মেইন ম্যেনু

জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবেলা

জাতিসংঘের সেরা প্রকল্প হচ্ছে ‘ভাসমান ফসল চাষ’

জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবেলায় জাতিসংঘের সেরা অভিযোজন প্রকল্পের স্বীকৃতি পেতে যাচ্ছে ‘ভাসমান ধাপে ফসল চাষ’ পদ্ধতি। কচুরিপানা, লতাপাতা, দুলালীলতা, শ্যাওলা, টেপাপানা, গুঁড়িপানা ইত্যাদি জলজ উদ্ভিদের সঙ্গে খড়কুটা ও নারিকেলের ছোবড়াগুঁড়া স্তরে স্তরে সাজিয়ে পানির ওপর ভাসমান ধাপ তৈরি করে তাতে সারা বছর ফসল উৎপাদন করে বিশ্বে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন বাংলার কৃষক।

এতে জলাবদ্ধতায় বছরের বেশির ভাগ সময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের হাজার হাজার একর ফসলি জমি পানিতে জলমগ্নতার অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে শুরু করেছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বছরের পাঁচ থেকে আট মাস হাত গুটিয়ে বসে না থেকে কৃষকরা নিজেরাই ফসল উৎপাদনের এ উপায় বের করেছেন। অনেক আগে থেকেই স্বল্প পরিসরে এ পদ্ধতিতে চাষাবাদ হলেও এখন এর ব্যবহার বেড়েছে। কৃষকদের নিজস্ব এ উদ্ভাবনী ‘ভাসমান কচুরিপানার ধাপ’ পদ্ধতি বিশ্বে নতুন রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে।

কৃষকরা ভাসমান ধাপে বাণিজ্যিকভাবে লাউ, শিম, বেগুন, ফুলকপি, ওলকপি, বরবটি, করলা, পুঁইশাক, মিষ্টিকুমড়া, ধনেপাতা, ডাঁটা, টমেটো, আদা, হলুদ পেঁপে ও মরিচের চারা বিক্রি করে ধান চাষের চেয়েও বেশি মুনাফা পাচ্ছেন।

শীতকালীন শাকসবজি উৎপাদনেও নজির স্থাপন করেছে এ পদ্ধতি। আর বর্ষায় যখন অতিবৃষ্টিতে ক্ষেতের শাকসবজি নষ্ট হয়ে যায়, তখন ভাসমান ধাপে বাম্পার সবজি উৎপাদন হয়।

পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের অধীনে জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ডের অর্থায়নে ‘বন্যা ও জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকায় জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজন কৌশল’ হিসেবে ভাসমান সবজি চাষ প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। চলতি বছর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর দেশের ৪২ উপজেলার জলমগ্ন এলাকায় এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি যখন সবাইকে আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলছে, তখন ভাসমান ধাপ পদ্ধতির ফসল চাষ আগামীর খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে দেখছেন কৃষি ও জলবায়ু গবেষকরা।

জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থার (এএফও) ‘কৃষি ঐতিহ্য অঞ্চল’ হিসেবে স্বীকৃতি পেতে যাচ্ছে ভাসমান ধাপ পদ্ধতির এ ফসল চাষ। আগামী ডিসেম্বরে প্যারিসে বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে এএফও জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবেলায় অভিযোজন বিষয়ে সেরা উদ্ভাবন হিসেবে ভাসমান ধাপে ফসল চাষ প্রকল্পকে ঘোষণা দিতে যাচ্ছে।

গত জানুয়ারিতে এ পদ্ধতিকে সম্ভাবনাময় গ্গ্নোবালি ইমপর্টেন্ট এগ্রিকালচারাল হেরিটেজ সিস্টেম (জিআইএএইচএস) সাইট হিসেবে স্বীকৃতিও দেয় সংস্থাটি।

কৃষিজমির বিকল্প হিসেবে ভাসমান জলাশয়ে ফসল চাষের এ পদ্ধতি কয়েক দশক ধরেই গোপালগঞ্জ, পিরোজপুর ও বরিশালের কৃষকদের কাছে জনপ্রিয়।

স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, ৪০০ বছর ধরে এ অঞ্চলে এ পদ্ধতিতে চাষাবাদ হয়ে আসছে। কৃষকদের জলবায়ু-সহিষ্ণু নিজস্ব এ উদ্ভাবনী দেশের জলমগ্ন অন্য এলাকায়ও ছড়িয়ে দিতে চলতি বছর থেকে জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ডের অর্থায়নে প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।

জলবায়ুবিষয়ক প্রতিষ্ঠান আইপিসিসির মতের বিপরীতে জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থার জলবায়ু পরিবর্তন ও কৃষি অভিযোজনবিষয়ক প্রতিবেদন বলছে, আগামী দিনগুলোতে বিশ্বের যে দেশগুলোতে খাদ্য উৎপাদন বাড়তে পারে, বাংলাদেশ তার একটি।

