মেইন ম্যেনু

গোধূলিবেলায়ও বুঝতে কষ্ট হলো না একসময় কী রূপটাই না ছিল ইনার!

আমি গেরস্ত ঘরের মেয়ে। আমার মা ছিল বেদেবহরের সেরা সুন্দরী। আর আমার বাপও ছিল সেরাম! আমারে দেইখে বুঝো না—কিরাম ছিল আমার বাপ-মা?’ গর্বের সঙ্গেই বললেন সাভার বেদেপাড়ার ৭০ ছুঁই ছুঁই বৃদ্ধ রিজিয়া খাতুন। খুনখুনে বুড়িই বটে। তবু ভাঁজপড়া মুখের রং কুয়াশাচ্ছন্ন গোধূলিবেলায়ও বুঝতে কষ্ট হলো না একসময় কী রূপটাই না ছিল ইনার! মুখে একটা পান পুরে খুললেন স্মৃতির ঝাঁপি— ‘আমার মা জমিলা খাতুন ছিলেন নরসিংদীর বামুনদির বেদে সর্দারের মেয়ে। রূপেগুণে সবার সেরা। হলে কী হবে? নৌকায় নৌকায় জীবন। আর সবার মতো জাতের কর্ম। না শিখলে না করলে চলবে কেন? সেবার বেদেবহর গিয়ে ভিড়ল ভোলার শাহবাজপুর।

দিন শেষে পুঁটলি মাথায় করে মা যখন ফিরছিল নৌকায়, তখন নদীর পাড়ে তেনার মানে আমার বাপের সঙ্গে দেখা। কপালে থাকলে মনের মিল হইতে দেরি হয় না! তারপর বাপ আমার চৌদ্দপুরুষের ভিটে ছাইড়ে বৈঠা হাতে ওঠল নায়। নানা আমার সর্দার মানুষ। বাপেরে চিনতে দেরি হয় নাই তার। নৌকা চলল উজান ঠেইলা নরসিংদীর উদ্দেশে। সুখের সংসার আছিল আমার বাপ-মায়ের। দাদারা গেরস্ত হইলেও যাওয়া-আসা আছিল।’ —‘বাবা-মায়ের কথা তো অনেক বললেন। এবার নিজেদের কথা বলেন।’ পানের রস গিলে নিয়ে সুন্দর করে হাসলেন রিজিয়া খাতুন। বুঝিবা মনে পড়ে গেল নতুন ভরা বর্ষার নদীর মতো উত্তাল সেই যৌবনের কথা। ‘২২০ টাকা বানে এছাক মিয়ার সাথে আমার বিয়ে হইছিল। ব্যাবার দিছিল বড় একটা পিতলের ঠিল্লা, একটা বদনা।’ ‘আপনারাও কি নিজেরাই একজন আরেকজনকে পছন্দ করেছিলেন?’ প্রশ্নটা শুনে তিনি এমন লাজুক হাসি হাসলেন যে উত্তরটা আর মুখ ফুটে বলার দরকার পড়ল না। হয়ও তাই। বেদেদের মুক্ত-স্বাধীন বিচরণশীল জীবনে বাঁধন খুব কম। মাটিতে যাদের শিকড় বসে না তাদের আবার বাঁধন কী। উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েরা একজন আরেকজনকে পছন্দ করে। বড়দের কানে কথাটা যায়। সমাজের দশজন বৈঠকে বসে।

মেয়েরা রোজগার জানে, তাই মেয়ের বাপ খালি খালি মেয়েকে হাতছাড়া করবে কেন? ঠিক হয় বান। ভদ্রসমাজে যাকে বলে পণ বা দেনমোহর। বান ধার্য হলে বৈঠকে উপস্থিত গণ্যমান্যরা একসঙ্গে যায় নিকটতম বাজারে। তারপর দরকারি বাজার-সদাই শেষে কোনো হোটেলে বসে মিষ্টমুখ করে। ব্যস! বিয়ের মূল কাজ হয়ে গেল। তারপর আর কোনো খাবারদাবারের আয়োজন নেই। বিয়েবাড়িতে একটা গেট হবে। সেখানে নাচ-গান হইচই হবে। সেটা দুই দিন বা তিন দিন ধরেও হতে পারে। বিয়েতে কাজি জরুরি না। রেজিস্ট্রেশন বা কাবিননামাও জরুরি না। মসজিদের ইমাম এসে কবুল পড়িয়ে দেবেন। তাতেই হলো। মুসলিম বেদের এই হলো বিয়ের রেওয়াজ। বিয়েথা বেদেপাড়ায় হয় বছরে একবার। কোরবানি ঈদের পর।

