মেইন ম্যেনু

গেয়েই যেতে হবে মুক্তির গান

দেশ শত্রুমুক্ত হয়েছে। ভারতের শরণার্থী শিবির এবং মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে ঘুরে ঘুরে ‘মুক্তির গান’ শুনিয়ে এবার নিজ দেশে ফেরার পালা। দখলদারমুক্ত নিজের দেশে ট্রাকে করে ফিরছিলো ‘বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রামী শিল্পী সংস্থা’। ট্রাকটিতে পতপত করে উড়ছে মানচিত্র খচিত লাল-সবুজের পতাকা, ট্রাকের গায়ে জড়ানো লালসালুর ব্যানারে লেখা ‘জয় বাংলা’।

সেই স্মরণীয় মুহূর্তের দৃশ্য ধার‌ণ করেছিলেন মার্কিন সাংবাদিক লিয়ার লেভিন। আগের কয়েক মাস ‘বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রামী শিল্পী সংস্থা’কে অনুসরণ করে আরো অনেককিছু ধারণ করেন তিনি। পরে এই দৃশ্যগুলো দিয়ে তৈরি তারেক মাসুুদের ‘মুক্তির গান’-এ দেখা যায়, সেই ট্রাকে চেপে জয় বাংলা গানের সুরে শিষ বাজাতে বাজাতে ফিরছেন একাত্তরের শব্দ সৈনিক তারিক আলী। ভারী ফ্রেমের চশমায় ঢাকা তার চোখে জ্বলজ্বল করছিলো নতুন স্বপ্ন কিংবা নতুন দিন শুরুর প্রত্যাশা।

কিন্তু আজ ৪৫ বছর পরও তার সেই প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় আক্ষেপ প্রকাশ করে চ্যানেল আই অনলাইনকে তিনি বলেন, ‘আমাদের স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে। দ্বিজাতি তত্ত্বের বিষ দূর করে এদেশকে অসাম্প্রদায়িক দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য অস্ত্রে-কণ্ঠে আমরা লড়েছিলাম। প্রত্যাশার সেই জায়গাটি থেকে দেশ যখন সরে যায় তখন হতাশ হই, আফসোস করি।’

চিন্তা, মানবিকতা এবং স্বকীয় রুচিবোধ জাগবে এই আশায় সংস্কৃতি কর্মীরাও যুদ্ধক্ষেত্রে বীরত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা ভৌগলিক-অর্থনৈতিকভাবে কিছুটা মুক্তি পেয়েছি। কিন্তু চিন্তার, মানবিকতার মুক্তি আসেনি। ধর্মান্ধতা চেপে আছে এখনো সেই আগের মতোই।’

তাই ‘মুক্তির গান চলছে, চলবে। আরও কয়েক প্রজন্মকে হয়তো এই গান গেয়ে যেতে হবে। তবেই আসবে মুক্তি। সত্যিকারের মুক্তি।’

ধর্মান্ধতা বাংলাদেশকে ভুল দিকে নিয়ে যেতে পারে। এই আশঙ্কার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ধর্মান্ধতা দেশকে ধ্বংস করে দেয়। পৃথিবী বিজ্ঞানমনষ্ক হচ্ছে। চিন্তার গোঁড়ামীর দেয়াল ভেঙে বেরিয়ে আসছে। আমাদের দেশেও এই অগ্রযাত্রার ছোঁয়া লাগতেই হবে। যাদের লাগেনি তারা পাকিস্তানের মতো ব্যর্থ হচ্ছে।’

সংগীত চর্চা করে শিল্পী না হয়ে বরং সংগীত প্রসারেই মনোযোগ দিয়েছেন তারেক আলী। দেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে ধর্মান্ধতা স্পষ্ট হলেও এখনই হতাশ হতে চান না তিনি। বরং সাংস্কৃতিক লড়াই চালিয়ে যাওয়া উচিৎ জানিয়ে তিনি বলেন,‘ বাঙালির শেকড়ে আছে অসাম্প্রদায়িকতা, তাই ধর্মান্ধতার স্থান বাংলাদেশে হবে না।’

১৯৭১ সালের মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থীদের গানে গানে সাহস যোগানো মানুষ তারিক আলী। ১৯৯৫ সালে নির্মাতা তারেক মাসুদের ‘মুক্তির গান’ চলচ্চিত্রে লিয়ার লেভিনের ধারণ করা দৃশ্যের বর্ণনায় নেপথ্য কণ্ঠটিও তার।

যেখানে তিনি যুদ্ধ শেষে বলছেন,‌ ‘যুদ্ধ শেষ, দেশ স্বাধীন। বিজয় উল্লাস আর উৎসবের এই আনন্দ মুহূর্তে আমার মনে পড়ছে সেইসব মুক্তিযোদ্ধাদের চেহারা। সেই বালক যোদ্ধার দৃঢ় প্রতিজ্ঞ চাহনি। মনে পড়ছে বৃদ্ধ সেই কৃষক মুক্তিযোদ্ধার কথা। আমি কোনোদিন ভুলবো না গামছা মাথায় সেই স্বাধীনতার সৈনিককে যার সাহসিকতা ছিলো কিংবদন্তির মতো। কোনোদিন ভুলবো না অকুতোভয় সেই বীর শহীদদের। যারা প্রাণ দিয়েছিলো বিজয় ছিনিয়ে আনতে।’

ওই ধারা বর্ণনায় ভবিষ্যৎ বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য বাস্তবায়নে তার কণ্ঠে শোনা যায়: এই মহৎ আত্মদানের কথা মনে রাখাই কি যথেষ্ট? প্রশ্ন তবু থেকে যায়। আমরা কি পারবো তাদের আত্মত্যাগের মর্যাদা রাখতে? আমরা কি পারবো তাদের সেই মহান লক্ষ্যকে সমুন্নত রাখতে?






মন্তব্য চালু নেই