মেইন ম্যেনু

ছাত্রীর লেখা অ্যাসাইনমেন্ট এর খাতা দেখে অবাক শিক্ষিকা!

রাজধানীর একটি কলেজের বাংলার একজন শিক্ষিকা দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন বিষয়ে অ্যাসাইনমেন্ট লিখে জমা দিতে বললেন। একজন ছাত্রীকে তিনি অ্যাসাইনমেন্ট দিলেন ‘পিকনিক থেকে ফিরে এসে ডায়েরি বা দিনলিপি’ লেখা বিষয়ে।

ওই ছাত্রী অ্যাসাইনমেন্ট খাতায় যা লিখে জমা দিয়েছে তাতে বিস্ময়ে হতবাক শিক্ষিকা। অ্যাসাইনমেন্ট খাতায় ওই ছাত্রী যা লিখেছে তার মূলকথা হলো আফজাল নামে একজন ক্লাসমেটকে ভালো লাগে তার। আফজাল সবসময় কালো শার্ট পরে ক্লাসে আসে। তাই তার দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য সেও পিকনিকে গেছে কালো শাড়ি পরে। পিকনিক থেকে ফিরে এসে শাড়ি পরা অনেক ছবি ফেসবুকে আপলোড করেছে সে। তাতে অনেকে অনেক ধরনের কমেন্টও করেছে এবং লাইক দিয়েছে। কিন্তু আফজাল ফেসবুকে অ্যাকটিভ থাকা সত্ত্বেও এখনো তার ছবিতে কোনো লাইক না দেয়ায় ও কমেন্ট না করায় সে মর্মাহত।

অ্যাসাইনমেন্ট খাতা পড়ার পর ক্ষুব্ধ শিক্ষিকা ছাত্রীকে ডেকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলেন। জবাবে ছাত্রী জানাল, সে যা লিখেছে তা কোনো সত্য ঘটনা নয়। একটি গ্রামার বইয়ে এ রকম একটি ঘটনা লেখা রয়েছে দিনলিপিতে এবং সেটি দেখে সে তার অ্যাসাইনমেন্টটি লিখেছে।

এবার শিক্ষিকা ছাত্রীর কাছ থেকে ওই বইটি সংগ্রহ করে ‘পিকনিক থেকে ফিরে এসে দিনলিপি’ শীর্ষক লেখাটি পড়ে আরো হতবাক হলেন। বইটিতে লেখা হয়েছে..

‘উফফ। যা একখান ঝক্কি গেল। শরীরের হাড্ডি- মাংস কিমা হয়ে গেছে। সারা শরীরে ক্লান্তি, অবসাদ। চোখ বুঝে আসছে ঘুমে। পিকনিক থেকে ফিরে এলাম। হট শাওয়ার নিয়েছি। আফজাল হোসেন, বম্পি সব সময় কালো শার্ট পরে, তাই আমিও বেছে নিয়েছিলাম কালো শাড়ি। সবার চোখ ট্যারা হয়ে গেছে। গ্রুপছবিতে আমাকে চেনা যাচ্ছে আলাদা করে। বাসায় ফিরেই আমার ফেসবুক ওয়ালে বাছাই করা তিনটি ছবি আপলোড করেছি। দারুন দারুন সব কমেন্টস করা হচ্ছে। কিন্তু আফজাল এখনো কোনো কমেন্ট করেনি। অথচ ফেসবুকে ওকে এ্যাকটিভ দেখাচ্ছে।

বাসে আমি বসেছিলাম জানালার পাশে, ও বসেছিল ঠিক আমার দুই সারি পেছনে। ওর বন্ধু আল ফারাবি রিয়েল ও হৃদয় খান বারবার আমার দিকে তাকালেও ও একবারও আমার দিকে তাকায়নি। পিকনিকে যাওয়াই আমার ভুল হয়ে গেছে। মহা ভুল। বাসে নাস্তার বক্সে দেওয়া হয়েছিল আপেল, কলা আর একটা নিমকি। অথচ জার্নি করার সময় আমি মিষ্টি খেতে পারি না। বমি আসে। বাসে রিয়েল একটা প্যাকেট আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে ‘আফজাল পাঠিয়েছে।’ খুলে দেখি বার্গার সমুচা আর সিঙ্গারা। কাচ্চি বিরিয়ানি আমি খাই না অথচ আমাদের পিকনিকে দুপুরের মেনুই ওটা। খাবার সময় আলাদাভাবে তাই কাঁঠাল গাছটার তলায় গিয়ে বসেছিলাম। হৃদয় একটা প্যাকেট আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে ‘আফজাল পাঠিয়েছে।’ খুলে দেখি- চিকেন বিরিয়ানি।

