মেইন ম্যেনু

স্বচ্ছলতা নামক সোনার হরিণটি ধরা দিবে কি!

চার দশক ধরে পত্রিকা বিক্রি করে বয়সের ভারে ক্লান্ত আফজাল হোসেন

নওগাঁর রাণীনগর উপজেলার কাশিমপুর ইউপি’র বাহাদুরপুর গ্রামের মৃত ফয়েজ উদ্দীন প্রামানিকের ছেলে আফজাল হোসেন (৬০) দীর্ঘ প্রায় ৪২ বছর ধরে পত্রিকা বিক্রি করে বয়সের ভারে জীবনযুদ্ধে ক্লান্ত। পরিবারের অভাব-অনটন দারিদ্র দূর করতে জীবন সংগ্রামে টিকে থাকার চেষ্টায় তিনি খুব অল্প বয়সে নাম লিখেন পত্রিকা বিক্রেতা (হকার) নামক এই পেশায়।

দু-মুঠো ডাল ভাত খাবার আসায় ঝড়, বৃষ্টি, বাদল ও তাপদাহ উপেক্ষা করে কাক ডাকা ভোরে নিজ বাড়ি থেকে পার্শবর্তী বগুড়া জেলার আদমদিঘী উপজেলার সান্তাহারে পত্রিকা কিনে সারাদিন পুরো সান্তাহার পৌর শহরে পায়ে হেঁটে ঢাকা ও বগুড়া থেকে আসা বিভিন্ন নামের পত্রিকা বিক্রি করে ক্লান্ত হয়ে সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে।

আজ পর্যন্ত তার ভাগ্যে জোটেনি নুন্যতম একটি সাইকেল। সরকারি পর্যায় সুযোগ-সুবিধা, যেমন- বয়স্ক ভাতা কিংবা রিলিফের চাল। কোন দিন খোঁজ-খবরও রাখেনি কোন পত্রিকার কর্তৃপক্ষ কিংবা এজেন্টরা।

আফজাল হোসেন জানান, সে ১৯৭৮ সালে নওগাঁ জেলার ইলশাবাড়ি গ্রামের ছইম উদ্দিনের মেয়ে আশেদা বানুকে বিয়ে করেন। তার পাঁচ ছেলের মধ্যে এক ছেলে জন্ম গ্রহণের পরপরই ও অপর এক ছেলে দেড় বছর বয়সে মারা যায়। আফজাল হোসেনের বড় শখ ছিল এক ছেলেকে ডাক্তারী পড়াবেন।

অনেক কষ্ট করে বড় ছেলেকে মেডিকেল কলেজে ভর্তিও করে দেন। কিন্তু বড় ছেলে আরিফ ২৫ বছর বয়সে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে লেখা-পড়া অবস্থায় ২০১০ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। আফজাল হোসেনের পরিবারে নেমে আসে শোকের ছায়া। সব দুঃখ-কষ্ট ভুলে আফজাল হোসেন পত্রিকা বিক্রি পেশাকে আকরে ধরে জীবনযুদ্ধে টিকে থাকার লড়াই অব্যহত রাখেন।

সংসারের অভাব-অনটনের কারণে বাকি দুই ছেলেকে লেখাপড়া করাতে পারেনি তিনি। তারা বর্তমানে দিনমজুরের কাজ করে নিজেদের সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে। যার কারণে পিতাকে সেভাবে সাহায্য-সহযোগীতা করতে পারে না।

দীর্ঘদিন ধরে তার স্ত্রী অসুস্থ্য থাকায় অর্থ সংকটে যথাযথ চিকিৎসার অভাবে বিছানায় পড়ে মৃত্যুর পহর গুনছে। তার স্ত্রীর চিকিৎসার ব্যয় এবং সংসার চালানো একার পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বয়সের ভারে আফজাল হোসেন নুয়ে পড়লেও জীবন যুদ্ধে টিকে থাকা, স্ত্রীর চিকিৎসার খরচ ও দু-বেলা দু-মুঠো খাবারের জন্য শত কষ্টকে উপেক্ষা করে আজও তিনি পত্রিকা বিক্রয় করে যাচ্ছেন।

একদিন কোন কারণে পত্রিকা বিক্রয় বন্ধ থাকলে তার বাড়ির চুলায় আগুন জ্বলে না, উপোস থাকতে হয় অসুস্থ্য স্ত্রীকে নিয়ে। কিন্তু আজ পর্যন্ত দেখা মিলেনি কোন সরকারি ভাতা বা অন্যান্য কোন প্রকার সুযোগ-সুবিধা। তিনি সকাল ৬টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সান্তাহার শহরের বাসা-বাড়ি, দোকান, অফিস ও রেল স্টেশনে পত্রিকা প্রতিদিন বিক্রি করে আসছেন।

তার শরীর একটু অসুস্থ্য হলেও পরিবারের কথা চিন্তা করে ঘর থেকে বের হয়ে পড়েন পত্রিকা হাতে নিয়ে। দশম শ্রেণী পাশ আফজাল হোসেনকে কোন দিন কখনও কোন পত্রিকা প্রতিষ্ঠান আর্থিক ভাবে সহযোগিতা তো দূরের কথা কখনো খোঁজ-খবরও নেয়নি। শত ঝড়, বৃষ্টি ও রোদকে উপেক্ষা করে ৪২বছর ধরে পায়ে হেঁটে খুব কষ্টে পুরো সান্তাহার শহর ঘুরে ঘুরে পত্রিকা বিক্রি করেন। সান্তাহার জংশন রেলওয়ে স্টেশনে যখন ট্রেন এসে দাড়ায় তখন যাত্রীদের কাছে সে ছুটে যায় একটি পত্রিকা বিক্রি করার জন্য।

পত্রিকা বিক্রি করে সে প্রতি মাসে প্রায় পাঁচ হাজার টাকা আয় করে। এই টাকায় তিনি অসুস্থ্য স্ত্রীর চিকিৎসার খরচসহ অতিকষ্টে সংসার চালিয়ে আসছেন। তিনি জানেন না তার জীবনে কি কখনও কোনদিন সুখ-স্বচ্ছলতা নামক সোনার হরিণটি ধরা দিবে কি?

রাণীনগর উপজেলার কাশিমপুর ইউপি চেয়ারম্যান মোখলেছুর রহমান বাবু জানান, আমার হাতে এই মূহুর্তে সরকারি বরাদ্দ নেয়। তবে আগামীতে যে কোন ধরনের বরাদ্দ আসলে তাকে দেওয়ার অবশ্যই চেষ্টা করব।






মন্তব্য চালু নেই