মেইন ম্যেনু

জেনে নিন, কে এই চিত্রনায়িকা দিতি !

পারভীন সুলতানা দিতি। যিনি বাংলা চলচ্চিত্রে দিতি নামে বেশি পরিচিত। বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম সাড়া জাগানো জনপ্রিয় অভিনেত্রী ছিলেন তিনি। গত ২০ মার্চ (রোববার) বিকেল ৪টা ০৫ মিনিটে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন গুণী এই অভিনেত্রী। (ইন্নালিল্লাহি…ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। দিতির মৃত্যুতে দেশে চলচ্চিত্রাঙ্গন এবং তার ভক্তদের মাঝে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

গেল বছরের মাঝামাঝি সময়ে মস্তিষ্কে ক্যানসার ধরা পড়ে দিতির। তখন চিকিৎসার জন্য তাকে ভারতের মাদ্রাজ ইনস্টিটিউট অব অর্থোপেডিকস অ্যান্ড ট্রমাটোলজি (এমআইওটি) হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে দুই দফা চিকিৎসা শেষে রেডিয়েশনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় ‘পারকিনসন’ রোগে আক্রান্ত হন দিতি।
চিকিৎসকরা জানিয়ে দেন, এই রোগ থেকে কোনোদিনই মুক্ত হবেন না দিতি। বাধ্য হয়েই মাকে নিয়ে গেল ৮ জানুয়ারি দেশে ফিরে আসেন দিতির ছেলে সাফায়েত চৌধুরী ও মেয়ে লামিয়া চৌধুরী। একই দিন সরাসরি ভর্তি করানো হয় গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতালে। এতদিন তিনি সেখানেই চিকিৎসাধীন ছিলেন। সেখানে লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থায় স্মৃতি শক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন দিতি।

জনপ্রিয় এই অভিনেত্রীর স্মরণে তার জানা-অজানা তথ্য নিয়ে পাঠকদের জন্য বিডি টুয়েন্টিফোর লাইভ আয়োজন করেছে বিশেষ প্রতিবেদন।

জন্ম এবং ছোটবেলা: পারভীন সুলতানা দিতি ১৯৬৫ সালের ৩১ মার্চ নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁওয়ে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই গান ও অভিনয়ের প্রতি দিতির ছিলো দুনির্বার আকর্ষণ।

চলচ্চিত্রে আগমন: বাংলাদেশের অভিনয় জগতের বরেণ্য এ চিত্রনায়িকা ১৯৮৪ সালে নতুন মুখের সন্ধানের মাধ্যমে দেশীয় চলচ্চিত্রে সম্পৃক্ততা পদার্পন করেন। তার অভিনীত প্রথম চলচ্চিত্র উদয়ন চৌধুরী পরিচালিত ‘ডাক দিয়ে যাই’। কিন্তু ছবিটি শেষ পর্যন্ত মুক্তি পায়নি। দিতি অভিনীত মুক্তিপ্রাপ্ত প্রথম চলচ্চিত্র ছিল ‘আমিই ওস্তাদ’। ছবিটি পরিচালনা করেছিলেন আজমল হুদা মিঠু। এরপর অসংখ্য ব্যবসাসফল ছবি উপহার দিয়ে ইন্ডাস্ট্রির অন্যতম নির্ভরযোগ্য নায়িকা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। দিতি প্রায় দুই শতাধিক ছবিতে কাজ করেছেন।

ছোট পর্দায় আগমন: দিতি ছোট পর্দার কিছু একক ও ধারাবাহিক নাটকে অভিনয় করেছেন। এ ছাড়া তিনি রান্না বিষয়ক অনুষ্ঠানে উপস্থাপনা করেছেন।

পুরস্কার: দিতি তাঁর অভিনয়ের স্বীকৃতি স্বরূপ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারেও ভূষিত হয়েছেন। সুভাষ দত্ত পরিচালিত ‘স্বামী স্ত্রী’ ছবিতে আলমগীরের স্ত্রীর চরিত্রে অভিনয় করে প্রথমবারের মতো জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন।

উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র: দিতি অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলো হলো-হীরামতি, দুই জীবন, ভাই বন্ধু, উছিলা, লেডি ইন্সপেক্টর, খুনের বদলা, আজকের হাঙ্গামা, স্নেহের প্রতিদান (১৯৯৯), শেষ উপহার, চরম আঘাত, স্বামী-স্ত্রী, অপরাধী, কালিয়া, কাল সকালে(২০০৫, মেঘের কোলে রোদ (২০০৮), আকাশ ছোঁয়া ভালোবাসা (২০০৮), মুক্তি (২০১৪), কঠিন প্রতিশোধ (২০১৪), তবুও ভালোবাসি (২০১৩), পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনী (২০১৩), হৃদয় ভাঙ্গা ঢেউ (২০১১), মাটির ঠিকানা (২০১১), নয় নম্বর বিপদ সংকেত (২০০৭) দূর্জয় (১৯৯৬) সুইট হার্ট, ধূমকেতু (নির্মানাধীন)। তিনি অসংখ্য নাটক টেলিফিল্মেও অভিনয় করেন। নাটক পরিচালনার সঙ্গেও সম্পৃক্ত ছিলেন তিনি।

ব্যক্তিগত জীবনে দিতি: জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকাকালীন তিনি সহ-শিল্পী সোহেল চৌধুরীকে ভালোবেসে বিয়ে করেন। এরপর সোহেল চৌধুরীর মৃত্যুর পর দিতি আরেক জনপ্রিয় অভিনেতা ইলিয়াস কাঞ্চনকে বিয়ে করেন। কিন্তু তাঁদেরও বিচ্ছেদ হয়। দুই সন্তান দীপ্ত ও লামিয়াকে নিয়েই ছিল দিতির সংসার।

স্মৃতির ধুলোমাখা ডাইরির পাতা থেকে দিতি: দীর্ঘ সময়ে তিনি নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছেন দিতি। তবে সব প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে জীবনের সুন্দর কিছু সময় কাটিয়েছেন তিনি। ১৯৯৮ সালে স্বামী সোহেলকে হারানোর পর দুজন সন্তানকে মানুষ করতেই দিতির সারাবেলা কেটে যেত। এরপর দুই সন্তানকে উচ্চ শিক্ষার জন্য কানাডায় পাঠান দিতি।

দুবছর আগেই একটি পত্রিকায় দেয়া সাক্ষাতকারে বলেছিলেন, ‘সন্তানদের দেখতে প্রতি বছরই একটি নির্দিষ্ট সময়ে কানাডা যেতাম। দেশে ফিরে আর কাজে মন বসাতে পারতাম না। মনটা ছেলে-মেয়েদের কাছেই পড়ে থাকে।

অতীত জীবনের গল্প বলতে গিয়ে দিতি বলেন, অভিনেতা আল মনসুরের কারণেই তিনি আজ দিতি হতে পেরেছেন। তিনিই তাকে প্রথমবার নাটকে অভিনয়ের সুযোগ দিয়েছিলেন। খুব ছোটবেলায়ই দিতি গানের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। শৈশবে শিশু একাডেমী আয়োজিত প্রতিযোগিতায় জাতীয়ভাবে পুরস্কৃত হন। যে কারণে নায়িকা হওয়ারও অনেক আগে তার গায়িকা হওয়ার ইচ্ছা ছিল। বিটিভিতে একদিন গান করার সময় তিনি আল মনসুরের নজরে আসেন। তিনি দিতিকে খুঁজে বের করে মানস বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিপরীতে ‘লাইলি মজনু’ নাটকে কাস্ট করেন। নাটকটি প্রচারের পর দর্শক মহলে ব্যাপক সাড়া ফেলে।