জলবায়ু-যুদ্ধে পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ এ দেশের মানুষের মনের জোর ও লড়াই করার শক্তি পৃথিবীতে রোল মডেল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তাই তো জলবায়ুর পরিবর্তন মোকাবেলা করে বাংলাদেশের মানুষ কীভাবে টিকে আছে, কোন কৌশলে তারা পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়াচ্ছে, তা জানতে বিশ্বের তাবৎ বড় বড় জলবায়ু বিজ্ঞানী বাংলাদেশে আসছেন।

অভিযোজন বিষয়ে বিশ্বের অন্যতম বড় গবেষণাকেন্দ্রটি বাংলাদেশে স্থাপন করা হচ্ছে। এরই মধ্যে ভাসমান ধাপে ফসল চাষ প্রকল্প সম্পর্কে চীন, থাইল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, জাপান ও ভারতের জলবায়ু বিজ্ঞানীরা গবেষণা শুরু করেছেন।

এ বিষয়ে ‘বন্যা ও জলাবদ্ধপ্রবণ এলাকায় জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজন কৌশল’ প্রকল্পের পরিচালক সাইফুল ইসলাম পাটওয়ারী বলেন, দেশের দক্ষিণের জলাভূমির ভাসমান ধাপ পদ্ধতির ফসল উৎপাদন এলাকা বৃদ্ধি পাচ্ছে। মূল উদ্ভাবন ক্ষেত্র বরিশাল, পিরোজপুর ও গোপালগঞ্জের বিভিন্ন বিল এলাকার পাশাপাশি এটা ছড়িয়ে পড়ছে যশোর ও খুলনার জলাবদ্ধ গ্রামে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের কাপ্তাই হ্রদেও তা পরীক্ষামূলকভাবে চাষের প্রচেষ্টা চলছে। আগামীতে এ প্রকল্প সারাদেশের জলাবদ্ধ এলাকায় ছড়িয়ে পড়বে। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের ক্রমাগত উচ্চতা বৃদ্ধিতে অদূর ভবিষ্যতে কৃষিজমি জলমগ্নতার যে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, সে ক্ষেত্রে ভাসমান ধাপে ফসল চাষের পদ্ধতি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তার এক নতুন মাত্রা যুক্ত করতে পারে।

এ বিষয়ে জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. মঞ্জুরুল হান্নান খান বলেন, পরিবর্তিত পরিবেশে এ পদ্ধতিকৃষকদের নিজস্ব একটি উদ্ভাবনী। এ পদ্ধতিতে সারা বছরই ফসল উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। এ পদ্ধতির চাষাবাদে কীটনাশক ও রাসায়নিক সারের ব্যবহার হয় না। এ পদ্ধতিতে টমেটো, বেগুন, শসা, মরিচ, শিম, গাঁদা ফুল, ফুলকপি ও বাঁধাকপি চাষ করে অনেকেই স্বাবলম্বী হয়েছেন।

গোপালগঞ্জ :‘জলজ জঞ্জাল কচুরিপানা আমাদের কাছে আশীর্বাদ। অবহেলিত এ উদ্ভিদকে কাজে লাগিয়ে আমরা সবজি বিপ্লব ঘটিয়েছি। এই যে দেখছেন জলের ওপর ভাসছে সবজি ক্ষেত, এটি সম্ভব হয়েছে কচুরিপানার বদৌলতে। ভাসমান সবজি চাষ আমাদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটিয়েছে। দূর করেছে দারিদ্র্য।’ কথাগুলো গোপালগঞ্জের পশ্চাৎপদ জলাভূমিবেষ্টিত টুঙ্গিপাড়া উপজেলার মিত্রডাঙ্গা গ্রামের সবজিচাষি সুনীল বিশ্বাসের।

জেলার টুঙ্গিপাড়া, কোটালীপাড়া, মুকসুদপুর, কাশিয়ানী ও সদর উপজেলার অন্তত শতাধিক গ্রামের বিলে এখন শুধু সবুজের সমারোহ। যেদিকে চোখ যায়, সেখানে শুধু ভাসমান সবজি আর সবজি। ভাসমান ক্ষেতে জন্মেছে লাউ, মিষ্টিকুমড়া, বরবটি, করলা, ঢেঁড়স, শসা, ঝিঙ্গা, কচু, লালশাক, ডাঁটা, বাঙ্গি, মরিচ, হলুদসহ প্রভৃতি শাকসবজি ও মসলা।

গোপালপুর গ্রামের প্রবীণ সবজিচাষি বিনোদ বিশ্বাস (৬০) জানান, জমির বহুবিধ ব্যবহারের জন্য কৃষকরা কচুরিপানা কাজে লাগিয়ে বর্ষা মৌসুমে সবজি উৎপাদন করছেন। অসময়ের এ সবজির তারা ভালো দাম পাচ্ছেন।

পানি শুকিয়ে যাওয়ার পর পচা কচুরিপানা তারা জমিতে কম্পোস্ট হিসেবে ব্যবহার করে উপকৃত হচ্ছেন। মিত্রডাঙ্গা গ্রামের ধাপচাষি তারাপদ বালা (৫৮) বলেন, এ বছর বর্ষায় আমি এক একর জমিতে ধাপ তৈরি করি। এতে আমার খরচ হয়েছে ৯০ হাজার টাকা। ধাপে উৎপাদিত ফসল বিক্রি হবে অন্তত দুই লাখ ৫০ হাজার টাকা। লাভ হবে এক লাখ ১০ হাজার টাকা।

