মেইন ম্যেনু

জীবনের নয়, কবরে লাশের নিরাপত্তা চাই

সম্প্রতি সংবাদপত্রে প্রকাশিত দুই-তিনটি সংবাদ পাঠে রীতিমত আঁতকে উঠেছি। সমাজ-রাষ্ট্রকে নিয়ে নতুনভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। আমাদের সমাজে অপরাধ প্রবণতা যে কতটা বৃদ্ধি পেয়েছে, আর নৈতিকতা-মূল্যবোধ কোন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে এই ঘটনাগুলো থেকে সহজেই অনুমেয়।

এর আগে হত্যা-গুম, অপহরণ, নারী-শিশু নির্যাতন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে অনেক লেখালেখি করেছি। কিন্তু আজকে যে বিষয়টি নিয়ে লিখছি তা যেন এই সভ্য সমাজে এক অসভ্যতার পদধ্বনি। সংবাদগুলো পাঠ করে নিজের মনোঃকষ্ট ভেতরে চাপা দিয়ে রাখতে পারিনি। তাই পাঠকদের সাথে তা শেয়ার করতেই আজ এখানে দু’কলম লিখতে বসেছি। ফলে কোনো ধরনের ভূমিকা ছাড়াই প্রথমেই সংবাদপত্রে প্রকাশিত ঘটনাগুলো তুলে ধরি।

এক. গত ২৬ জুলাই গাজীপুরের ধীরাশ্রম এলাকার গজারিয়া চালা কবরস্থান থেকে লাশ চুরি করতে গিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়ে আবেদ আলী ও তার ছেলে শাহজাহান। ১৩টি লাশ কবর থেকে তুলে কবরস্থানের পাশে একটি পরিত্যক্ত ঘরে গরম পানিতে লাশগুলোর পচা গোশত ছাড়ানোর চেষ্টা করছিল তারা। এসময় পুলিশী অভিযানে হাতেনাতে ধরা পড়ে তারা।

লাশ চুরি চক্রের অপর সদস্য আবদুল মোতালেবের ভাষ্য মতে, গত কয়েক বছরে গাজীপুর, টাঙ্গাইল ও ময়মনসিংহ এলাকার বিভিন্ন কবরস্থান থেকে তারা বেশ কয়েক হাজার লাশ চুরি করে। এরপর সেগুলো কঙ্কাল তৈরি করে বিক্রি করে দিয়েছে। একেকটি কঙ্কাল তারা মহাজনের কাছে বিক্রি করেছে পাঁচ হাজার টাকায়। তবে কয়েক হাত ঘুরে যখন মেডিকেল পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের কাছে এ কঙ্কাল পৌঁছে তখন এর দাম দাঁড়ায় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। প্রতি বছর দেশে কঙ্কালের চাহিদা রয়েছে আড়াই থেকে তিন হাজার। দেশে কঙ্কালের ব্যবসা অবৈধ হলেও ব্যাপক চাহিদার কারণে কবর থেকে লাশ চুরি করে তৈরি করা হচ্ছে কঙ্কাল। এটি এখন লাভজনক ব্যবসায়ও পরিণত হয়েছে।

প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, এর আগে ভারত থেকে চোরাইপথে আসা কঙ্কাল বেশিরভাগ চাহিদা পূরণ করতো। বর্তমানে সীমান্তে কড়াকড়ি আরোপ করায় কঙ্কাল আসার সংখ্যা শূন্যের কোঠায় পৌঁছেছে। তাই দেশের অভ্যন্তরে এঘটনা বেড়েছ।

দুই. দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি কতটা উদ্বেগজনক পর্যায়ে গেছে যে, মায়ের গর্ভেও শিশুরা নিরাপদ নয়। আমরা দেখেছি গত ২৩ জুলাই বিকালে মাগুরা শহরের দোয়ারপাড়ায় বাড়িতে ঢুকে অন্তঃসত্ত্বা মা নাজমা খাতুনের (৩০) পেটে গুলি করে ছাত্রলীগ-যুবলীগ সন্ত্রাসীরা। পেটে বাচ্চার দোহাই দিয়েও হামলাকারীদের হাত থেকে রেহাই পাননি তিনি। এখন ঢাকার একটি হাসপাতালে মা ও সদ্যজাত মেয়ে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে।

তিন. হাসপাতাল থেকে নবজাতক শিশু চুরির ঘটনা। দেশে শিশু চুরি বা অপহরণের মতো ঘটনা নতুন নয়। তবে হঠাৎ করেই গত বছর থেকে নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে চোরাই নবজাতকের ব্যবসা। যা নিয়ে এখন উদ্বিগ্ন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা্ও।

শিশু চোরদের ধরার ব্যাপারে এবং এই ব্যবসা বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা পুরোপুরি তৎপর হলেও কমেনি এই অপরাধ, বরং বেড়েছে।