কিন্তু দিতির অভিনয় চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে পরিবার থেকে বাধা আসে। বেশ কিছু দিন বিরতি নিয়ে আবারো ফখরুল আবেদীনের প্রযোজনায় ‘ইমিটেশন’ নাটকে তিনি অভিনয় করেন। এর পরই চলচ্চিত্রে কাজ করার ব্যাপারে তার কাছে প্রচুর অফার আসতে থাকে।

তবে দিতি ‘নতুন মুখের সন্ধানে’ কার্যক্রমে অংশগ্রহণের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে নিজেকে পুরোপুরি জড়িয়ে নেন। তার অভিনীত প্রথম ছবি ছিল প্রয়াত পরিচালক উদয়ন চৌধুরীর ‘ডাক দিয়ে যাই’। এ ছবিতে তার নায়ক ছিলেন আফজাল হোসেন। কিন্তু আশি শতাংশ কাজ শেষ করার পরও ছবিটি আলোর মুখ দেখেনি।
দিতির মুক্তিপ্রাপ্ত প্রথম ছবি প্রয়াত পরিচালক আজমল হুদা মিঠুর ‘আমিই ওস্তাদ’। এ ছবিতে দিতির অনবদ্য অভিনয় দর্শকের কাছে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়। এরপর আর দিতিকে পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের সঙ্গে দিতি সবচেয়ে বেশি জুটিবদ্ধ হয়ে অভিনয় করেছেন।

এ প্রসঙ্গে দিতি বলেন, সত্যি বলতে কি, কাঞ্চন সাহেব অনেক গুণী একজন অভিনেতা। তার সঙ্গেই আমি সবচেয়ে বেশি ছবিতে অভিনয় করেছি। পর্দায় আমাদের অভিনয় ছিল প্রাণবন্ত। যে কারণে দর্শকও আমাদের ছবিগুলো আগ্রহ নিয়ে দেখতেন। তবে সোহেল যদি চাইত কিংবা সিরিয়াস হতো তাহলে চলচ্চিত্রে আমাদের জুটিই হতো সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। কারণ আমাদের দুজনকে জুটি হিসেবে দারুণ মানাত।

দিতি ওপার বাংলার জনপ্রিয় নায়ক প্রসেনজিতের সঙ্গে ‘প্রিয় শত্রু’ ছবিতেও অভিনয় করেছেন। ছবির ‘চিঠি কেন আসে না আর দেরি সহে না’ শিরোনামের গানটি তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।

প্রয়াত পরিচালক সুভাষ দত্ত পরিচালিত ‘স্বামী স্ত্রী’ ছবিতে অভিনয়ের সুবাদে দিতি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে দিতি বলেন, সত্যি বলতে কি, অভিনয় করে দর্শকের যে ভালোবাসা পেয়েছি তার চেয়ে বড় পুরস্কার আর নেই। দর্শকের ভালোবাসাই আমার বেঁচে থাকার প্রেরণা। আর সন্তানরা আমার ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যাওয়ার দুর্নিবার সাহস।

আজ থেকে প্রায় দুই যুগ আগে অনুপম রেকর্ডিং মিডিয়ার ব্যানারে দিতির প্রথম একক অ্যালবাম ‘তোমার ও চোখে’ বাজারে আসে। এরপর মাঝে দু-একটি চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক করলেও দীর্ঘদিন আর কোনো অ্যালবাম প্রকাশ করেননি তিনি। অবশেষে ২০১১ সালে লেজার ভিশনের ব্যানারে বাজারে আসে তার দ্বিতীয় একক অ্যালবাম ‘ফিরে যেন আসি’। এটিও বেশ প্রশংসিত হয়েছে।

