মেইন ম্যেনু

জন্মাষ্টমীর শিক্ষা : দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালন

চিররঞ্জন সরকার : আজ জন্মাষ্টমী। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পবিত্র জন্মতিথি। সনাতন ধর্মাবলম্বী ভক্তরা বিশ্বাস করেন, পৃথিবী থেকে দূরাচারী দুষ্টদের দমন আর সজ্জনদের রক্ষার জন্যই মহাবতার ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই দিনে স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছিলেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এই আবির্ভাব তিথিকে ভক্তরা শুভ জন্মাষ্টমী হিসেবে উদযাপন করে থাকেন।

বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের মধ্যে শ্রীকৃষ্ণের জন্মদিনটিও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। জন্মাষ্টমীর রেশ বৃন্দাবন, মথুরা, গোকুল কিংবা দ্বারকার সীমানা ছাড়িয়ে আসমুদ্র হিমাচল ছড়িয়ে পড়েছে। ধর্মীয় বিশ্বাস ও বৈষ্ণবধর্মের প্রভাবে শ্রীকৃষ্ণ বা গোপাল হয়ে উঠেছেন ভক্তের ভগবান। আর সেই বিশ্বাসের সূত্র ধরেই তিনি ভক্তদের কাছে দেবতা থেকে ঘরের আপনজনে পরিণত হয়েছেন। তাই তার পুজো-পার্বণের সঙ্গে যোগ হয়েছে নানা লৌকিক আচার অনুষ্ঠানও।

হিন্দু ধর্মবালম্বীদের মতে, ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালন এবং ধর্ম রক্ষার লক্ষ্যে মহাবতার ভগবানরূপে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। শ্রীকৃষ্ণের প্রাচীনতম উল্লেখ পাওয়া যায় বৈদিক সাহিত্যে। ঋদ্বেদে একাধিকবার শ্রীকৃষ্ণের উল্লেখ আছে। মহাভারত, বিভিন্ন পুরাণ, শ্রীমদ্ভাগবত গীতা এবং বৈষ্ণবকাব্যে যে কৃষ্ণের কাহিনি বর্ণিত হয়েছে, তাতে তাঁর আবির্ভাব দ্বাপর যুগে, যাদব বংশে।

সবচেয়ে প্রচলিত পৌরাণিক কাহিনী মতে, খ্রিষ্টপূর্বে ১৫০৬ অব্দে শ্রীকৃষ্ণ জন্ম নেন মথুরার এক অত্যাচারী রাজা কংশের কারাগারে। মগধের অধিপতি জরাসন্ধ ছিলেন এক রাজ্যলোভী রাজা। তিনি ১৮ বার মথুরা আক্রমণ করেও ব্যর্থ হন। এই ব্যর্থতার গ্লানিতে জরাসন্ধ অস্থির উন্মাদ হয়ে শেষে আশ্রয় নেন এক কুটকৌশলের, মথুরার রাজা উগ্রসেনের পুত্র কংসকে নিজ দলে ভিড়িয়ে তার দুই মেয়েকে অত্যাচারী কংসের সঙ্গে বিয়ে দেন হীনস্বার্থ হাসিলের জন্য। কংসের সিংহাসন লাভের দুর্বিনীত আকাঙ্ক্ষার ফলে জরাসন্ধের সঙ্গে এই আত্মীয়তার সম্পর্ক স্থাপন হলে তারা দুজনেই অনেকাংশে বলশালী হয়ে উঠেন।

তাদের এই উত্থানে মথুরাবাসী উৎকন্ঠিত হয়ে পড়েন। কারণ মথুরাবাসী ছিল অত্যন্ত দেশপ্রেমিক, গণতান্ত্রিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ। বিশেষ করে যাদবরা তাদের চিরশত্রু জরাসন্ধের সঙ্গে কংসের আত্মীয়তার বন্ধনকে মনে মনে ধিক্কার জানায়। মনেপ্রাণে তারা হয়ে ওঠে আরো বিদ্রোহী। এদিকে ক্ষমতালোভী কংস পিতা উগ্রসেনকে বন্দী করে মথুরার সিংহাসন দখল করে। তখন আত্মীয়-স্বজন ও বিশেষ করে যাদবকূল বিদ্রোহী হয়ে উঠলে তাদের সঙ্গে আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে বিদ্রোহ প্রশমনে কৌশল হিসেবে কংস যাদবকূলের শুর সেনের পুত্র তার বিশ্বস্ত বন্ধু বাসুদেবের সঙ্গে তার বোন দেবকীর বিয়ে দেন।

