মেইন ম্যেনু

জনসাধারণের নয়, মাদকসেবীদের পার্ক

শ্রীহীন হয়ে পড়েছে ওসমানী উদ্যান। উদ্যানের দেয়াল ও বৃহৎ ফুলাধার; উদ্যানের সামনের ফুটপাথ; মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর পরিচিতি; উদ্যানের প্রবেশপথ, লেকসহ পুরো অবস্থাই হতাশাজনক। অন্যদিকে উদ্যানে স্থায়ী আবাসন গড়েছে ভাসমান ও মাদকসেবীরা। তাদের উৎপাতে সন্ধ্যার পর উদ্যানে যেতে ভয় সাধারণ জনগণ।

অন্যদিকে এসব স্থানে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর ভিত্তিক সংক্ষিপ্ত পরিচিতি ও বীরত্ব সূচক তথ্য লেখা ছিল। এখন তা অযত্ন-অবহেলায় রয়েছে।

নগরীর ব্যস্ততম এলাকা হিসেবে পরিচিত গুলিস্তানে একটু স্বস্তির জায়গা এই ওসমানী উদ্যান। এর ভেতরে রয়েছে সম্রাট আওরঙ্গজেবের প্রধান সেনাপতি মীর জুমলার কামানটি যা উদ্যানের শোভা বর্ধন করছে। এছাড়াও রয়েছে একটি লেক, মুক্তিযুদ্ধে সেক্টর কমান্ডারের বিভিন্ন ইতিহাস ঐতিহ্য সংবলিত ফলক।

তবে ব্যায়াম বা জগিং কিংবা ঘুরতে উদ্যানে গেলে প্রথমেই বিরক্তি লাগে মাদক আর মলমূত্রের দুর্গন্ধে। উদ্যানের প্রবেশ পথে বসানো ঐতিহাসিক কামানটির কোন পরিচিতি নেই। এর ভেতরে ঘাস নষ্ট হয়ে মাটি বের হয়ে পড়ছে। বিভিন্ন ধরনের হকারের ব্যবহৃত জিনিসপত্র রাখা আছে এর ভেতরে। রমনা মৌজার এ উদ্যানে জমি রয়েছে ২৩ দশমিক ১৪০০ একর। এরশাদ আমলে উদ্যানটি গণপূর্ত অধিদফতর থেকে সিটি করপোরেশনকে পরিচালনার জন্য দেওয়া হয়েছে।

গেট দিয়ে ঢুকলেই চোখে পড়ে মুক্তিযুদ্ধের তিন নম্বর সেক্টর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি ও বীরত্ব সূচক তথ্য লেখা। এর সামনে দর্শনার্থীদের বসার জন্য বেঞ্চ। এসব বেঞ্চ ভাসমান মানুষদের ঘুমানোর বিছানা হয়েছে। বাকি আছে যতটা জায়গা তাও আবার হকারদের দখলে।

উদ্যানের ভেতরে মুক্তিযুদ্ধের ১১টি সেক্টরের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি ও বীরত্ব সূচক তথ্য লেখা বাংলাদেশের মানচিত্র আছে।সবগুলোই এখন শ্রীহীন হয়ে গেছে।

সংস্কার না থাকায় উদ্যানের পুকুর ও সুদৃশ্য লেকের পানি নোংরা হয়ে গেছে।

উদ্যানের ভেতর মাদকসেবীদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। দলে দলে বিভক্ত হয়ে তারা মাদকসেবন করে। মাতাল হয়ে পড়লে উদ্যানের বসার স্থান কিংবা মাটিতে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ে তারা।

মজিদ মিয়া নামে একজন চা বিক্রেতা জানান, উদ্যানে সারাদিন ভবঘুরে, মাদকসেবী, হকারদের আড্ডা থাকে। উচ্চ শ্রেণি কিংবা দেখতে শিক্ষিত বা অভিজাত বলে মনে হয়, এমন কাউকে দেখা যায় না। তবে সচিবালয়ে তদবিরে যাওয়া লোকজন প্রতি কর্মদিবসের সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত উদ্যানের উত্তরাংশে অবস্থান করে। সন্ধ্যার পর পুরো উদ্যান চলে যায় যৌনকর্মীদের দখলে।

