মেইন ম্যেনু

জঙ্গি অর্থায়ন : জবানবন্দিতে যা বললেন শাকিলা

শহীদ হামজা ব্রিগেড নামের একটি জঙ্গি সংগঠনকে অর্থসহায়তা দেওয়ার অভিযোগে গত ১৮ আগস্ট রাতে ঢাকা থেকে গ্রেফতার হয়েছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা।

চট্টগ্রামের র‌্যাব-৭ শাকিলা ফারজানা ও তার সহযোগী দুই আইনজীবীকে প্রথমে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার লটমনি পাহাড়ে জঙ্গি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে অস্ত্র উদ্ধার মামলায় গ্রেফতার দেখায়। এর চার দিন পর হাটহাজারী থানার একটি সন্ত্রাসবিরোধী মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। দুটি মামলাতে শাকিলা ফারজানা ও অপর দুই আনজীবী সর্বমোট ছয় দিন রিমান্ডে ছিলেন। এই ছয় দিনের রিমান্ড শেষে দুই দফায় ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেছেন শাকিলা। এই জবানবন্দিতে মামলা পরিচালনার ধারাবাহিকতায় এক ব্যক্তির সঙ্গে ১ কোটি ৮ লাখ টাকা ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেনের সত্যতা স্বীকার করলেও জঙ্গি অর্থায়নের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন তিনি। তবে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা বলেছেন, পরোক্ষভাবে ব্যারিস্টার শাকিলা তার জবানবন্দিতে জঙ্গি অর্থায়নের কথা স্বীকার করেছেন।

আদালত সূত্র এবং মামলার কৌঁসুলিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হেফাজতে ইসলামের নেতাদের বেশ কিছু মামলা পরিচালনা এবং আসামিদের জামিন করিয়ে দেওয়ার অঙ্গীকারে ১ কোটি ২০ লাখ টাকায় চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন শাকিলা। কিন্তু চুক্তি অনুযায়ী আসামিদের জামিন করাতে ব্যর্থ হওয়ায় একাধিক দফায় ব্যাংকের মাধ্যমে একটি প্রাতিষ্ঠানিক হিসাব নম্বরে গৃহীত টাকার মধ্যে ১ কোটি ৮ লাখ টাকা ফেরত দেন তিনি।

শাকিলা জবানবন্দিতে জানিয়েছেন, তিনি একটি প্রাতিষ্ঠানিক হিসাব নম্বরে মক্কেলের কথামতো টাকা ফেরত দিয়েছেন। এই হিসাব নম্বরটি কার, তা তিনি জানতেন না।

ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানার সহযোগী দুই আইনজীবী হলেন অ্যাডভোকেট হাসানুজ্জামান লিটন ও ঢাকা জজকোর্টের অ্যাডভোকেট মাহফুজ চৌধুরী বাপন।

বুধবার দুপুর ১টা থেকে ২টা পর্যন্ত চট্টগ্রামের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শহীদুল ইসলামের আদালতে ছয় পৃষ্ঠার জবানবন্দি প্রদান করেন ব্যারিস্টার শাকিলা।

আদালত সূত্রে জানা যায়, জবানবন্দিতে শাকিলা বলেন, ২০১৪ সালের ৩০ মে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে ওসমান আমিন ও মাসুম নামের দুই ব্যক্তি ঢাকায় চেম্বারে শাকিলার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসেন। এই দুই ব্যক্তি চট্টগ্রাম থেকে গিয়েছেন জানিয়ে মামলার বিষয়ে কথা বলতে তারা শাকিলার সাক্ষাৎ প্রার্থী হন। শাকিলার সঙ্গে সাক্ষাৎকারী ওসমান আমিন তার বাসা খুলশী বলে জানায় এবং তার আমদানি-রপ্তানি ও শিপিং ব্যবসা আছে বলে জানায়। তার উচ্চতা আনুমানিক ৫ ফুট ৭ ইঞ্চি। প্রায় সমউচ্চতার মাসুমের থুতনিতে সামান্য দাড়ি আছে। ওসমান আমিনের দামি গাড়িও আছে। মাসুম ও ওসমান আমিন শাকিলাকে চট্টগ্রামের লালখান বাজার মাদ্রাসার গ্রেনেড বিস্ফোরণ মামলা, হেফাজতে ইসলামীর নেতা মুফতি হারুন ইজহারের মামলাসহ হেফাজতে ইসলামের ৩০০ থেকে ৩৫০টি মামলা পরিচালনার জন্য প্রস্তাব দেন। এই সময় শাকিলা আগন্তুকদের কাছে মামলাসংক্রান্ত কাগজপত্র দেখতে চান। কাগজপত্র পর্যবেক্ষণ শেষে শাকিলা মামলা পরিচালনায় আগ্রহী হন। মামলা পরিচালনার জন্য শাকিলা তাদের কাছে আরো কিছু কাগজপত্র সংগ্রহ করে দিতে বলেন। এই সময় উভয় পক্ষে কথোপকথনে সবগুলো মামলা পরিচালনা ও আসামিদের জামিনের জন্য ১ কোটি ২০ লাখ টাকায় মৌখিক চুক্তিবদ্ধ হন। আগন্তুক ব্যক্তিরা মামলার অবশিষ্ট কাগজপত্র এবং মামলা পরিচালনার ১ কোটি ২০ লাখ টাকা হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমির মুফতি ইজহারুল ইসলাম ও তার পরিবারের সদস্যরা পৌঁছে দেবেন বলেন জানান।

