মেইন ম্যেনু

চোখ ধাঁধানো অথচ অভিশপ্ত ৩ হীরা

রত্নের চমক আকর্ষণ করে না এমন কেউ হয়ত নেই। রত্ন নিয়ে যুগে যুগে হয়েছে অনেক লড়াই, অনেক রক্তারক্তি। কিন্তু এমন কিছু রত্ন আছে যেগুলো আপনার কাছে থাকলেই বরং বিপদ। রত্নগুলো অপূর্ব কিন্তু হতে পারে মৃত্যুর কারণ। বিখ্যাত এই রত্নগুলো কখনো প্রাণ নিয়েছে তাদের স্বত্বাধিকারীর, কখনো বা করেছে মানসিকভাবে অসুস্থ। অন্তত কিংবদন্তী তাই বলে। আসুন জেনে নিই অভিশপ্ত এই রত্নগুলোর কথা।

১। হোপ ডায়মন্ড
অভিশপ্ত হীরা বলতে প্রথমেই আসে হোপ ডায়মন্ডের নাম। যদিও নামে এটি আশা বা সাফল্যের প্রতীক মনে হবে। কিন্তু এর প্রত্যেক স্বত্বাধিকারীর মৃত্যুর জন্য একে দায়ী মনে করা হয়। হীরাটি ঠিক কোথায় পাওয়া গিয়েছিল বা এর প্রথম মালিক কে ছিল তা নিয়ে নানা বিতর্ক আছে। তবে ধরণা করা হয়, ভারতের গোলকুণ্ডা রাজ্যের কল্লুর খণিতে হিরাটি পাওয়া যায়। কথিত আছে রাম সীতার মন্দিরে সীতার মূর্তির অলংকারে বসানো ছিল রত্নটি। দরিদ্র এক পুরোহিত চুরি করে এটি। তখন থেকেই দেবতার অভিশাপ জুড়ে যায় হীরার সাথে। অবর্ণনীয় কষ্টে মৃত্যু হয় পুরোহিতের। এরপর ফরাসি বণিক জিন বাপস্টাইট তাভারনির এর কাছে সন্ধান মেলে হিরাটির। তিনি এটি কারো কাছ থেকে কিনেছিলেন বা চুরি করেছিলেন। বাপস্টাইট কুকুরের হিংস্র আক্রমণে মারা যান।

হীরার পরবর্তী মালিকদের অবস্থাও ছিল করুণ। রাজা চতুর্দশ লুই এবং ম্যারি আঁতোয়ানেত, তাদের শিরচ্ছেদ করা হয়। পিন্সেস লাম্বেল, মব দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয় তাকে। জ্যাকস কলেট, তিনি আত্মহত্যা করেন। সারবায়া, তাঁর প্রেমিক যিনি এই হীরাটি তাকে উপহার দিয়েছিলেন তিনিই তাকে কুপিয়ে হত্যা করেন। সায়মন মন্থারাইস, তাঁর পুরো পরিবারসহ একটি গাড়ি দূর্ঘটনায় মারা যান।

এরপর ১৯১১ সালে কারটিয়েরের কাছ থেকে ইভালিন ম্যাকলিন হোপ ডায়মন্ড কেনেন এবং ঘোষণা দেন তিনি রত্নটিকে অভিশাপ মুক্ত করবেন। কিন্তু অভিশাপ থেকে রক্ষা পানি নি তিনি নিজেই। ম্যাকলিনের ছেলে মারা যায় সড়ক দূর্ঘটনায় আর মেয়ের মৃত্যু হয় অতিরিক্ত ওষুধ সেবনে। তিনি মরফিনে আসক্ত হয়ে পড়েন। তাঁর স্বামী তাকে ত্যাগ করেন এবং পরবর্তীতে মারা যান এক বৃদ্ধাশ্রমে। অভিশাপ এবার তার গন্তব্য খুঁজে নেয় তার ছয় নাতি-নাতনির ভাগ্যের কাছে। ১৯৬৭ সালে ম্যাকলিনের একজন নাতনি এভালিনকে তার এপার্টমেন্টে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়, দৃশ্যত এর কোন কারণ খুঁজে পাওয়া যায় নি।

ম্যাকলিনের উত্তরাধিকারীরা হীরেটি হ্যারি উইনিস্টন নামে একজন হীরের ডিলারকে বিক্রি করে দেয়। হ্যারি এটি স্মিথসোনিয়ান ইন্সটিটিউশনকে দান করে দেন। তখন থেকে এই হোপ ডায়মন্ড সেখানেই রয়েছে।