কংসের আশা দুরাশায় পরিণত হল। সদ্য পরিণীতা বোন দেবকীকে বাসুদেবসহ রথে করে নিয়ে যাবার সময় কংস এই দৈববাণী শুনতে পান; ‘এই বোনের অষ্টম সন্তানই হবে তোমার মৃত্যুর কারণ!’ মৃত্যুর আশংকায় উত্তেজিত কংস দেবকীকে হত্যা করতে উদ্যত হলে বাসুদের কংসকে এই বলে আশ্বস্ত করেন যে, দেবকীর গর্ভে যে সন্তান জন্ম নেবে তাকে কংসের হাতে তুলে দেবেন। কংস দেবকীকে তখন হত্যা থেকে বিরত থাকলেও বোন ও ভগ্নীপতিকে কারাগারে নিক্ষেপ করতে দ্বিধা করেননি। এই অবস্থায় বাসুদেব ও দেবকী কারাগারে দিন কাটাতে থাকেন।

তাদের একটি করে সন্তান জন্ম হয়, আর প্রতিজ্ঞামত সদ্যজাত সন্তানকে কংসের হাতে তুলে দেন বাসুদেব। সঙ্গে সঙ্গে সেই নবজাতককে নৃশংসভাবে হত্যা করেন কংস। এভাবে একে একে কংসের নিষ্ঠুর নির্মমতার শিকার হন বাসুদেব-দেবকী দম্পতির ছয়টি সন্তান। এদিকে গোকুলে বাস করতেন বাসুদেবের প্রথমা স্ত্রী রোহিনী, তার উদরে জন্ম নেয় পুত্রসন্তান, নাম তার বলরাম। একে একে দেবকীর সাতটি সন্তানকে হত্যার পর মৃত্যুর চিন্তায় উৎকন্ঠিত কংস হয়ে ওঠে দিশেহারা। এরপর দেবকী অষ্টম বারের মত সন্তান সম্ভবা হলে কারাগারে বসানো হয় কঠোর নিরাপত্তা।

চারদিকে আলোয় উদ্ভাসিত করে অষ্টমী তিথিতে অরাজকতার দিন অবসান দিন করতে গভীর অন্ধকার রাতে জন্মগ্রহণ করেন পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণ। শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে বাসুদেব দেখলেন শিশুটির চার হাতে শঙ্খ, চক্র, গদা এবং পদ্ম ধারণ করে আছেন। নানা রকম মহামূল্য মনি-রত্ন খচিত সব অলংকার তার দেহে শোভা পাচ্ছে। তিনি বুঝতে পারলেন জগতের মঙ্গলার্থে পূর্ণব্রক্ষ শ্রীকৃষ্ণই জন্মগ্রহণ করেছেন তাদের ঘরে।

বাসুদেব প্রণাম করে তার বন্দনা শুরু করলেন। বাসুদেবের বন্দনার পর দেবকী প্রার্থনা শেষে একজন সাধারণ শিশুর রুপ ধারণ করতে বললেন শ্রীকৃষ্ণকে। এর পর ঘটনা পরম্পরায় কৃষ্ণ-বধের নেশায় উন্মত্ত কংস মথুরায় মল্লক্রীড়ার আয়োজন করে। ক্রীড়া প্রাঙ্গণের সামনে পাগলা হাতি রাখা হয় কৃষ্ণকে পিষে মারার জন্য। বিকল্প ব্যবস্থা হিসাবে কংস চানুর ও মুষ্টির নামে দুই খ্যাতিমান মল্লবীরকে কৃষ্ণকে হত্যার জন্য উপস্থিত রাখেন।

অন্তর্যামী ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কংসের সব চক্রান্ত ব্যর্থ করে দেন। তার মুষ্ঠির আঘাতে মারা যায় হাতি, চানুর ও মুষ্টির। হতভম্ব কংস রাজন্যবর্গ সেনাদল সহচর সবাইকে তার পক্ষে অস্ত্রধারণ করতে বলেন, কিন্তু কেউ সাড়া দেয়নি। তখন নিরুপায় কংস যুদ্ধনীতি লংঘন করে অস্ত্রধারণ করা মাত্র কৃষ্ণ লৌহ মুষ্ঠির আঘাতে তাকে বধ করেন।

