মেইন ম্যেনু

ছাত্রীদের ভয়ঙ্কর বিপদে ফেলে দিচ্ছে লিভ টুগেদার

‘লিভ টুগেদার’বা অবৈধ বসবাস শিক্ষার্থীদের জীবনে ভয়ঙ্কর বিপদ ডেকে আনছে। সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকটি ঘটনা অভিভাবকদের চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। লিভ টুগেদার নামক ব্যবস্থাটি যেন এখন ভাইরাল আকার ধারন করেছে।

কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের অবৈধ ‘লিভ টুগেদার’ আশংকাজনক হারে বেড়ে গেছে। বিশেষ করে রাজধানীতে প্রেমিক-প্রেমিকা জুটি নিজেদের সমঝোতার ভিত্তিতে লিভ টুগেদারের পথ বেছে নিচ্ছেন। এর বাইরেও শিক্ষার্থীদের একটি অংশ নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে বন্ধু-বান্ধবী সম্পর্কের সূত্র ধরে একসঙ্গে বসবাস করছেন। আর অবৈধ এ বসবাস শিক্ষার্থীদের জীবনে ভয়ঙ্কর বিপদ ডেকে আনছে।

এটা এমন একটা কালচার যেখানে দুইজন নারী-পুরুষ হতে পারে তারা বয়ফ্রেন্ড-গার্লফ্রেন্ড বা অন্য কিছু। গভীর বন্ধুত্ব এবং বোঝাপাড়ার ভিত্তিতে একসঙ্গে একবাড়ীতে বসবাস করে কোনোরকম বৈবাহিক সম্পর্ক ছাড়াই। তারা চাইলে সন্তানও নিতে পারে। পাশ্চাত্য দেশসমূহে এটা খুবই স্বাভাবিক একটা বিষয়। কিন্তু বাংলাদেশে লিভ টুগেদারের কালচার ওইভাবে গড়ে ওঠেনি। এর কোন আইনগত ভিত্তিও নেই। তাই স্বামী-স্ত্রী না হওয়া সত্ত্বেও ওই পরিচয়ে লিভ টুগেদার করছে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি অংশ। সম্প্রতি বেশ কয়েকটি চাঞ্চল্যকর আত্মহত্যা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় লিভ টুগেদারের বিষয়টি আলোচনায় চলে এসেছে। লিভ টুগেদার তাদের জীবনে ভয়ঙ্কর বিপদ ডেকে এনেছে।

জানা গেছে, শারীরিক আকর্ষণ হোক বা নিজেকে অতিরিক্ত স্মার্টলি উপস্থাপনের জন্যই হোক বাংলাদেশে ‘লিভ টুগেদার’ কালচারটির সাথে এদেশের ছেলে মেয়েরা বেশ ভালোভাবেই জড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু এর শেষ পরিণাম কি হচ্ছে? বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে এই ‘লিভ টুগেদার’ এর শেষ পরিনতি হয় বিচ্ছেদ। ব্যাপারটা হল কিছুটা এমন যে ফেসবুকে যে মানুষটাকে নিয়ে ‘ইন এ রিলেশনশিপ’ স্ট্যাটাস চেঞ্জ হয়েছিলো এক সময় সেই মানুষটার শেষ পর্যন্ত স্থান হয় ব্লক লিস্টে। কিছু ক্ষেত্রে এর পরিণতি খুব ভয়ংকর রূপ ধারন করে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত এক বছরে রাজধানীতে দশটি হত্যাকাণ্ড আর সাতটি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। পুলিশি অনুসন্ধানে শেষ পর্যন্ত বেরিয়ে এসেছে ওইসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে ছিল লিভ টুগেদারের বিড়ম্বনা। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে খুনের শিকার হয়েছে মেয়েরা। দেখা গেছে, স্বামী-স্ত্রীর পরিচয়ে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এরা বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস করছে। এক পর্যায়ে মনোমালিন্য বা মেয়েটি গর্ভবতী হয়ে পড়লে তাকে ফেলে পালিয়ে যায় ছেলেটি। মেয়েটি এক ধরনের বাঁচার জন্যই আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।

গত এপ্রিল মাসে এক অজ্ঞাত তরুণীর লাশ পাওয়া যায় গাজীপুরের শালবন এলাকায়। পুলিশ অনুসন্ধানে জানা যায়, উত্তরা এলাকায় একটি বাড়িতে দুই-তিন বছর ধরে এক যুবকের সঙ্গে সে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে ভাড়া থাকতো। মে মাসে রাজধানীর গুলশান এলাকায় বাসার ভেতরে এক তরুণীকে খুন করে পালিয়ে যায় ঘাতক। তারাও ভাড়া থাকতো স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে।