আমার যতদূর মনে পড়ে, ২০০৬ সালের মে মাসে বাড্ডা এলাকায় সাবেক ডিআইজি আনিসুর রহমান- আনোয়ারা বেগম দম্পতির বাসায় পাওয়া যায় কাছাকাছি বয়সের সাতটি শিশু। আনিস আনোয়ারা দম্পতি দাবি করেছিলেন শিশুগুলো তাদেরই সন্তান। কিন্তু এ নিয়ে মামলা হলে আদালতের নির্দেশে ডিএনএ পরীক্ষার পর দেখা যায় শিশুগুলো তাদের সন্তান নয়। পাচারের উদ্দেশ্যেই তাদের সংগ্রহ করা হয়েছিলো। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে সরকারি বেসরকারি হাসপাতাল থেকে পাওয়া যায় নবজাতক চুরির খবর। গত পাঁচ বছরে চুরি যাওয়া শিশুদের মধ্যে মাত্র দু-একজনকে উদ্ধার করতে পেরেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

নবজাতক চুরি এবং বিক্রির ঘটনা ২০০৯ সালে প্রথম মিডিয়ায় শোনা গেলেও সাম্প্রতিক সময়ে হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে এর সংখ্যা। ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত যে চারটি নবজাতক চুরির ঘটনা পাওয়া যায় তার প্রত্যেকটিই ঘটেছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে (ঢামেক)। কিন্তু গত বছরের শেষ সময় পর্যন্ত এই নবজাতক চুরির ঘটনা যেন হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে অস্বাভাবিক ভাবে। গত বছরের শেষ চার মাসে মোট ১৮টি নবজাতক চুরির ঘটনা ঘটেছে। এরমধ্যে ১১টি ঘটনাই ঘটেছে রাজধানীতে। আর বাকিগুলো ঘটেছে দেশের বিভিন্ন স্থানে।

এসব ঘটনায় হাসপাতালের নার্স বা তাদের সহকারীরা মাত্র ৩ থেকে ৪ হাজার টাকার বিনিময়েই মেয়ে শিশুর জায়গায় ছেলে শিশু স্থানান্তরের মতো কাজ করছেন যা তদন্তে বেড়িয়ে এসেছে।তবে এসব ঘটনায় জড়িতরা বিচারের আওতায় আসেনি।

ফলে আমরা আজ এমন এক সমাজে বসবাস করছি যেখানে জন্মের আগে মাতৃগর্ভে যেমন শিশুরা নিরাপদ নয়, তেমনি ভূমিষ্ট হবার পরেও নিরাপদ নয়। এছাড়া অবস্থা এমন যে মানুষ মরেও শান্তি পাচ্ছে না। মরার পরও মানুষের লাশের পর্যন্ত নিরাপত্তায় থাকছে না।

রাষ্ট্রযন্ত্রের ব্যর্থতার এতটাই প্রকট হয়েছে যে, কবরের লাশ্ও চুরি হয়ে যাচ্ছে। এর আগে শোনা যেত যে, মৃত ব্যক্তির কাফন চুরি হয়। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, খোদ মৃত ব্যক্তির লাশই চুরি হয়ে যাচ্ছে। একি অসভ্য-বর্বর সমাজে বসবাস আমাদের?

জানি না, আন্তর্জাতিকভাবে অনেক পুরুষ্কার প্রাপ্ত আমাদের দক্ষ সরকারের ভিজ্ঞ প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়টি কীভাবে দেখছেন। বুঝতে পারছি না, এটাকে তিনি আবার কোন ধরনের উন্নতি হিসেবে ব্যাখ্যা করবেন কী না।

তবে সরকার পক্ষ যাই বলুক না কেন, এসব ঘটনায় আজ লজ্জায় গোটা জাতির মাথা অবনত। কেননা, সরকার যে শুধু স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি দিতে পারছেনা বিষয়টি তাই নয়, বরং সরকার কবরের ভেতরও স্বাভাবিক মানুষের মৃতদেহ রাখার গ্যারান্টিও দিতে পারছে না।তেমনি মাতৃগর্ভে্ও একজন শিশু নিরাপদ নয়। তাহলে আমরা যাচ্ছি কোথায়? আমাদের এই জাতির অধঃপতনের শেষ কোথায়?

সবশেষে, আমি জানি এই বর্বর দলবাজ সমাজে জীবনের নিরাপত্তা কিংবা স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চা্ওয়া বৃথা। তাই রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধান হিসেবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি নয় কিংবা জীবনের নিরাপত্তা নয়, মৃত্যুর পর কবরে আমার লাশের স্বাভাবিক নিরাপত্তা চাই। আশা করি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমার এই আকুল আবেদন আমলে নিয়ে রাষ্ট্রের সব নাগরিকেরই মৃত্যুর পর কবরে লাশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।

লেখক: গবেষক ও কলামলেখক, ই-মেইল- [email protected]






মন্তব্য চালু নেই