টুঙ্গিপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ড. এইচ এম মনিরুজ্জামান বলেন, কচুরিপানা কাজে লাগিয়ে সবজি উৎপাদন প্রযুক্তি কৃষকরাই উদ্ভাবন করেছেন। এ পদ্ধতি দেশের জলাভূমিবেষ্টিত সব এলাকায় সম্প্রসারিত হলে বর্ষা মৌসুমে দেশের সর্বত্র শাকসবজির সংকট ঘুচবে। জলাভূমিবেষ্টিত এলাকার জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের পাশাপাশি আয় বাড়বে।

পিরোজপুর :সম্পূর্ণ পানির ওপর ভাসমানভাবে চাষাবাদ হয় বলে স্থানীয়ভাবে এ চাষাবাদ প্রক্রিয়াকে ভাসমান পদ্ধতির চাষাবাদ বলা হয়। গোটা বিলাঞ্চলের শত শত হেক্টর পতিত জমি এখন এ প্রক্রিয়ায় চাষাবাদের আওতায় এসেছে। ভাসমান পদ্ধতিতে উৎপাদিত শাকসবজি ও তরকারি স্বাদে যেমন হয় সুস্বাদু, তেমনি আকারেও হয় অনেক বড়। ফলে উৎপাদিত ফসলের বাজারমূল্যও থাকে ভালো।

উপজেলার মালিখালী, দীর্ঘা ও দেউলবাড়ী দোবড়া ও কলারদোয়ানিয়ার ভাসমান পদ্ধতিতে উৎপাদিত শাকসবজি ও তরিতরকারি ক্রয়-বিক্রয়কে কেন্দ্র করে স্থানীয় বৈঠাকাঠা ও মনোহরপুর বাজারে গড়ে উঠেছে আলাদা পাইকারি বাজার। মুগারঝোর গ্রামের সবজিচাষি জামাল জানান, চলতি মৌসুমে তার পাঁচ একর জমিতে বিভিন্ন জাতের শাকসবজি ও তরকারির আবাদ করা হয়েছে, যা থেকে সব খরচ বাদে কমপক্ষে এক লাখ-এক লাখ ২০ হাজার টাকা মুনাফা করা সম্ভব হবে।

কিশোরগঞ্জ :কিশোরগঞ্জে ভাসমান সবজি চাষ ও উৎপাদন চাষিদের মধ্যে ব্যাপকভাবে সাড়া জাগিয়েছে। সদর উপজেলার মহিন্দ গ্রামের আমিন সাদীসহ একাধিক ভাসমান সবজিচাষি জানান, ভাসমান পদ্ধতিতে অল্প খরচে অধিক পরিমাণ সবজি উৎপাদন হওয়ায় তারা আর্থিক সচ্ছলতা ফিরে পেয়েছেন। জলাবদ্ধ এলাকায় জলের নিচে মাছ চাষ আর ওপরে শাকসবজি উৎপাদন করে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে দারিদ্র্য দূর করে আশপাশের মানুষের জন্যও কিছু করতে পারছেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ সফিকুল ইসলাম বলেন, ভাসমান সবজি চাষ নতুন প্রযুক্তির নতুন সংযোজন। সারা বছরই ভাসমান সবজি চাষ করা সহজ। কৃষকদের এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। আগামী দুই বছরে জেলায় দুই হাজারের বেশি কৃষককে ভাসমান সবজি চাষের আওতায় আনা হবে।

জেলা প্রশাসক জি এস এম জাফর উল্লাহ ভাসমান সবজি চাষ ও উৎপাদন পদ্ধতি দেখে বলেন, আমার কর্মময় জীবনে মহিন্দ গ্রামে ভাসমান সবজি চাষ দেখে বিস্ময়কর মনে হয়েছে। পরে সবকিছু জেনে মনে হলো, আমাদের কৃষকরা পিছিয়ে নেই। নদী-খালে-পুকুরে কচুরিপানার ওপর সবজির বাগান সত্যি বিস্ময়কর। বাস্তবে না দেখলে তা বিশ্বাস করা কঠিন। আমাদের কৃষকরা জয় করবেই।

সদর উপজেলার অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা দিলরুবা আক্তার জানান, সদর উপজেলা কৃষি বিভাগের আয়োজনে বন্যা ও জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকায় জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজন কৌশল হিসেবে ভাসমান সবজি ও মসলা উৎপাদন প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় ২০১৪-১৫ অর্থবছরে সদর উপজেলার ৬০ কৃষক ও কিষানিকে হাতে-কলমে এ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। চাষিরা প্রশিক্ষণ পেয়ে ভাসমান শাকসবজি চাষাবাদে ব্যাপক উৎসাহিত হয়েছেন।

প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন পিরোজপুর প্রতিনিধি ফসিউল ইসলাম বাচ্চু, গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি মনোজ সাহা ও কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি সাইফুল হক মোল্লা দুলু। সমকাল






মন্তব্য চালু নেই