সম্প্রতি ইংলিশ মিডিয়ামের ছাত্রী সাবিরা হোসাইন প্রেমিকের কাছ থেকে প্রতারিত হয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন। তিনি মডেলিংয়ের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। তার আত্মহত্যার পেছনের কারণ লিভ টুগেদার। আত্মহত্যার কারণ তিনি মৃত্যুর আগে ফেসবুকে লিখে গেছেন তিনি তার আত্মহত্যার জন্য নিজের প্রেমিককেই সরাসরি তার দায়ী করে গেছেন।

সাবিরা ও তার প্রেমিক নির্ঝর সিনহা রওনক স্বামী-স্ত্রীর পরিচয় দিয়ে রাজধানীর রূপনগর হাউজিংয়ের ১২ নম্বর রোডের ৫ নম্বর বাড়ির ছয় তলায় মাওলানা আব্দুল মান্নানের ফ্ল্যাটের একটি কক্ষ ভাড়া নিয়েছিলেন। ছয় মাসে আগে ৫ হাজার টাকায় ভাড়ায় ওঠেন। সপ্তাহে দু-তিন দিন সেখানে রাত কাটাতেন। অন্যসময় কক্ষ থাকতো তালা দেয়া। খাওয়া দাওয়াও করতেন বাইরে।

দুজনের ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে, নির্ঝর সিনহা রওনক পেশায় একজন ফটোগ্রাফার। তিন বছর আগে ফেসবুকের মাধ্যমে দুজনের পরিচয়। ওই সময় সাবিরা একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের স্ট্যান্ডার্ড ‘ও’ লেভেলের ছাত্রী ছিল। বিনা পয়সায় সাবিরার ফটোসেশন করে দেওয়ার মধ্য দিয়ে ঘণিষ্ঠতা গড়ে তোলেন নির্ঝর।

সাবিরাকে মডেলিংয়ে আসতে অনুপ্রাণিত করেন নির্ঝর। তৈরি হয় দুজনের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক। নির্ঝরের মাধ্যমে কয়েকটি পণ্যের মডেল হন সাবিরা। একপর্যায়ে প্রেমের বাহানায় ও বিয়ের প্রতিশ্রুতিতে সাবিরার সঙ্গে নির্ঝর গড়ে তোলেন অনৈতিক সম্পর্ক। স্বপ্নের সংসার সাজানোর মোহে মোহনা টেলিভিশনে বিপনন বিভাগের নির্বাহী হিসাবে চাকরি নেন। সেখান থেকে পরে গানবাংলা নামে আরেকটি চ্যানেলে একই পদে যোগ দেন। সংসারে খরচ মেটাতে সাবিরা উপার্জনে নামলেও বিয়ে নিয়ে নির্ঝর টালবাহানা করতে থাকেন। প্রেমিকার উপার্জনের টাকায় লিভ টুগেদার করতে তার আপত্তি ছিল না, কিন্তু বিয়ের ব্যাপারে তার ছিল অনীহা।

ঘনিষ্ঠরা জানান, বিয়ের জন্য চাপ দেওয়ায় সাবিরাকে কিছুদিন ধরে এড়িয়ে চলতে শুরু করে নির্ঝর। শেষে উপায় না পেয়ে সাবিরা প্রেমিকের বাসায় গিয়ে হাজির হন বিয়ের দাবি নিয়ে। ওই সময় নির্ঝরের ভাই প্রত্যয় তার সঙ্গে প্রচণ্ড দুর্ব্যবহার করে বাসা থেকে বের করে দেয়। এই অপমান সহ্য করতে না পেরে সাবিরা আত্মহত্যা করেন।

সাবিরা হোসাইনের মতই রাজধানীর বনানী এলাকায় লিভ টুগেদারে মগ্ন ছিলেন নুরাত জাহান নিশা নামে আরেক ছাত্রী। বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে তার সঙ্গে লিভ টুগেদার করছিলেন আরেফিন হাসান। প্রায় ৪ মাস একসঙ্গে এক ছাদের নিচে ছিলেন তারা। হাসানের ইচ্ছা ছিল এভাবেই তাদের সম্পর্ক যাতে চলে যায়। কিন্তু এই বিষয়টি মানতে পারেননি নিশা। বারবার হাসানকে বিয়ে করার জন্য অনুরোধ করেন। কিন্তু হাসান নিশাকে বিয়ে করতে রাজি হচ্ছিলেন না। বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত জানতে পেরে নিশা একদিন সকালে বিষ পান করে আত্মহত্যা করেন।

