মেইন ম্যেনু

পর্নকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে স্কুলছাত্ররা!

চট্টগ্রামের স্কুল ও কোচিং ক্লাসগুলোতে শুরু হয়েছে এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা। কিশোর বয়সীরা মোবাইল সেটে লুকিয়ে তুলছে মেয়ে সহপাঠীর ছবি ও ভিডিও। আর হাত ঘুরে তা পৌঁছে যাচ্ছে নগরীর কিছু দোকানে। সেখানে প্রযুক্তি অপব্যবহার খাটিয়ে মেয়েদের স্থিরচিত্রের মুখের অবয়ব জুড়ে দেওয়া হচ্ছে পর্নো ভিডিওতে।

মেয়েটি তো বুঝতেই পারছে না, এমনকি যে ছেলেটি ছবি তুলেছে সেও জানে না শেষ পর্যন্ত তার তোলা ওই ছবি কী সর্বনাশ ডেকে আনছে। সম্প্রতি উঠতি বয়সীদের মধ্যে পর্নোছবি দেখার চেয়ে সেটা তৈরি ও বিলি বণ্টনের প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে। যার পরিণতিতে ধর্ষণচেষ্টার দৃশ্য বা যৌননিপীড়নের দৃশ্য ধারণ করে সেটা নিয়ে ব্ল্যাকমেইল করার মতো ঘটনা প্রায়ই ঘটছে।

একটি কলেজের কোচিংয়ে দেখা হয় সায়মা ও সোহানের। বন্ধুত্ব গড়ে ওঠার পর সেটা আস্থার স¤পর্কে রূপ নেয়। একদিনের ঘটনা। কোচিং ছুটি হয় নির্দিষ্ট সময়ের আগেই। ড্রাইভার না আসায় সোহানের বাসায় অপেক্ষা করতে আপত্তি করে না সায়মা। এক পর্যায়ে সায়মাকে ধর্ষণের চেষ্টা করে সোহান এবং পাশের ঘর থেকে তা ক্যামেরাবন্দি সোহানের বন্ধুরা। সেদিন কোনওমতে ছাড়া পেয়ে পালিয়ে আসে সায়মা।

কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। একদিন পর কোচিং-এ গিয়ে দেখে সবার হাতে হাতে ওই নির্যাতনের ভিডিও। সায়মার পরিবারের পক্ষ থেকে সোহানকে চার্জ করা হলে সে জানায় মোবাইল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সে দোকানে দিয়েছিল। সেখান থেকে সায়মাসহ আরও কয়েকজনের ছবি ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ঘটনা জানাজানি হবে ভেবে সায়মার অভিভাবকরা আর বেশিদূর এগোয়নি। কোনও মামলাও হয়নি। অপরাধের মাত্রা না জেনে যে কাজটি স্কুল-কলেজ শিক্ষার্থীরা সহপাঠীদের সঙ্গে করছে তা জামিন অযোগ্য। প্রমাণ হলে ৫ বছরের জেল ও ২ লাখ টাকা জরিমানা হতে পারে। জরিমানা পরিশোধ করলেই সমাধান হয়ে যাবে, এমন নয়।

অভিযুক্ত কিশোরকে পুনর্বাসন কেন্দ্রেও যেতে হতে পারে। আর এতে করে তার ভবিষ্যৎ মুখ থুবড়ে পড়বে বলেই ধারণা মনোস্তত্ত্ববিদদের। অপরাধ হিসেবে ধর্ষণের সঙ্গে ধর্ষণ দৃশ্যায়ন যুক্ত হয়েছে বলেই পর্নো নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১২ তে বলা আছে, কোন ব্যক্তি ইন্টারনেট বা ওয়েসাইট বা মোবাইল বা অন্যকোনও ইলেকট্রনিক ডিভাইসের মাধ্যমে পর্নোগ্রাফি সরবরাহ করলে তিনি অপরাধ করেছেন বলে গণ্য হবেন এবং সর্বোচ্চ ৫ (পাঁচ) বৎসর সশ্রম কারাদণ্ড এবং দুই লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। একইসাথে সে ব্যক্তি পর্নোগ্রাফি প্রদর্শনের মাধ্যমে গণউপদ্রব সৃষ্টি করলে সর্বোচ্চ ২ (দুই) বৎসর সশ্রম কারাদণ্ড এবং এক লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