ঘুম নষ্ট হয়ে গেছে। ল্যাপটপ খুলে বসে আছি। আমার ছবিতে কত ফ্রেন্ডস লাইক দিচ্ছে, কমেন্টস করছে। কিন্তু কিন্তু কান্নার একটা ধাক্কা আসে। সেটা সামলে নিয়ে আবার ওয়ালে তাকাই। আমার প্রোফাইল পিকচারটা চেঞ্জ করেছিলাম গত সপ্তাহে। ফাটাফাটি এসেছে ছবিটা। ছবিতে আমার মামাতো ভাই তনয় আমার হাত ধরে হাসছে। আমিও বত্রিশ দাঁত বের করে হাসছি।’

বইটির নাম ‘উচ্চতর বাংলা ব্যাকরণ ও নির্মিতি।’ বইয়ের কাভার পেজে প্রফেসর নিরঞ্জন অধিকারী ও প্রফেসর ড. শফিউদ্দিন আহমদের নাম লেখা রয়েছে। বইয়ের ওপরে লেখা হয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড এবং বাংলা একাডেমির প্রমিত বাংলা বানানরীতি অনুসারে উচ্চমাধ্যমিক, স্নাতকসহ (পাস ও অনার্স) কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য রচিত। বইয়ের ওপরে আরো লেখা হয়েছে ২০১৪-২০১৫, ২০১৫-২০১৬ শিক্ষাবর্ষের নতুন সিলেবাস অনুসারে প্রণয়ন করা হয়েছে।

বিস্মিত ওই শিক্ষক এ প্রতিবেদককে জানান, বইটি সংগ্রহ করে তিনি নাড়াচাড়া করে দেখেছেন এবং বইটিতে প্রচুর বানান ভুল রয়েছে। বিভিন্ন বিষয়ে বইয়ের ভাষাও যাচ্ছেতাই ধরনের।

এ ব্যাপারে খোঁজ নেয়ার জন্য রাজধানীর দু’টি নামকরা কলেজের পাশে অবস্থিত দু’টি লাইব্রেরিতে গিয়ে জানতে চাওয়া হয় ওই নামে কোনো গ্রামার বই আছে কি না। দু’টি লাইব্রেরিতেই বইটি পাওয়া যায়। এরপর খোঁজ নিয়ে আরো জানা গেল, রাজধানীসহ দেশের অনেক নামকরা কলেজ থেকেই বইটি পড়ার জন্য শিক্ষার্থীদের রেফার করা হচ্ছে।

বিশালাকৃতির বইটির মোট পৃষ্ঠাসংখ্যা ১৩৫১। একটি নামকরা প্রকাশনা সংস্থা বইটি প্রকাশ করেছে এবং ৪৮০ টাকায় বিভিন্ন লাইব্রেরিতে বইটি বিক্রি হচ্ছে। বইটি দেখতে সুদৃশ্য কিন্তু ভেতরের অনেক বিষয় রয়েছে যাকে মার্জিত বলা যায় না।

অ্যাসাইনমেন্ট প্রদানকারী শিক্ষিকা বলেন, ‘পিকনিক থেকে ফিরে এসে দিনলিপি’ শিরোনামে একজন ছাত্রীর বরাতে বইটিতে যা লেখা হয়েছে তা কখনো কাউকে ভালো কিছু শেখাতে পারে না। তার মতে, পাঠ্যবইয়ে এ জাতীয় বিষয় অশোভন ও অনৈতিক। তিনি প্রশ্ন করে বলেন, এ লেখাটি পড়ে একজন শিক্ষার্থী কী শিখবে। এমনিতেই আমাদের সমাজে নানা কারণে বিভিন্ন ধরনের অনাচার-বিকৃতি ছড়িয়ে পড়ছে। তারওপর কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য এ জাতীয় লেখাকে উসকানিমূলক বলে মনে করেন তিনি।

সূত্র: নয়াদিগন্ত






মন্তব্য চালু নেই