মেইন ম্যেনু

জলজটে স্তব্ধ রাজধানী : সমাধান কতদূর?

বৃষ্টি এলে জলাবদ্ধতার ভোগান্তি নতুন নয় ঢাকা শহরে। কিন্তু সারা বছর কি মনে থাকে এর কথা? থাকে না বলেই নালাগুলো পরিষ্কার করা হয় না নিয়মিত, খালগুলো ভরাট হয়ে থাকে সারা বছর, আর যে নাগরিকরা দুর্ভোগে পড়ে তারাও অসচেনতনার চূড়ান্ত রূপ দেখিয়ে যেখানে সেখানে ময়লা-আবর্জনা ফেলে যাচ্ছে।

এতে নালা বা খালগুলো পানি সরে যাওয়ার মতো অবস্থায় থাকছে না আর। পরিস্থিতি এমন যে আবর্জনা পরিষ্কার করলেও কিছুদিনের মধ্যেই আবার ভরাট হয়ে যায় খালগুলো।

এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত বাড়িঘর নির্মাণ, জলাশয় ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণ, নগরের সেবা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় না থাকায় পরিস্থিতি দিনকে দিন খারাপ হচ্ছে।

দুইদিনের জলাবদ্ধতার পর সেবা সংস্থাগুলোর কর্মকর্তারা যা বলছেন, তাতে উদ্বেগ বেড়েছে আরও। পানি নিষ্কাষণ ব্যবস্থাটি দেখার প্রকৃতপক্ষে কোন কর্তৃপক্ষ নেই ঢাকায়। ওয়াসা যে খালগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করে, সেগুলোর মালিকানা জেলা প্রশাসনের। পানি নিষ্কাষণের জন্য প্রায় আড়াইহাজার কিলোমিটার পাইপলাইন আছে নগরীতে। এর মধ্যে ৩২৫ কিলোমিটার পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি নিষ্কাষণ করে ঢাকা ওয়াসা। আর পানি উন্নয়ন বোর্ড পাম্পের সাহায্যে বৃষ্টির পানি বেড়িবাঁধের বাইরে নদীতে পানি ফেলে।

বর্ষার বৃষ্টি এখন এক ভয়ের নাম

গত মঙ্গলবার ৬০ মিলিলিটার বৃষ্টিতেই জলের ভোগান্তি হয়েছে ঢাকায়। মধ্য ঢাকায় বর্ষার শেষে সময়ে এসে এতো পরিমাণ বৃষ্টি এর আগে কখনও হয়নি। এ কারণে গ্রাভিটি ফ্লতে (স্বাভাবিক সময়ে পানির যে প্রবাহ থাকে) পানি নামতে পারেনি। ফলে জলজটের সৃষ্টি হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওয়াসার এক পদস্থ কর্মকর্তা বলেন, ‘সারফেস ড্রেনেজ সিস্টেমে ময়লা আবর্জনা জমে থাকা জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ, কেননা পানি স্বাভাবিক গতিতে নামতে পারেনি। এ অবস্থা দীর্ঘ দিন ধরেই চলছে।ফলে একটু বেশি বৃষ্টিপাত হলেই পানি জমে যায়। এখানে তো ওয়াসার কোনো হাত নেই।’

তাহলে ওয়াসার কাজ কী? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ডিপ ড্রেন বা সুয়ারেজ সিস্টেমে কোনো সমস্যা হলে সেটা ওয়াসা দেখবে।

কিন্তু ঢাকায় এখন যে কারণে পানি জমে সেটা হচ্ছে-রাস্তার পাশে সারফেস ড্রেনে ময়লা জমে থাকে-যেটা কি না প্রতিদিনই পরিষ্কার করার কথা’।

এই কর্মকর্তা বলেন, ‘এছাড়া বর্ষা মৌসুমে নদীর পানির স্তর অনেক উঁচুতে ওঠে যায়। এ কারণে ঢাকার আশপাশে যে নদী রয়েছে সেখানে সরাসরি পানি নামতে পারছে না। একারণে পাম্পিং করে পানি সরাতে হচ্ছে। এর ফলে পানি দ্রুত সরানো যাচ্ছে না। পানি জমে যাওয়ার এটি অন্যতম প্রধান কারণ।’

