দিকের লনে তিনটি বসার টেবিল-চেয়ার পাতা ছিল। সেখানকার একটি টেবিলে বসে ছিলেন দুই বিদেশি নাগরিক। গুলির শব্দে তারা মাথা নিচু করে ছিলেন। অস্ত্রধারীরা তাদেরও রেস্তরাঁর নিচতলায় নিয়ে যায়। আনা হয় দ্বিতীয় তলায় বসা সবাইকে। হোটেলের ওয়েটার-কর্মচারীসহ সবাইকে বলা হয় তাদের কথামতো চললে কারো কিচ্ছু হবে না। পরবর্তীতে দেশি-বিদেশিদের আলাদা করে রাখা হয়। সবাইকে চেয়ার-টেবিলে বসিয়ে দুই হাত টেবিলে রেখে মাথা ঠেকিয়ে বসে থাকতে বলা হয়। কেউ মাথা তুললেই তাকে গুলি করে হত্যা করা হবে বলে হুমকি দেয় জঙ্গি সদস্যরা।

সূত্র জানায়, এর মাঝে পুলিশ পরপর দুইবার অ্যাকশন নেয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। দোতলা থেকে পুলিশকে লক্ষ্য করে গ্রেনেড নিক্ষেপ করে অস্ত্রধারীরা। সঙ্গে মুহুর্মুহু গুলি। জঙ্গিদের কাছ থেকে যে একে ২২ অ্যাসল্ট রাইফেল উদ্ধার করা হয়েছে সেটি থেকে প্রতি সেকেন্ডে ৫০-৬০ রাউন্ড গুলি বের হয়। পুলিশ ফিরে গেলে দেশি নাগরিকদের নেয়া হয় দ্বিতীয় তলায়। আর বিদেশি নাগরিকদের রাখা হয় নিচ তলায়। জঙ্গি সদস্যরা বিদেশিদের সঙ্গে স্পষ্ট কথা বলে।

জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে সংশ্লিষ্ট ওই সূত্র জানায়, অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা প্রথম যখন ফাঁকা গুলি ছুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে তখনই রেস্তরাঁর কর্মচারীসহ কিছু অতিথিও বের হয়ে যান। রেস্তরাঁর বাইরের লনে এ্যাপোলো হাসপাতালে চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত ভারতীয় এক নাগরিকও ছিলেন। তিনি পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। এছাড়া অনেকেই পড়িমরি করে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। অনেকেই দোতলা থেকে লাফিয়ে পড়েন। কেউ বাথরুমে গিয়ে আত্মগোপন করেন। মিরাজ, সবুজ, আশরাফসহ কয়েকজন ছিলেন ভেতরেই। জঙ্গিদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি হয়ে, অন্যসব অতিথির সঙ্গে।

জিজ্ঞাসাবাদকারী ওই সূত্র জানায়, জঙ্গিরা দেশীয় নাগরিকদের সঙ্গে ভালো আচরণ করেছে। জঙ্গিরা তাদের কাছে কোরআন- হাদিসের বিভিন্ন ‘ছবক দিয়ে’ মদ খাওয়া এবং পার্টিতে না যাওয়ার জন্য পরামর্শ দেয়। নিয়মিত নামাজ আদায় করা এবং কোরআন- হাদিসের আলোকে চলার জন্য বলে তাদের। শিশু ও দেশীয় নারী নাগরিকদের সঙ্গে ভদ্র আচরণ করে জঙ্গি সদস্যরা। হোটেল কর্মচারীদের মাধ্যমে বাংলাদেশি নাগরিকদের সেহরিও খাওয়ানো হয়। পরে সবাইকে বাধ্যতামূলক নামাজ আদায়ের জন্য বলা হয়। জঙ্গিরা নিজেরাও রোজা রাখার জন্য সেহরি খেয়ে নেয়। নিজেরাও আদায় করে নেয় নামাজ। বাংলাদেশিদের তারা বলে, তারা ইসলামের জন্য জিহাদের খাতায় নাম লিখিয়েছে। কাফের-মুশরেকদের হত্যার মাধ্যমে সারা পৃথিবীতে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা তাদের ঈমানি দায়িত্ব। এ জন্য মারা গেলে তারা শহীদ হবে। তাদের জন্য বেহেস্ত প্রস্তুত হয়েছে। মুসলিমদের সঙ্গে তাদের বেহেস্তে দেখা হবে বলেও জঙ্গিরা জানায়।