শ্রী কৃষ্ণের জীবনী পাঠ ও কর্মকাণ্ড এই শিক্ষাই দেয়, অন্যায় করে কখনও পার পাওয়া যায় না। ন্যায়ের জয় অবশ্যম্ভাবী। দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনের পাশাপাশি এক শান্তিময় বিশ্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রতি বছর শ্রীকৃষ্ণের জন্মদিন তথা জন্মাষ্টমী আমাদের মাঝে নিয়ে আসে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে এক শুভ আনন্দময় বার্তা।

সমাজে যখন হানাহানি, রক্তপাত, সংঘর্ষ, রাজ্যলোভে রাজন্যবর্গের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষ চরম আকার ধারণ করে, ঠিক তখন তার আবির্ভাব অনিবার্য হয়ে পড়ে। তিনি অর্জুনের মাধ্যমে গীতার আঠারোটি অধ্যায়ে জাগতিক জ্ঞান, ধ্যান, কর্ম, বিভূতি, ভক্তি, মুক্তি, মোহ, যশ, খ্যাতি আর অর্থ-বিত্তের মায়াজাল, অন্যায়, অসত্য, পাপ আত্মঅহংকার, মোক্ষ লাভ প্রভৃতি বিষয়ে জ্ঞান দান করেছেন। জীবকুলে তিনি সত্যের বাণী স্থাপন করেছেন।

বাঙালি কবি লিখেছিলেন, ‘কোথায় স্বর্গ? কোথায় নরক? কে বলে তা বহুদূর? মানুষেরই মাঝে স্বর্গ-নরক মানুষেতে সুরাসুর!’ সত্যি, স্বর্গ, নরক বা পাতাল কোথায় জানি না। আকাশে, না আমাদের পায়ের তলায়, মাটির অনেক নীচে? আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, ‘মানুষের মাঝে স্বর্গ-নরক মানুষেতে সুরাসুর।’ মর্তেই স্বর্গ-নরক ও পাতাল অবস্থিত। ঈশ্বর বা দেবদেবীও আমাদের মধ্যেই আছেন যেমন আছে নরকের ঘৃণ্য দানবেরা।

আরেকটি কথা, ‘গড ক্রিয়েটেড ম্যান’ অর্থাৎ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন ঈশ্বর কথাটি মেনে নিতে কোনও দ্বিধা যেমন নেই, (প্রকৃতির সমষ্টিগত ‘প্রাণশক্তি’র নামই তো ঈশ্বর) তেমনই অন্য দিকে মনে রাখতে হবে, মানুষই দেবতা বা দেবদেবীর স্রষ্টা। ঠাকুরের মূর্তি যাঁরা গড়েন, সেই ‘কুমোর’, বা মূর্তি-শিল্পীই তো সৃষ্টি করছেন, করেছেন কৃষ্ণ, গণেশ বা শিব, দুর্গা।

মানুষরূপে মর্তে ভগবান অবতার শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাবের মিথটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এর মধ্য দিয়ে আমরা সেই উলব্ধিতে পৌঁছতে পারি যে, মানুষের মধ্যেই ভগবানের বাস। তাই তো আরেক বাঙালি সাধক বলেছেন, ‘জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।’ বাংলাদেশ ধর্মীয় সম্প্রীতির দেশ। এখানে যুগ যুগ ধরে যে যার বিশ্বাস, পাস্পরিক শ্রদ্ধা, সব মানুষ সমান মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকারকেই সবচেয়ে বড় ধর্ম মনে করা হয়েছে।

হিংসা, বিদ্বেষ, হানাহানি, বৈষম্য, অন্যায়, অবিচার দূর করে সমাজকে শান্তিময় করে তুলতে যার যার অবস্থানে থেকে সবাইকে অবদান রাখতে হবে। শ্রীকৃষ্ণের আদর্শ ও শিক্ষা বাঙালির হাজার বছরের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করতে আমাদের সকলকে অনুপ্রাণিত করুক-আজকের দিনে এই প্রত্যাশা।

চিররঞ্জন সরকার : লেখক, কলামিস্ট।
[email protected] com






মন্তব্য চালু নেই