মেইন ম্যেনু

‘গ্লানিমুক্তির’ পর প্রথম বুদ্ধিজীবী দিবসে বাংলাদেশ

একাত্তরে বাংলাদেশের বিজয়ের ঊষালগ্নে এ দেশের মেধাবী সন্তানদের হত্যার ঘটনায় প্রথম যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি কার্যকরের পর প্রথম বুদ্ধিজীবী দিবস পালন করছে বাংলাদেশ।

১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী পরিকল্পিতভাবে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, চিকিৎসক, শিল্পী, লেখক, সাংবাদিকসহ বহু খ্যাতিমান বাঙালিকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে হত্যা করে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নিজেদের পরাজয় নিশ্চিত জেনেই পাকিস্তানি বাহিনী ওই নিধনযজ্ঞ চালায়; তাদের উদ্দেশ্য ছিল স্বাধীনতার পর যেন বাংলাদেশ যাতে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে না পারে- তা নিশ্চিত করা।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের দুদিন আগে বুদ্ধিজীবী হত্যায় প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করে রাজাকার, আলবদর ও আল শামস বাহিনীর সদস্যরা।

শরীরে নিষ্ঠুর নির্যাতনের চিহ্নসহ জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের লাশ পাওয়া যায় মিরপুর ও রায়েরবাজার এলাকায়। পরে তা বধ্যভূমি হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে।

সোমবার সকালে সেই বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধের শহীদ বেদীতে ফুল দিয়েই জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের শ্রদ্ধা জানাবে জাতি।

সেই ঘৃণ্য হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে এ পর্যন্ত যে চার যুদ্ধাপরাধীর সর্বোচ্চ সাজার রায় হয়েছে, তাদের মধ্যে একাত্তরের বদর কমান্ডার আলী আহসান মো. মুজহিদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে গত ২২ নভেম্বর।

একাত্তরের সেই বর্বরতার বিচার না পাওয়ার গ্লানি থেকে মুক্তির জন্য বাঙালিকে অপেক্ষা করতে হয়েছে ৪৪ বছর।

বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে এক বাণীতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেছেন, জাতিকে মেধাহীন করার হীন উদ্দেশ্য নিয়েই স্বাধীনতাবিরোধী চক্র ওই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড চালায়; জাতি হারায় তার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের।

“আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শহীদ বুদ্ধিজীবীদের রেখে যাওয়া আদর্শ ও পথকে অনুসরণ করে অসাম্প্রদায়িক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাভিত্তিক সমাজ গড়তে পারলেই তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে। শহিদ বুদ্ধিজীবীদের আদর্শ হোক আমাদের ভবিষ্যৎ চলার পাথেয়।”

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক বাণীতে বলেন, জামায়াত ও ধর্মান্ধ রাজনৈতিক দলগুলো একাত্তরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে পরিচালিত মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। বুদ্ধিজীবী হত্যাযজ্ঞ ছিল স্বাধীনতাবিরোধীদের ‘পরাজয়ের প্রতিশোধ’।

তাদের সেই প্রতিশোধ-স্পৃহা আজও থেমে নেই মন্তব্য করে তিনি বলেন, “দেশে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসের জন্ম দেয়। সাম্প্রদায়িকতাকে উস্কে দেয়। খুন-হত্যা-ধর্ষণ-নির্যাতন চালায়। এই সন্ত্রাসী ও জঙ্গিগোষ্ঠী ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত দেশব্যাপী ত্রাসের রাজত্ব চালায়। তারা সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়ায়। এতে জনগণের নাভিশ্বাস উঠে।”

যুদ্ধাপরাধের সকল রায় কার্যকর করার প্রত্যয় জানিয়ে বঙ্গবন্ধুকন্য শেখ হাসিনা বলেন, “কোনো ষড়যন্ত্রই জাতিকে এ পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারবে না।

“এই কুখ্যাত মানবতাবিরোধীদের যারা রক্ষার অপচেষ্টা করছে, তাদেরও একদিন বিচারের আওতায় আনা হবে। এসব রায় বাস্তবায়ন করার মাধ্যমে দেশ কলঙ্কমুক্ত হবে।”

বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে এক বিবৃতিতে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেন, ১৪ ডিসেম্বর একটি বেদনাময় দিন, বাংলাদেশকে মেধা-মননে পঙ্গু করার হীন উদ্দেশ্যে চূড়ান্ত বিজয়ের ঊষালগ্নে হানাদার বাহিনীর দোসররা দেশের প্রথিতযশা শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, বিজ্ঞানীসহ বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীদের নৃশংসভাবে হত্যা করোছিল।

“তারা মনে করেছিল, জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে পারলেই সদ্য স্বাধীন দেশ হিসাবে বাংলাদেশ মেধার উৎকর্ষহীনতায় নেতৃত্বহীন হয়ে মুখ থুবড়ে পড়বে। কিন্তু তাদের সে লক্ষ্য ব্যর্থ হয়েছে।”

ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী বিভেদ অনৈক্য এবং ‘সংকীর্ণ’ আচরণের মধ্য দিয়ে জাতীয় অগ্রগতির পথে ‘প্রতিবন্ধকতা’ সৃষ্টি করছে মন্তব্য করে খালেদা বলেন, “রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক বিকাশ এবং দেশকে একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর ও শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত করতে হলে আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, স্ব-স্ব অবস্থানে থেকে দায়িত্ব পালনে আন্তরিক হতে হবে। এ ক্ষেত্রে শহীদ বুদ্ধিজীবীরা আমাদের প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবেন।”

প্রতিবারের মতো এবারও নানা কর্মসূচিতে বুদ্ধিজীবী দিবস পালনের প্রস্তুতি নিয়েছে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন।

সকাল ৮টার পর রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাবেন।

৮টা ৪০ মিনিটে বঙ্গবন্ধু ভবনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন প্রধানমন্ত্রী।

আওয়ামী লীগ সভানেত্রী হিসেবেও তিনি বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ ও বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ফুল দেবেন। এছাড়া আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সকাল ৯টা ১০ মিনিটে রায়ের বাজার বধ্যভূমিতে ফুল দেওয়ার কর্মসূচি রয়েছে।

বিকাল ৩টায় রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আলোচনা সভা হবে, যেখানে সভাপতিত্ব করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

সকালে সূর্যোদয়ের সময় কেন্দ্রীয় কার্যালয়, বঙ্গবন্ধু ভবন ও দেশব্যাপী সংগঠনের কার্যালয়ে কালো পতাকা উত্তোলন এবং জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিত রেখে দিনের কর্মসূচি শুরু করবে আওয়ামী লীগ।

সকাল সাড়ে ৮টায় ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে এবং ৯টায় রায়ের বাজার বধ্যভূমিতে ফুল দেওয়ার কর্মসূচি রয়েছে ছাত্রলীগের।

কেন্দ্রীয় সংগঠনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কর্মসূচি নিতে সকল শাখা সংগঠন এবং সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতা-কর্মী, সমর্থক, শুভানুধ্যায়ী ও সর্বস্তরের জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সকাল সোয়া ৬টায় প্রধান প্রধান ভবনে কালো পতাকা উত্তোলন করা হবে। এরপর অপরাজেয় বাংলায় সমবেত হয়ে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন এলাকার স্মৃতিস্তম্ভে ফুল দেওয়া হবে, পরে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হবে মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে।

সকাল ১১টায় ছাত্র শিক্ষক মিলনায়তনে হবে আলোচনা সভা। বিকালে মসজিদ ও উপাসনালয়ে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের আত্মার শান্তি কামনায় প্রার্থনার আয়োজনও রয়েছে।

শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে শাহবাগ প্রজন্ম চত্বরে আলোচনা অনুষ্ঠান ও আলোর মিছিলের আয়োজন করেছে গণজাগরণ মঞ্চ।

বিকেল সাড়ে ৩টায় ‘জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি: মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ বিনির্মাণের কোনো পথে আমরা?’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান শেষে ওই আলোর মিছিল বের হবে।

মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বুদ্ধিজীবী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মচারী হত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে টিএসসির সকল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের উদ্যোগে সকাল ১১টায় রয়েছে স্মৃতি চিরন্তনে মানববন্ধন কর্মসূচি।

এছাড়া দুপুর ১টায় টিএসসিতে পতাকা তৈরির কর্মসূচি ‘আমার ভালোবাসার পতাকা’ এবং বিকাল ৩টা ‘রাজাকারের ব্যাঙ্গচিত্রে ডার্ট নিক্ষেপ’ কর্মসূচি রয়েছে ‘স্লোগান ৭১’ এর।

বিকেল ৪টায় বাংলা একাডেমির উদ্যোগে কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসের একক বক্তৃতা অনুষ্ঠান হবে। বক্তৃতা দেবেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। আবু হেনা মোস্তফা কামাল রচিত ‘মুনীর চৌধুরীর প্রতি খোলা চিঠি’ থেকে পাঠ করবেন রামেন্দু মজুমদার।

সকাল ৯টায় রায়েরবাজার শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে ফুল দেওয়ার পর সেখানে মানবন্ধন কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছে সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম-মুক্তিযুদ্ধ’৭১। পাকিস্তান গণহত্যার দায় অস্বীকার করায় এই প্রতিবাদ কর্মসূচি।

পরে মিছিল নিয়ে গুলশানে গিয়ে সাড়ে ১১টায় পাকিস্তান দূতাবাসে প্রতিবাদলিপি হস্তান্তর করে সেখানে গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় করার কর্মসূচি রয়েছে সংগঠনটির।

এদিন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের উদ্যোগে বিকাল ৪টায় ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধীদের বিচার: শহীদ পরিবারের প্রতিনিধিদের অনুভূতি’ শীর্ষক অনুষ্ঠান হবে। এরপর রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

বেলা ২টায় ‘স্বজনদের স্মৃতিতে শহীদ বুদ্ধিজীবী’ নামে আরেকটি আলোচনা সভার আয়োজন করেছে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি।

জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ করার দাবিতে ‘বাংলাদেশ রুখিয়া দাঁড়াও’ এর উদ্যোগে সকাল সাড়ে ১০টায় শহীদ মিনার থেকে পতাকা মিছিলের আয়োজন রয়েছে। মিছিলটি দোয়েল চত্বর, টিএসসি, জাতীয় জাদুঘর হয়ে শিখা চিরন্তনে শেষ হবে।

যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে বুদ্ধিজীবী হত্যার প্রথম রায় আসে ২০১৩ সালের ৩ নভেম্বর। ১৮জন বুদ্ধিজীবীকে হত্যার দায়ে ওইদিন দুই বদর নেতা আশরাফুজ্জামান খান ও চৌধুরী মুঈনুদ্দীনকে মৃত্যুদণ্ড দেয় আদালত।

জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামীর বিরুদ্ধেও বুদ্ধিজীবী হত্যার অভিযোগ প্রমাণিত হয়; ট্রাইব্যুনাল তাকেও মৃত্যুদণ্ড দেয়। ওই রায়ের বিরুদ্ধে ইসলামী ছাত্র সংঘের তৎকালীন সভাপতি নিজামীর আপিলের রায় জানা যাবে ৬ জানুয়ারি।

একাত্তরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঢাকার মোহাম্মদপুর ফিজিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে ক্যাম্প বসিয়ে স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার ও আলবদর বাহিনীর সদস্যদের প্রশিক্ষণ দিত।

জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন ছাত্র সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি নিজামী ও সেক্রেটারি জেনারেল মুজাহিদ নিয়মিত ওই ক্যাম্পে যাতায়াত করতেন বলে আদালতের বিচারে উঠে আসে।

দুই রায়েই বলা হয়, ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে এই দুই জামায়াত নেতার ষড়যন্ত্রের পথ ধরেই ১০ ডিসেম্বর থেকে বাংলাদেশে বুদ্ধিজীবী নিধনসহ গণহত্যার মতো ঘটনা ঘটে।






মন্তব্য চালু নেই