২। ব্লাক অরলোভ ডায়মন্ড
রত্নটিকে বলা হয় দেবতা ব্রহ্মার চোখ। ভারতের পন্ডিচেরির এক মন্দিরে দেবতা ব্রহ্মার চোখে বসানো ছিল হীরাটি। সেখান থেকে চুরি হয়ে যায়। সেখান থেকেই অভিশাপের জন্ম। রত্নটি আত্মহত্যায় বাধ্য করে বা প্ররোচিত করে বলে ধারণা করা হয়। এই ধারণার পেছনে আছে বেশ কিছু মৃত্যু।

জে. ডব্লিউ প্যারিস ১৯৩২ সালে হীরাটি আমেরিকায় নিয়ে আসেন। নিউইয়র্কের স্কাইস্ক্র্যাপার থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন তিনি। হিরাটির পরবর্তী মালিক ছিলেন দুই রাশীয়ান রাজকুমারী নাদিয়া ভাইগিন অরলোভ এবং বারিয়াটিনস্কি। তারা দুজনেই আত্মহত্যা করেন রোমের একটি দালানের ছাদ থেকে। বিভাজনের মাধ্য্যমে রত্নটিকে অভিশাপমুক্ত করার চিন্তা থেকে একে কেটে ৩ টি টুকরো করা হয়। তাতে অবশ্য কাজ হয়। এরপর আর কোন মৃত্যুর ঘটনা শোনা যায় না। শেষ ২০০৬ সালে অস্কার পুরষ্কারের জন্য মনোনীত ফেলিসিটি হফম্যানের গলায় যায় অরলোভ খচিত নেকলেস। যদিও কিছুক্ষণের মধ্যেই খুলে ফেলেন তিনি নেকলেসটি। সম্ভবত অভিশাপের ভয়ে!

৩। কোহিনুর
এই হীরাটিও ভারতের গোলকুন্ডা খণি থেকে পাওয়া যায়। কোহিনূর মানে পর্বতের আলো। কথিত আছে, এটিও কোন হিন্দু দেবীর মন্দিরে খচিত ছিল। সম্রাট বাবর এর স্বত্বাধিকারী ছিলেন। সিংহাসন থেকে বারংবার বিচ্যুত হয়েছেন তিনি। এরপর ছিল সম্রাট শাহজাহানের কাছে। ময়ূর সিংহাসনে বসিয়েছিলেন তিনি হীরাটি। ছেলে আওরঙ্গজেবের হাতে সিংহাসনচ্যুত হন তিনি। ভিয়েতনামে হীরাটি কেটে ছোট করা হয়। এরপর অনেক শাসকের কাছে যায় হীরাটি এবং প্রত্যেকেরই পরিণতি হয় করুণ। সিংহাসন নিয়ে রক্তারক্তি, খুন হয় প্রায় সব রাজ পরিবারেই।

১৮৫০ সালে হীরাটি ইন্ডিয়া থেকে চুরি করে লন্ডনে নিয়ে যাওয়া হয়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ব্রিটেনের রাজ পরিবারকে উপহার দেয় এটি। হীরাটির অদ্ভুত বিষয় খেয়াল করা হয় তখন। তা হল এটির অভিশাপ শুধু পুরুষদের বেলায় কাজ করে! ব্রিটিশ যে রাজারাই এটা পরেছেন তারা সবাই তাদের ক্ষমতা হারিয়েছেন। তাই অবশেষে এর স্থান হয় রানী এলিজাবেথের মুকুটে। ১৮৬ ক্যারেটের হীরাটি এখন মুকুটের অংশ হিসেবে লন্ডন টাওয়ারে প্রদর্শিত হচ্ছে নিয়মিত।

মানুষ যখন কোন রহস্যের সমাধান করতে পারে না তখন সে উত্তর খুঁজে নেয় রূপকথা, গল্প বা কিংবদন্তিতে। রত্নগুলোর সাথে সম্পৃক্ত প্রত্যেকের জীবনের পরিণতি ছিল কাকতালীয় ভাবে একইরকম ভয়াবহ। যা রত্নগুলোকে ঘিরে এসব গল্পের অবতারনা করতে সহায়ক হয়েছে। এখনো এই রহস্যগুলো উন্মোচিত হয় নি। এতগুলো মৃত্যু শুধুই কি অভিশাপের ফল? মীমাংসিত হয়নি আজ অবধি! তবে গল্পগুলো থেকে একটা শিক্ষা অবশ্য পাওয়া যায়। সেটা হল, কোন রত্ন বা সম্পদ লোভে পড়ে চুরি করা উচিৎ নয়।






মন্তব্য চালু নেই