এ ধরনের ঘটনা ধারাবাহিকভাবে ঘটলেও দৃষ্টান্তমূলক বিচারের ব্যবস্থা না করায় আইনটি স¤পর্কে কেউ অবহিত নন। আইনজীবীরা বলছেন, স্কুল কোচিং কিংবা কলেজে যে ধরনের হয়রানির মুখে পড়তে হচ্ছে মেয়ে শিক্ষার্থীদের সেটা ধর্ষণ বিবেচনা হয় না বলে আইনি আশ্রয় নেওয়ার প্রবণতা নেই। কিন্তু যে ভয়াবহতা দেখা যাচ্ছে তাতে এই আইনকে কার্যকর করে তোলার বিকল্প নেই।

জানা দরকার এ আইনে যৌন উত্তেজনা সৃষ্টিকারী কোনও অশ্লীল, অভিনয়, অঙ্গভঙ্গিও পর্নোগ্রাফির আওতায় পড়ে। এ আইনের অধীনে সংঘটিত অপরাধ আমলযোগ্য এবং অ-জামিনযোগ্য। আইনজীবী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, যে ছেলেটি ভিডিও ধারণ করছে এবং বিক্রি করছে বা বিলি করছে সে একইসঙ্গে সাইবার ক্রাইমের মামলাও পড়বে।

ই-মেইলে হুমকি প্রদান, পাসওয়ার্ড চুরি, হ্যাকিং, অশ্লীল ছবি বা ভিডিও হোস্ট করা, তথ্য চুরি, তথ্য বিকৃতি, ছবি চুরি ও বিকৃতি, প্রতারণা, ব্ল্যাকমেইল ইত্যাদি তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে করা হলে সেগুলোকে সাইবার অপরাধ বলা হয়। সেহেতু একইসঙ্গে তার জন্য এতোগুলো ভয়ঙ্কর পরিণতি অপেক্ষা করছে জানলে ‘কিশোর বয়সের ফাজলামো’ হিসেবে সে পুরো বিষয়টাকে দেখতে সাহস করবে না।

তিনি সমাজের দায়িত্বে কথাও উল্লেখ করে বলেন, এই কিশোররা এমনিতে এমন হয়ে যাচ্ছে তা তো না। সমাজ তাদের প্রতি দায়িত্ব পালন করতে পারছে না বলেও সে ভালমন্দের বিচার করতে পারছে না। অভিভাবকরা দাবি করছেন, স্কুল কলেজে টেলিফোন বা ট্যাব ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে স্কুলে মোবাইল নিতে দেওয়া হয় না।

ক্লাস সিক্সের পর সঙ্গে মোবাইল থাকলেও ক্লাসরুমে তা নেওয়া যায় না। রাজধানীর নামকরা এক স্কুলে দশম শ্রেণিতে পড়–য়া এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক রেজাউর রহমান বলেন, আমার মেয়ে নানা সময় এসব অভিযোগ করে। এ ধরনের ডিভাইস নেওয়া থেকে বিরত রাখতে কর্তৃপক্ষ উদ্যোগ নিলে মেয়েটি স্কুলে নিরাপদ থাকতো। এমনকি স্কুলের ভ্যানচালকরাও তাদের ছবি তোলে! ডিভাইস ব্যবহারে ন্যুনতম বিধিনিষেধ ও নিয়ম না থাকা এবং না জানার কারণেই এ ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে বলে মনে করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মেহতাব খানম।

তিনি বলেন, আমার মনে হয়, কিশোরদের বয়ঃসন্ধিকালে তাদের অভিভাবকরা বেশি সময় দেন না। মেয়েশিশুরা যতোটা সহজে মায়ের কাছে বোনের কাছে শেয়ার করতে পারে, ছেলেটি ততোটা সামাজিকায়নের মধ্য দিয়ে বয়ঃসন্ধির বিষয়টি বোঝে না। ফলে সে একধরনের ভুল বার্তা পায়।






মন্তব্য চালু নেই