সূত্র জানায়, জঙ্গিরা দেশি নাগরিকদের কলেমা পড়তে পারে কিনা তা জানতে চায়। দেশি নাগরিকদের মধ্যে তিন জন কলেমা পড়তে পারেনি বলে তাদের হত্যা করা হয়েছে বলে ওই সূত্র জানিয়েছে। তবে অপর একটি সূত্র জানায়, দেশি নাগরিকদের মধ্যে ফারাজ আইয়াজ হোসেন। তাকে জঙ্গিরা চলে যেতে বললেও সে তার দুই বন্ধু অবিনতা কবির ও ভারতীয় নাগরিক তারুশি জৈনকে ছেড়ে যেতে চায়নি। একারণে তাকেও হত্যা করেছে জঙ্গিরা। সূত্র জানায়, সকালে যখন সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে অপারেশন থান্ডারবোল্ট শুরু হয়, তখন জিম্মি দেশি নাগরিকদের বাইরে বেরিয়ে চলে যেতে বলে অস্ত্রধারী জঙ্গিরা। এসময় সবাই একে একে বেরিয়ে আসে ভেতর থেকে। পরে সেনা সদস্যরা তাদের উদ্ধার করে দ্রুত নিরাপদে সরিয়ে নেয়। এরপর থেকে জঙ্গিরা সেনা কমান্ডোদের সঙ্গে পাল্টা আক্রমণও চালানোর চেষ্টা করে।

জঙ্গিদের অস্ত্র ও গ্রেনেড ছিল অত্যাধুনিক: ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ও কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জঙ্গিদের প্রত্যেকের কাছে ৭ দশমিক ৬২ বোরের অস্ত্র ছিল। একটি একে- ২২ অ্যাসল্ট রাইফেল ছিল তাদের কাছে। গুলি ছিল অসংখ্য। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র বলছে, জঙ্গিরা অন্তত ৪ থেকে ৫শ’ রাউন্ড গুলি ছুড়েছে। জঙ্গিদের ছোড়া অনেক গুলির দাগ লেকভিউ ক্লিনিকের দেয়ালে রয়েছে।

সূত্র জানায়, তাদের কাছে অন্তত ৮-১০টি গ্রেনেড ছিল। পুলিশের দুই দফা চেষ্টায় তারা দুটি গ্রেনেড ছুড়ে। চারটি অবিস্ফোরিত গ্রেনেড উদ্ধার করা হয়। ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট চলার সময় কয়েকটি গ্রেনেডের বিস্ফোরণ হয়।’ প্রাথমিক তদন্তে গ্রেনেডগুলো অনেক শক্তিশালী জেলসম্পন্ন ছিল বলে জানা গেছে। এসব গ্রেনেডের স্প্লিন্টার শরীরে বিদ্ধ হলে অপরদিকে বের হয় না। শরীরের ভেতরে প্রবেশ করামাত্রই ছড়িয়ে পড়ে।

সূত্র জানায়, কিছুদিন আগে জয়পুরহাট ও বগুড়া থেকে উদ্ধার করা গ্রেনেডের সঙ্গে এসবের কিছুটা মিল রয়েছে বলে জানা গেছে।

সুরক্ষিত এলাকায় অস্ত্র গেলো কিভাবে? কাউন্টার টেরোরিজম ও ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, গুলশানের কূটনৈতিকপাড়ায় সুরক্ষিত এলাকায় জঙ্গিরা অস্ত্র ও গ্রেনেড নিয়ে গেলো কিভাবে সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করছেন তারা। তাদের ধারণা, জঙ্গিরা কোনভাবে অস্ত্র-গ্রেনেডের ব্যাগটি গুলশানের কোনো সুরক্ষিত স্থানে রেখে দেয়। পরে তারা কূটনৈতিক পাড়ায় প্রবেশ করে। কারণ কূটনৈতিক এলাকার প্রায় প্রতিটি সড়কে পুলিশের চেকপোস্ট ও তল্লাশির ব্যবস্থা রয়েছে।

সূত্র বলছে, তারা পুরো গুলশান এলাকার প্রতিটি সিসিটিভির ভিডিওচিত্র বিশ্লেষণ করছেন। জঙ্গিরা একটি গাড়িতে করে ওই রেস্তরাঁর সামনে যায় বলেও তাদের কাছে তথ্য রয়েছে। তবে বিষয়টি তারা নিশ্চিত হতে পারেননি।






মন্তব্য চালু নেই