আমি আমার বাবা-মাকে ছেড়ে এসেছি, সবকিছু ভুলে তোমাকে নিয়ে বাঁচতে চাই, আমার বাবা-মাও এখন আমাকে নিতে চাইবে না, এখন তুমি যদি আমাকে স্ত্রী হিসেবে স্বীকৃতি না দাও তাহলে আমার আত্মহত্যা করা ছাড়া আর কোন উপায় থাকবে না- আত্মহত্যার আগের রাতে এ কথাগুলোই ছিল হাসানের সঙ্গে নিশার শেষ কথা।

নিশার মা আরিফা বেগম জানান, নিশা এই ছেলের সঙ্গে থাকতো তা আমাদের জানা ছিল না। সে আমার সঙ্গে রাগ করে বাসা থেকে বের হয়ে যায়। আমি ভাবলাম রাগ কমে গেলে সে আবার আমার কাছে ফিরে আসবে। কিন্তু তা সে করলো না। তার বাবাকে জানিয়েছিল সে মহিলা হোস্টেলে থাকে। আমি আর তেমন কোন খোঁজখবর নেইনি। আমার মেয়ে এভাবে আত্মহত্যা করবে তা আমি বুঝিনি।

লিভ টুগেদারের আরো একটি ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটেছে গত দুই মাস আগে। লিভ টুগেদারের এক পর্যায়ে মেডিকেল কলেজের এক ছাত্রীকে হত্যা করা হয়েছে শয়ণকক্ষেই।

জানা গেছে, মেডিকেলের ছাত্রী মিথি ও তার প্রেমিক আরিফ হাজারীবাগের সুলতানগঞ্জের ৩/৫ নম্বর সচিবের গলির বাসার ষষ্ঠ তলার একটি কক্ষ সাবলেট হিসেবে ভাড়া নেন। ওই বাসার ভাড়াটিয়া নুসরাত সাথী জানান, মিথি ও আরিফ নিজেদের স্বামী-স্ত্রী পরিচয় দিয়ে একটি কক্ষ ভাড়া নিয়েছিলো। এক পর্যায়ে মিথির সহপাঠী একই মেডিকেল কলেজে পড়ুয়া রোমানা নাজনীন তার প্রেমিক আকিভ জাভেদ অনিকে স্বামী পরিচয় দিয়ে ওই বাসায় রাত কাটায়। একদিন রাতে তারা চারজন একসঙ্গে আড্ডাবাজি করে। একপর্যায়ে মিথি ও আরিফের মধ্যে ঝগড়া শুরু হলে তারা নিজেদের রুমে চলে যায়।
এসময় আরিফ কক্ষে উচ্চশব্দে গান বাজাতে থাকে। রাত ২টার দিকে আরিফ তাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে জানায় মিথি গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। পরে তারা মিথির কক্ষে গিয়ে মেঝেতে শোয়ানো অবস্থায় তার মৃতদেহ দেখতে পান। পরে জানা যায়, মিথিকে হত্যা করা হয়েছে।

মেডিকেলে পড়ুয়া মেয়ে মিথি কলেজ হোস্টেলে থাকতেন বলেই জানতেন তার মফস্বল শহরে থাকা বাবা-মা। প্রতি মাসে হোস্টেল খরচসহ অন্যান্য খরচ দিয়ে আসছিলেন নিয়মিতই। কিন্তু সেদিন ভোরে হঠাৎ জানতে পারেন মেয়ে মারা গেছে। শ্বাসরোধে তাকে হত্যা করা হয়েছে।

সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, বর্তমান গ্লোবালাইজেশনের প্রভাবে নানা ধরনের মুভি সিনেমা ডকুমেন্টারি আমাদের সমাজমানসে পাশ্চাত্য জীবনের নানা দিক প্রভাব ফেলছে, অনেকে সেটা গ্রহণ করছে। তার সঙ্গে আমাদের সমাজে ইন্ডিভিজ্যুয়াল বা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের সৃষ্টি হয়েছে। মানুষের চিন্তা ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছে। সে কারণে লিভ টুগেদারের সংখ্যা বাড়ছে।

সে ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, এরা স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে বাড়ি ভাড়া নিয়ে এক সঙ্গে থাকছেন, লিভ টুগেদার করছেন। এতে তাদের জৈবিক চাহিদাও মিটছে আবার সামাজিক নিরাপত্তাও থাকছে। আবার অনেক ছেলেমেয়ে মনে করছে লিভ টুগেদার করে কয়েক বছর কাটিয়ে দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়ে তারা আবার অবিবাহিত পরিচয়ে সমাজে ফিরে যাবে যাতে সমাজে তাদের মর্যাদা ঠিক থাকে। তবে সমাজে লিভ টুগেদার ভয়ঙ্কর ক্রাইম ডেকে আনছে।



« (পূর্বের সংবাদ)



মন্তব্য চালু নেই