ওয়াসার তত্ত্বাবধানে চারটি পাম্পিং স্টেশন রয়েছে। এরমধ্যে বর্তমানে তিনটি পাম্পিং স্টেশনের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। বর্ষা শেষে নদীর পানি কমে গেলে রাজধানীর পানি নিষ্কাশনও সহজ হবে।

পানি নিষ্কাষণ ব্যবস্থা নিয়ে কথা বলতে চাইলে ঢাকা ওয়াসার উপব্যবস্থাপনা পরিচালক কামরুল আলম চৌধুরী বলেন, বিদ্যমান ড্রেনেজ ব্যবস্থায় ঘণ্টায় ১৫-২০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হলে পানি নিষ্কাশন করা সম্ভব। হঠাৎ করে এর চেয়ে বেশি হলেই জলজট তৈরি হয়।

ড্রেনেজ সিস্টেমে ময়লা জমে থাকায় পানি নামতে পারছে না। ময়লা পরিষ্কারে আপনারা কী করছেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের দায়িত্বে সুয়ারেজ সিস্টেম রয়েছে। সেটা আমরা বর্ষা মৌসুমের শুরুতে একবার পরিষ্কার করি। কিন্তু সারফেস ড্রেনেজ সিস্টেম তো দেখবে ডিসিসি। ’

আবর্জনা ব্যবস্থাপনা বড় সংকট

ঢাকা সিটিতে প্রতিদিন পাঁচ হাজার মেট্রিক টন ময়লা জমে। সিটি করপোরেশনের পাঁচ হাজার কর্মী এর অর্ধেক সরাতে পারে।

এদের মধ্যে আবার অনেকে আছে মাস্টার রোলে কাজ করে। অভিযোগ আছে- মাস্টার রোলে যারা কাজ করেন তাদের মধ্যে ফাঁকির প্রবণতা রয়েছে। দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ আছে তাদের মধ্যে। ডিসিসির কর্মকর্তারাই বলছেন, পরিচ্ছন্নতা কর্মী যারা আছেন, তারা যদি প্রতিদিনই দায়িত্ব নিয়ে যার যার এলাকায় পরিচ্ছন্নতার কাজে অংশ নেয় তাহলে ঢাকায় ময়লার জট থাকতো না।

তবে এ অভিযোগ মানতে নারাজ ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা রকিব উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘আমাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যদি নিয়মিত পরিচ্ছন্নতার কাজ না করতো তাহলে তো ঢাকাবাসী থাকতেই পারতো না।’ তিনি বলেন, আমাদের সীমাবদ্ধতা আছে। আমরা অনেক জিনিস চাইলেই করতে পারি না। আমাদের যথেষ্ট কর্মী নেই। যথেষ্ট অবকাঠামোগত সুবিধা নেই। তবে এসব সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে’।

ঢাকার বেশিরভাগ রাস্তার সারফেস ড্রেন সিস্টেমের মুখে ময়লা আবর্জনা জমে থাকে। এ কারণে পানি বের হতে পারে না। এ বিষয়ে রকিব উদ্দিন বলেন, ‘পরিচ্ছন্ন কর্মীরা সকালে পরিষ্কার করে চলে যায়। আবার পরদিন সকালে আসে। কিন্তু এর মাঝখানে কেউ খাবার খেয়ে পলিথিন রাস্তায় ফেলে রাখল। এরকম হাজারো জিনিস আমরা রাস্তায় ফেলে দেই এগুলোই কিন্তু বৃষ্টি হলে পানিতে ড্রেনের মুখে গিয়ে জমা হয়। এর ফলে পানি সরতে পারে না। এজন্য আমাদের নগরবাসীর সচেতন হওয়া খুব জরুরি।’

উন্নত বিশ্বের উদাহরণ দিয়ে এই কর্মকর্তা বলেন, ‘পৃথিবীর কোনো দেশেই যত্রতত্র ময়লা ফেলে না নাগরিকরা। আমাদের দেশে এই সংস্কৃতি চালু করতে হলে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে’।

নিচু এলাকা ভরাটের বিপদ টের পাচ্ছে নগর

ঢাকাতে অনেক জলাশয় ছিল। নিচু জায়গা ছিল। খাল ছিল। সেগুলো এখন আর নেই। সব ভরাট হয়ে গেছে। বাড়ি উঠছে। রাস্তা হচ্ছে। পানি সরানোর জায়গা ভরাট হয়ে যাচ্ছে। ড্রেন লাইন ব্লক হয়ে আছে। এসব কারণে সমস্যা আরও প্রকট হচ্ছে। এগুলো আগে ঠিক করতে হবে। তানাহলে সমস্যা বাড়বে ছাড়া কমবে না।