পরবর্তী সময়ে ওসমান আমিন ও মাসুম মিলে ২০১৪ সালের জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে শাকিলার চেম্বারে গিয়ে প্রথম ধাপে ২৫ লাখ টাকা দেন। এর পাঁচ-ছয় দিন পর এসে আরো ৩০ লাখ টাকা দেন।

পরবর্তী সময়ে আবার ১০-১২ দিন পর এসে আরো ৪৫ লাখ টাকা দেন। ২০১৪ সালের জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে চেম্বারে গিয়ে আরো ২০ লাখ টাকা দেন ওই দুই ব্যক্তি।

জবানবন্দিতে শাকিলা আরো জানান, চুক্তি অনুযায়ী ধার্যকৃত টাকার প্রথম কিস্তি পাওয়ার পর থেকে ২০১৪ সালের জুন মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকেই শাকিলা হাইকোর্টের বিভিন্ন বেঞ্চে হেফাজতে ইসলামের আসামিদের জামিন শুনানি করতে থাকেন। কিন্তু জামিন করাতে ব্যর্থ হন। শাকিলা বারবার চেষ্টা করও হেফাজতের মামলার আসামিদের জামিন করাতে ব্যর্থ হলেও অ্যাডভোকেট ডেইজি নামের এক আইনজীবী মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সংঘর্ষের মামলায় হেফাজতে ইসলামের কিছু নেতা-কর্মীর জামিন করিয়ে নেন। এতে মাসুম এসে শাকিলার কাছে বিরক্তি প্রকাশ করে বলেন, ‘অ্যাডভোকেট ডেইজি জামিন করিয়ে নিচ্ছেন আর আপনি কিছুই করতে পারছেন না।’ এই সময় মাসুম শাকিলার ওপর বিরক্ত হয়ে টাকা ফেরত চান। এই পর্যায়ে শাকিলাও বিরক্ত হয়ে টাকা ফেরত দিতে রাজি হন। টাকা ফেরতের প্রক্রিয়া হিসেবে মাসুম শাকিলাকে সানজিদা এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের নামে ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংকের একটি হিসাব নম্বর দেন এবং ওই নম্বরে টাকা ফেরত দিতে বলেন।

এরপর ২০১৪ সালের আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে শাকিলা ধানমন্ডিতে ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংকে মাসুমের বর্ণিত অ্যাকাউন্টে প্রথম দফায় ২৫ লাখ টাকা জমা দেন। ডিপোজিট স্লিপে নাম-ঠিকানাও শাকিলার উল্লেখ করা হয়। এর পাঁচ-ছয় দিন পর শাকিলার জুনিয়র অ্যাডভোকেট হাসানুজ্জামান লিটনের মাধ্যমে আরো ২৭ লাখ টাকা জমা দেওয়া হয়। সেপ্টেম্বরের শুরুতে লিটনকে দিয়ে শাকিলা ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংকের ওই অ্যাকাউন্টে এক দফায় ১৬ লাখ টাকা এবং দ্বিতীয় দফায় আরো ১৫ লাখ টাকা জমা দেন।

২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে শাকিলা ও অ্যাডভোকেট মাহফুজ চৌধুরী বাপন গিয়ে ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংকের ধানমন্ডি শাখায় ২৫ লাখ টাকা জমা দেন। এর ডিপোজিট স্লিপে বাপনের নাম-ঠিকানা উল্লেখ করা হয়। ওসমানের দেওয়া ১ কোটি ২০ লাখ থেকে ১২ লাখ টাকা নিজে ফি ও মামলা পরিচালনার খরচ বাবদ কেটে রেখে বাকি ১ কোটি ৮ লাখ টাকা তিনি তার মক্কেলকে ব্যাংকের মাধ্যমে ফেরত প্রদান করেছেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন শাকিলা।

জবানবন্দিতে শাকিলা দাবি করেছেন, গত ১৮ আগস্ট র‌্যাব-৭ ধানমন্ডির বাসা থেকে শাকিলাকে গ্রেফতারে পর তিনি জানতে পারেন সানজিদা এন্টারপ্রাইজ নামের ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংকের যে হিসাব নম্বরে তিনি টাকা জমা দিয়েছেন, ওই হিসাব নম্বরের মালিক মনিরুজ্জামান মাসুদ।

তিনি জানান, এই মনিরুজ্জামান মাসুদকে ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি দায়ের হওয়া সরকারবিরোধী আন্দোলনের একটি সংঘর্ষের মামলায় জামিন করিয়েছিলেন তিনি। এই মনিরুজ্জামান যে সানজিদা এন্টারপ্রাইজ নামের হিসাব নম্বরের মালিক, তা তিনি আগে জানতেন না।

শাকিলার সঙ্গে গ্রেফতারকৃত অপর দুই সহযোগী আইনজীবীও প্রায় একই রকম জবানবন্দি প্রদান করেছেন বলে আদালত সূত্রে জানা গেছে। জবানবন্দি শেষে শাকিলাসহ তিন আইনজীবীকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত। শাকিলার আইনজীবীরা আদালতে জামিনের আবেদন জানালেও তা নাকচ হয়।






মন্তব্য চালু নেই