মেইন ম্যেনু

চট্টগ্রামে মীর কাসেমের সম্পদের পাহাড়

ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ড কার্যকরের পর বেরিয়ে আসছে দেশজুড়ে মীর কাসেম আলীর অঢেল সম্পদের বিবরণ। চট্টগ্রামেও রয়েছে তার বিপুল সম্পদ। চট্টগ্রাম কেন্দ্রিক তাঁর এই সম্পদের পরিমাণ হাজার কোটি টাকা ধারণা করা হচ্ছে।

এর মধ্যে কেয়ারি লিমিটেডের আওতায় চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে অন্তত ১২টি বহুতল ভবন। রয়েছে আন্তর্জাতিক ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায় চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড উপজেলার কুমিরায় বিলাসবহুল স্থায়ী ক্যাম্পাসসহ মোট ৫টি ভবন। চট্টগ্রামের কালুরঘাটে রয়েছে ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিকেলস কারখানা।

চট্টগ্রাম গণজাগরণ মঞ্চের সদস্য সুনিল ধর জানান, ২০০২-২০০৩ সালে জামায়াত-শিবির নিয়ন্ত্রিত নগরির চকবাজার এলাকায় ‘কেয়ারি ইলিশিয়ান’ নামে প্রথম বহুতল ভবন নির্মাণ করে কেয়ারি লিমিটেড। ওই সময় প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ছিলেন মীর কাসেম আলী।

এ ভবন নির্মাণ করে ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান হিসেবে ২২টি ফ্ল্যাট পায় কেয়ারি লিমিটেড। এরপর চট্টগ্রামের নাছিরাবাদে ‘কেয়ারি মাসুদ’ নামে ১০ তলা অ্যাপার্টমেন্ট, জয়নগরে ‘কেয়ারি সুলতানা’ নামের আটতলা অ্যাপার্টমেন্ট, হালিশহর কে-ব্লকে ‘কেয়ারি তৈয়ব’ নামের ছয় তলা অ্যাপার্টমেন্ট ও হালিশহর এইচ ব্লকে ‘কেয়ারি নাঈমা’ নামের ছয় তলা আরেকটি অ্যাপার্টমেন্টের নির্মাণকাজ শেষ করে ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানটি।

বর্তমানে নির্মাণকাজ চলছে উত্তর খুলশীর ১০ তলা অ্যাপার্টমেন্ট ‘কেয়ারি প্রশান্তি’, দক্ষিণ খুলশীর ছয়তলা অ্যাপার্টমেন্ট ‘কেয়ারি রওশন’, ওয়াসার মোড়ে সাততলা অ্যাপার্টমেন্ট ‘কেয়ারি এসএ টাওয়ার’, জামালখানে ১৮ তলা অ্যাপার্টমেন্ট ‘কেয়ারি খান’, রহমতগঞ্জে ১০ তলা অ্যাপার্টমেন্ট ‘কেয়ারি রহমত’, কর্ণফুলী আবাসিকে ছয়তলা অ্যাপার্টমেন্ট ‘কেয়ারি সীমা’ এবং ঈদগাহ এলাকায় ছয়তলা অ্যাপার্টমেন্ট আল ইসলাম কেয়ারি টাওয়ারের।

চট্টগ্রামের এসব অ্যাপার্টমেন্ট থেকে ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান হিসেবে ১৭০টি ফ্ল্যাট পেয়েছে কেয়ারি লিমিটেড। যেগুলোর মূল্য প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। তবে এসব ফ্ল্যাট রক্ষা করতে ২০১২ সালে পরিচালনা পর্ষদ পাল্টে ফেলেন মীর কাসেম আলী।

এছাড়া আন্তর্জাতিক ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চট্টগ্রাম বহদ্দারহাট, কর্ণফুলী ভবন, কেয়ারি শপিং মলের পেছনে অবস্থিত বর্ধিত ভবনসহ (গুলজার টাওয়ারের বিপরীত পাশে ও চট্টেশ্বরী রোডে অবস্থিত) পাঁচটি বিলাসবহুল ভবন রয়েছে।

যারমধ্যে চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে কুমিরায় অবস্থিত ভবনটি ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ভবন হিসেবে দেখানো হয়েছে।

কৌশলগত কারনে বাকি ৪ টি ক্যাম্পাস ভবনের মালিক মীর কাসেম আলী হলেও তা কাগজে-কলমে ভাড়া দেখানো হয়। ফলে ইউজিসির চাপে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পত্রিকায় ঘোষণা দিয়ে এসব ক্যা¤পাস বন্ধ ঘোষণা করে কুমিরায় স্থায়ী ক্যা¤পাসে কার্যক্রম পরিচালনার কথা বলা হয়।

ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান বিষয়টি স্বীকার করেছেন। এই পাঁচটি ভবনের বর্তমান বাজার মূল্য শতকোটি টাকার উপরে বলে মত প্রকাশ করেন স্থানীয় নির্মাণ প্রকৌশলীরা।

এছাড়া চট্টগ্রামের কালুরঘাটে অবস্থিত ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিকেলস কারখানার সিংহভাগের মালিকও মীর কাসেম আলী। এতে মীর কাসেম আলীর ৭০০ কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগ রয়েছে বলে একটি সূত্র জানিয়েছেন। তবে বিষয়টি কারখানার দায়িত্বশীল সূত্র থেকে নিশ্চিত করা যায়নি।

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিকেলসের ব্যবস্থাপক মো. নজরুল ইসলাম বলেন, মীর কাসেম আলী ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিকেলসের কত অংশের মালিকানা তা আমার জানা নেই। তবে তিন যে মালিক সেটা জানি।

কেয়ারি লিমিটেডের ভবন সম্পর্কে জানার জন্য প্রতিষ্ঠানটির অফিসিয়াল ফোনে একাধিকবার ফোন করলেও কেউ রিসিভ করেননি। এছাড়া আন্তজার্তিক ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গণসংযোগ কর্মকর্তা আফতাব উদ্দিন বলেন, আমাদের স্থায়ী ক্যাম্পাস একটিই। ইউজিসির শর্ত মোতাবেক এই ক্যাম্পাসেই শিক্ষা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। বাকি চারটি ক্যাম্পাস বন্ধ রয়েছে। ওগুলো ভাড়া হিসেবে নেওয়া হয়েছিল সেটাই জানি। এর বাইরে কিছুই বলতে পারছি না।

উল্লেখ্য, মীর কাসেম আলীর মানিকগঞ্জে সন্তান। কিন্তু তার বাবা চট্টগ্রামের নন্দনকাননে ট্রেলিগ্রাফ অফিসের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারি ছিলেন। দীর্ঘদিন চাকরির সুবাধে মীর কাসেম বেড়ে উঠেন চট্টগ্রামে। ১৯৭১ সালে মীর কাসেম আলী ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রসংঘের সাধারণ স¤পাদক। মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রামে তিনি তার আলবদর বাহিনী সদস্যদের নিয়ে গঠন করেন ডেথ স্কোয়াড।

নন্দনকাননের পূরনো ট্রেলিগ্রাফ সড়কের ‘মহামায়া ভবন’কে বানিয়েছিলেন নির্যাতন কেন্দ্র। সেখানেই মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতাকামীদের ধরে এনে তার চ্যালাচামুন্ডারা নির্যাতন চালাত। এর আগে ১৯৭০ সালে তিনি চট্টগ্রাম সরকারী কলেজ শাখার ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি ছিলেন। একাত্তরের ২৫ মার্চ থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রাম শহর শাখা ছাত্রসংঘের সভাপতির পদেও আসীন ছিলেন।

চট্টগ্রামে তাকে মিন্টু নামেই চিনত তার সংগঠনের সদস্য, কলেজ জীবনের সাথী ও শুভাকাঙ্খীরা। তার নেতৃত্বে চট্টগ্রামে ৫টি নির্যাতন কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছিল। তন্মধ্যে প্রধান ছিল ‘মহামায়া ভবন’ (ডালিম হোটেল)। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শেষে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ইসলামী ছাত্রসংঘের নাম বদলে হয়ে যায় ইসলামী ছাত্রশিবির। এই ছাত্রশিবিরের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হয়েছিলেন মীর কাসেম আলী।

রাবেতা আল আলম আল ইসলামী নামে বিদেশী এনজিও সংস্থার এদেশী পরিচালক হন মীর কাসেম আলী। এরপর যোগ দেন জামায়াতে ইসলামে। ১৯৮৫ সালের জামায়াতের শুরা সদস্য হিসেবে আসীন হন তিনি। এরপর থেকেই তার ব্যবসায়িক উত্থান হয়।

একাধিক বাড়ি-গাড়ির পাশাপাশি ব্যাংক, হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে রয়েছে তার বড় অঙ্কের বিনিয়োগ। তবে নিজের নামে তিনি সুকৌশলে কম স¤পদ দেখিয়ে আসছিলেন। যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরুর পর মীর কাসেম আলী স¤পদ রক্ষায় নানা ফন্দিও আঁটেন। ব্যাংক ঋণ দেখিয়ে বছরের পর বছর কর ফাঁকিও দিয়েছেন।

ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত এ যুদ্ধাপরাধীর সব সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে নির্যাতন কেন্দ্র ডালিম হোটেলকে জাদুঘর করার দাবি জানিয়েছেন চট্টগ্রামের নির্যাতিত মুক্তিযোদ্ধারা।






মন্তব্য চালু নেই