সারা বছর বেদেরা থাকে বাইরে বাইরে। দেশের সীমানা পার হয়ে কেউ কেউ পাড়ি জমায় ভারতেও। কোরবানির ঈদ সামনে রেখে সবাই বাড়ির পথ ধরে। পাড়ায় তখন মিলনমেলা বসে যায়। আর সেই মিলনমেলায় জমে ওঠে বিয়ে-শাদির জমজমাট আসর। ছাড়াখাড়াও হয় ওই একই সময়ে। সাভার বেদেপাড়ার উঠতি যুবক নূর আলম বসে আছেন সেই অপেক্ষায়। মেয়ে ঠিকঠাক। কিন্তু মেয়ের বাপ-মা প্রবাসে। তাঁরা ফিরলে তবেই না বিয়ে। ফিরবে সেই কোরবানির ঈদের আগে আগে। তত দিন শুধু অপেক্ষা করে থাকা। একাধিক বিয়ে বেদেজীবনের স্বাভাবিক ঘটনা। বিবাহবিচ্ছেদে কোনো মেয়েই ভেঙে পড়ে না। তবে মান-অভিমান যে একেবারেই থাকে না তা নয়। বেদে হলেও মানুষের মন বলে কথা। বিয়ে ভেঙে দেওয়ার নিয়ম বেশ সহজ। বৈঠকে আলোচনা হবে। বিয়ে নতুন বা এক-আধ বছর হলে মেয়েকে শুধু বানের টাকা ফেরত দিলেই হলো। আর পুরনো হলে সম্পত্তির অর্ধেক দিতে হবে। কারণটাও যুক্তিসঙ্গত। বেদেসমাজে নারী-পুরুষ উভয়ই সমান খাটে উপার্জনের জন্য।

অনেক ক্ষেত্রে ছেলেদের চেয়ে মেয়েরাই এগিয়ে থাকে বেশি। বিয়ের গণ্ডি কেবল গোত্রের মধ্যেই সীমিত থাকে না। অনেক ছেলেই গৃহস্থ ঘরের মেয়েকে বিয়ে করে আনে দূর-দূরান্ত থেকে। কথার চাতুরী, খেলা দেখানোর কৌশল আর মানুষের মধ্যে সম্মোহন জাগানোর ক্ষমতাই বেদেদের টিকে থাকার হাতিয়ার। এই অস্ত্রের কাছে বহু গৃহস্থঘরের ছেলে যেমন মেয়ে ঘরে আনে, তেমনি অনেক বেদেনী মন কেড়ে নেয় অনেক গৃহস্থঘরের পুরুষের। মনের খেলা যখন জমে ওঠে, তখন আসে ঘর ছাড়ার পালা। বেদেসমাজ থেকে চলে গিয়ে কেউ কেউ গৃহস্থঘরে স্বামী-সংসার করে থিতু হলেও বেশির ভাগই আবার থেকে যায় বাপের বাড়িতে। বেদে পল্লীর মুক্ত স্বাধীন জীবন ছেড়ে তারা থাকতে পারে না চার দেয়ালে বন্দি হয়ে।

‘পুরান ঢাকায় আমার স্বামীর পাঁচতলা বাড়ি রয়েছে। সেখানে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। তাই আমি এখানেই থাকি বেশির ভাগ সময়।’ হাসতে হাসতে কথাগুলো বললেন জ্যোতি। ‘বেশ রূপবতী ছিলাম আমি। আর পাড়ায় ঘুরতে এসেছিলেন তিনি। পরিচয়, কথাবার্তা। তারপর প্রেম। পাঁচ-ছয় বছর ধরে প্রেম। চিঠি চালাচালি। তারপর কোর্টে গিয়ে বিয়ে। সাড়ে তিন লাখ টাকা কাবিন। শ্বশুর তো নাই, শাশুড়ি কি মেনে নিতে চায় সহজে?’ —তারপর? —‘মেনে না লিয়ে করবে কী? একমাত্র ছেলে।’ বয়স থাকতে থাকতেই বেদেরা সাধ্যমতো জীবনকে উপভোগ করতে চায়। জীবিকার টানে তারা ঘরের বাহির হয়। ঘরের চেয়ে যেন বাহিরই তাদের টানে বেশি। জীবনের টানে যেমন তারা বন্ধনে জড়ায়, আবার সেই তাড়নায়ই বাঁধন কেটে দেয় অবলীলায়। এবং কোনো পিছুটান না রেখেই।






মন্তব্য চালু নেই