এ বিষয়ে ডিসিসি দক্ষিণের প্রধান বর্জ্য কর্মকর্তা রকিব উদ্দিন বলেন, আমরা প্রতিদিনই সারফেস ড্রেনেজ সিস্টেম পরিষ্কার করি। কিন্তু সুয়ারেজ সিস্টেমে সমস্যা থাকায় পানি ভালভাবে সরতে পারে না। যেটার দায়িত্বে আছে ওয়াসা।

ঢাকাবাসীর এই দুর্ভোগের কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের উপাচার্য অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী বলেন, আজকের জলাবদ্ধতার মূল কারণ জলাভূমি ভরাট করা। এই শহরে প্রতিদিনই জলাশয় ভরাট করে নতুন নতুন স্থাপনা তৈরি হচ্ছে। ফলে বৃষ্টিতে যে পানি জমা হচ্ছে তা সরাসরি নদীতে মিশতে পারছে না।

ঢাকায় জলজটের কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) আরবান অ্যান্ড রিজিওনাল প্লানিং বিভাগের অধ্যাপক সরোয়ার জাহান বলেন, ‘কোনো জায়গায় পানি জমলে সেই পানি কোথাও না কোথাও যেতে হবে। জমে থাকা পানি তো সরতে পারছে না। পানির পরিমাণ বেশি হওয়ায় মাটিও পানি শুষে নিতে পারছে না। এর কারণ হল- এই কংক্রিটের শহরে আমাদের ড্রেনেজ সিস্টেম উন্নত নয়।

তিনি বলেন, দুইটি ড্রেনেজ সিস্টেম আছে।একটি হচ্ছে আন্ডার গ্রাউন্ড ড্রেনেজ সিস্টেম। অন্যটি ওভার গ্রাইন্ড বা সারফেস ড্রেনেজ সিস্টেম। এগুলো ঠিক মত কাজ করছে না। নিচু জমি ভরাট হয়ে গেছে। ওভার সিস্টেমে ময়লা-পলিথিন জমে গেছে। সিটি করপোরেশন পরিষ্কার করছে না। ফলে পানির প্রবাহ কম। এজন্য পুরো ড্রেনেজ সিস্টেমকে উন্নত করতে হবে। এতে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। খাল বা লেকের সাথে শহরের কানেকটিভিটি বাড়াতে হবে। লো ল্যান্ড ভরাট করা যাবে না। আমাদের পাম্পিং ক্যাপাসিটি বাড়াতে হবে।

তিনি বলেন, জলাবদ্ধতার আরেক বড় কারণ হচ্ছে ‘বক্স কালভার্ট’। ধোলাইখাল কালভার্টের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, খালটির নিচে যেখানে ১২-১৪ ফুট জায়গা ছিল সেখানে এখন ময়লা-আবর্জনা জমে ৩-৪ ফুট জায়গা অবশিষ্ট আছে। এ ধরনের খাল নির্মাণ সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।

বুয়েটের সিভিল বিভাগের অধ্যাপক ড. মুজিবুর রহমান বলেন, ‘সমস্যা আসলে গোড়ায়। অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে আজকের এই সমস্যা। এই সমস্যা সামনে আরও ঘোরতর হবে। এই মেগাসিটির পানি সরানোর জন্য উন্নত কোনো ব্যবস্থা নেই। গত দুই দিন খুব বেশি বৃষ্টি হয়েছে সেটা বলা যাবে না। কিন্তু এই বৃষ্টিতেই ঢাকার এই অবস্থা। কিন্তু এর চেয়ে যদি বেশি বৃষ্টিপাত হয় তাহলে কি হবে সেটা সহজেই অনুমেয়।’

সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্টদের এখনই উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ঢাকার জলাশয়গুলো উদ্ধার করতে হবে। খালগুলো উদ্ধার করতে হবে। নিচু জায়গায় বাড়ি করা যাবে না। ড্রেনেজ সিস্টেম আরও উন্নত করতে হবে। এছাড়া সারফেস ড্রেনেজ এবং আন্ডার গ্রাউন্ড ড্রেনেজ সিস্টেম একই কর্তৃপক্ষের আওতায় নিয়ে আসতে হবে।’ঢাকাটাইমস।






মন্তব্য চালু নেই