মেইন ম্যেনু

ছেলেদের কাঁদতে মানা?

ছেলেদের নাকি কাঁদতে মানা। ছোটো থেকে সব ছেলে শিশুকেই বার হয়, শুধু মেয়েরাই কাঁদবে। কিন্তু কান্না মানুষের খুবই স্বাভাবিক আবেগের বহিঃপ্রকাশ। এই আবেগ রুদ্ধ করে দেয়ার কারণ ও সমস্যা নিয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্টে নিবন্ধ লিখেছেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ লিনা আবদুর্নি। তিনি দেখিয়েছেন, কান্না নিয়ে এই অবস্থান পুরুষতান্ত্রিক, কান্না রুদ্ধ করা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকার।

এসময় নিজের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘একবার আমি আমার তিন ছেলেকে নিয়ে চিরিয়াখানায় গেলে দেখতে পাই, একজন লোক তার তিন বছর বয়সী ছেলেকে ধমকাচ্ছেন যে মেয়েদের মতো কান্নাকাটি করবে না।’

লিনা বলেন, কান্না তো শুধু মেয়েদের নয়, সব মানুষেরই আবেগের বহিঃপ্রকাশ। ছেলেরা মেয়েদের মতো করা নয়, এটা সবারই বৈশিষ্ট্য। এমনটা নয় যে শুধু মেয়েদেরই আবেগ রয়েছে তাই তারা প্রকাশ করতে পারবে। কিন্তু পুরুষের জন্যও যে এটা স্বাভাবিক এটা কোনোভাবেই মানা হয় না।

হতাশা ও সম্পর্ক বিষয়ক বিশেষজ্ঞ এই মনোবিজ্ঞানী আরো বলেন, পুরুষরা আসলে তাদের হতাশা কাটিয়ে উঠতে পারে না কারণ তারা আবেগ প্রকাশ করতে পারে না। আর এটা আসলে শৈশব থেকেই শুরু হয়। এজন্যই আসলে পুরুষরা হতাশ হয়ে অন্য পথ ধরেন, কেউ ধূমপান করেন কেউবা মাদকাসক্ত জয়ে পড়েন। মানসিক সমস্যা তাদের মাঝেই বেশি দেখা যায়। গবেষণা তথ্যমতে, পুরুষদের আত্মহত্যার হার নারীদের চেয়ে ৪ গুণ বেশি।

তিনি বলেন, তার অফিসে বসেই অনেক ‍পুরুষ কান্নায় ভেঙে পড়েন, কারণ তারা তাদের আবেগ ও কষ্ট অনেকদিন ধরেই জমিয়ে রেখেছিলেন। তাদের নিজের আবেগের এই প্রকাশ আসলে তাদেরকে হতাশা থেকে অনেকাংশে মুক্তি দিতে পারতো।

নিজের আবেগ সম্পর্কে বোঝা কখনোই খুব কঠিন নয় কিন্তু নিজের মনের জটিলতার অবসান বেশ কঠিন। বিশিষ্ট সাংবাদিক ও অধ্যাপক ড. মার্ক ল্যামন্ট হিল এক ‍টুইটবার্তায় বলেছিলেন, ‘আধিপত্যবাদী পৌরুষের একটা দুঃখজনক বিষয় হলো যে আমাদের শেখানো হয় যে রাগ ছাড়া অন্য যেকোনো আবেগের বহিঃপ্রকাশ আসলে খুবই অপুরুষালি। পুরুষ হিসেবে খুব ছোটো থেকেই আমাদের শেখানো হয় যে আমাদের ইচ্ছা প্রকাশ করা যাবে না না, ভয় প্রকাশ করা যাবে না। আর এটাই আমাদের মনোগতভাবে পঙ্গু করে ফেলে। আমাদের জীবনের অনেক কিছুই অস্পষ্ট থেকে যায়। অনেকেই অনিশ্চতভাবে আবেগের বশে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। আমার ক্ষেত্রে অন্তত এমনটাই ঘটেছে।’

লিনা বলেন, আমাদের সন্তানদের আবেগের বহিঃপ্রকাশে উৎসাহিত করলে তারা নিজেদের ব্যাপারে আরও সচেতন হয়ে উঠতে পারে। সম্পর্কের ব্যাপারে আরো সতর্ক হতে পারে। যেই ব্যক্তির নিজের আবেগ সম্পর্কে ভালো ধারণা আছে সেই ব্যক্তি অন্যের ভালোবাসাও বুঝতে পারবে। যারা নিজের আবেগ প্রকাশ করতে পারেন মানসিক ও শারীরিকভাবে তারা অন্যদের চেয়ে বেশি সুস্থ।

আর কিভাবে ছেলেদের মাঝে এই বার্তা পৌছানো সম্ভব সে বিষয়ে কিছু পরামর্শও দিয়েছেন এই বিশেষজ্ঞ।

১. বার্তার বিষয়ে সতর্কতা: অনেক সময় অসতর্কতায় আমরা শিশুদের কাছে অনেক বার্তা পৌছে দেই যা তাদের আবেগ প্রকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। ছেলেদের কাঁদতে মানা করা এমনই একটি বিষয়। রাগ এবং কান্না খুবই স্বাভাবিক আবেগ, তাই এগুলো প্রকাশে কখনোই এমন কথা বলা উচিত না। যখন কোনো শিশু আঘাত পায় আমরা তাদের বোঝানোর চেষ্টা করি যে কিছু হয়নি, কাঁদতে হবে না। কিন্তু তারা তখন একদমই ভালো থাকে না। তাই সেসময় একটু কষ্ট করে হলেও নিজেকে সামলানো উচিত আর তাকে বলা উচিত যে খুব বেশি লেগেছে কিনা। এতে করে সে বুঝতে পারবে যে তার ব্যাথা আপনি বুঝতে পেরেছেন এবং সে হাল্কা অনুভব করবে।

২. অনুভুতির তালিকা: কথাটি শুনতে খটকা লাগলেও এটা আবেগ বুঝতে শিশুদের খুবই সাহায্য করে। অনেকসময় বড়রাও এটা অনুসরণ করতে পারেন। এক্ষেত্রে যেকোনো অনুভূতির কারণ ও সমাধান খুঁজে বের করা সহজ হয়।

৩. সহানুভূতি: সহানুভূতি কারো কষ্ট লাঘবে খুব সাহায্য করে। এতে করে শিশু মনে করে তার আবেগের মূল্যায়ন করা হয়েছে। তাকে তার মতো করে বুঝতে চেষ্টা করলে তার মনে কোনো চাপ পড়বে না।

৪. আবেগকে স্বাভাববিক করা: আবেগ মানুষের একটি সুস্থ প্রক্রিয়া। একথাটি শিশুদের বোঝাতে পারলে তারা খুবই স্বাভাবিক অনুভব করবে। তাদের বোঝানো উচিত যে তার যেই অনুভূতি হচ্ছে বা রাগ কিংবা কষ্ট হচ্ছে সেটা সবারই হয়। ভয় পাওয়ার কিছুই নেই।

৫. বই পড়া: বাচ্চাদের সঙ্গে বই পড়া আসলে খুবই ভালো একটি অভ্যাস। এতে করে তারা তাদের আবেগ সম্পর্কে আরো নিশ্চিত হয় এবং বুঝতে পারে। একেক রকম বই তাদের একেক রকম অভিজ্ঞতার জন্য তৈরি করে।






মন্তব্য চালু নেই