সন্ধ্যায় ওসমানী উদ্যানে সচিবালয় অংশের গেট দিয়ে প্রবেশ করার সময় কোন নিরাপত্তা রক্ষীকে দেখা যায়নি। ভেতরে প্রবেশ করে দেখা গেছে, প্রকাশ্য চলছে মাদকের কেনা বেচা। কিন্তু তাদের বাধা দেয়ার জন্য নেই কোন নিরাপত্তা ব্যবস্থা। একই ভাবে মূল প্রবেশ গেটে গিয়েও একই অবস্থা দেখা গেছে।

বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে কাগজপত্র তৈরি করে ওসমানী উদ্যানের একাংশ দখলে নিতে চেয়েছিল প্রভাবশালী একটি চক্র। এর পাশাপাশি একজন ওয়ার্ড কাউন্সিলের নেতৃত্বে উদ্যানের ভেতর বাস স্ট্যান্ড করার চেষ্টাও হয়েছিল।তবে পরিবেশবাদীদের আন্দোলনের মুখে তৎকালীন মেয়র সাদেক হোসেন খোকার হস্তক্ষেপে কোটি টাকা ব্যয়ে উদ্যানের নতুন সীমানা দেয়াল ও উদ্যানের ভেতর পায়ে হাটার পথ নির্মাণ করে দেওয়া হয়। এরপর উদ্যানটি দখলদারদের কবল থেকে রক্ষা পেলেও পার্কটি সমাদর হারিয়েছে।

গত আগস্টে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) পার্কটির বিষয়ে একটি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, উদ্যানের ভেতরে একটি লেক থাকলেও এর পানি দুর্গন্ধযুক্ত ও অপরিচ্ছন্ন। পানিতে শেওলা জমে গেছে। উদ্যানের ভেতরে লোকজন হাঁস-মুরগি, ছাগলসহ পশুপালনের করে। লেকের পাড় হাঁস-মুরগির বিষ্ঠায় পরিপূর্ণ। উদ্যানের চারপাশ থেকে এর ভেতরে ময়লা আবর্জনা নিক্ষেপ করা হচ্ছে। সিটি কর্পোরেশনের সুইপাররা থাকলেও পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কাজ করছে না।

উদ্যানের পরিচ্ছন্নতার জন্য রয়েছেন ৯ জন কর্মী। সার্বিক নিরাপত্তা রক্ষায় রয়েছেন ১২ জন। কিন্তু তাদের দেখা মেলে না।

জানতে চাইলে বাপার সাধারণ সম্পাদক আবদুল মতিন বলেন, ‘এটা একটা অবহেলিত উদ্যান। মাদকসেবী ও ভবঘুরেদের আখড়া হয়ে গেছে এটা। সরকারের উচিত হবে জরুরি ভিত্তিতে উদ্যান রক্ষায় প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া’।

আবদুল মতিন বলেন, ‘আমরা মেয়রের সঙ্গে আলোচনা করেছি। তিনি আমাদের জানিয়েছেন উদ্যানটি নতুন করে সাজানো হবে। এর জন্য একজন ডিজাইনারও নিয়োগ করেছি। আগামী দুই বছরের মধ্যে এটি নতুন করে তৈরি করা হবে’।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা খালেদ আহমেদ বলেন, ‘উদ্যান থেকে ভবঘুরে ও মাদকসেবীদের উচ্ছেদ করার জন্য প্রায়ই ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যেমে অভিযান চালানো হয়। তবে অভিযান চালিয়ে চলে যাওয়ার পর তারা আবার উদ্যানে ঢুকে। রাতের বেলায় উদ্যান এলাকায় নিরাপত্তা বৃদ্ধির জন্য আনসার সদস্য নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এছাড়াও উদ্যান এলাকায় রাতের বেলায় লাইটিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে’।






মন্তব্য চালু নেই