মৃত্যু: মস্তিষ্কে ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ায় ২০১৫ সালের ২৫ জুলাই থেকে ভারতের চেন্নাইয়ের মাদ্রাজ ইনস্টিটিউট অব অর্থোপেডিকস অ্যান্ড ট্রমাটোলজি (এমআইওটি) হাসপাতালে নেয়া হয়। মাঝে কিছুটা সুস্থ হয়ে দেশে ফিরে আসেন। শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে সেই বছরের নভেম্বরে আবারও একই হাসপাতালে ভর্তি করানো হয় তাঁকে। বেশ কিছুদিন চিকিৎসাধীন থাকার পরও অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় ৮ জানুয়ারি তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। দেশে ফেরার পরপরই তাঁকে ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালের আইসিইউতে থাকাকালীন ২০১৬ সালের ২০ মার্চ বিকেল ৪টা ০৫ মিনিটে শেষ নিঃশ্বাস ত্যগ করেন।

মৃত্যুর আগে যা বলেছিলেন দিতি: পারভীন সুলতানা দিতি বলেছিলেন, ‌‘‘বাংলাদেশের মানুষ আমাকে এত ভালোবাসে, তা আগে বুঝিনি’, একটি শীর্ষ দৈনিকের সাথে একান্ত আলাপকালে এমনটা তিনি বলেছিলেন।
ব্রেন টিউমারের অপারেশন করাতে গত বছরের ২৫ জুলাই ভারতের চেন্নাইয়ে গিয়েছিলেন দিতি। ২৭ জুলাই চেন্নাইয়ের একটি হাসপাতালে তাঁর মস্তিষ্কে সফল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে টিউমার অপসারণ করা হয়। চেন্নাইয়ে টানা ৫০ দিন চিকিৎসাসেবা নেওয়ার পর নিজ শহর ঢাকায় ফেরেন ২০ সেপ্টেম্বর।

দেশে ফিরে এসে তিনি ওই দৈনিকটির সাথে একান্ত আলাপচারিতায় নিজের শারীরিক অবস্থাসহ নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেন। যা ওই দৈনিকটিতে ‘আগে বুঝিনি, মানুষ আমাকে এত ভালোবাসে’ ছাপা হয়।

ওই আলাপচারিতায় দিতি বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ আমাকে এত ভালোবাসে, তা আগে বুঝিনি। এবার অসুস্থ হয়ে চিকিৎসা নিতে যাওয়ার পর মানুষের এই ভালোবাসা প্রতি মুহূর্তে অনুভব করেছি। বাংলাদেশের অনেক মানুষ, যাদেরকে আমি কোনো দিন দেখিনি, তারা নানা উপায়ে আমার শারীরিক অবস্থার খোঁজ খবর নিয়েছেন। দোয়া করেছেন, আমি যেন দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠি। বাংলাদেশের মানুষের এই ভালোবাসার ঋণ আমি কোনো দিন শোধ করতে পারব না। তাদের সবার ভালোবাসা আমার মানসিক শক্তি বাড়িয়ে দিয়েছে।’
এবারের ঈদে দিতি অভিনীত ‘রাজাবাবু-দ্য পাওয়ার’ ছবিটি মুক্তি পাচ্ছে।

এখন আর নেই আমাদের প্রিয় চিত্রনায়িকা দিতি। আর কোন দিন ফিরে আসবেন না আমাদের মাঝে। এফডিসিতে জানাজা শেষে দিতির মরদেহ নিয়ে লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স রওনা দেয় নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ের দপ্তপাড়া গ্রামের পথে; যেখানে দিতির জন্ম। সেখানেই শেষ শয্যায় সমাহিত হয়েছেন তিনি। স্মৃতির হাজার কবিতা বুকে নিয়ে পড়ে রইল দিতির প্রিয় আঙ্গিনা এফডিসি।

নির্বাক হয়ে পড়ে রইল তার প্রিয় মানুষেরা। চম্পা, ববিতা, আলমগীর, দিলারা, খালেদা আক্তার কল্পনা, মিজু আহমেদ, আহমেদ শরীফ, রুবেল, ওমর সানীরা দিতির চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বুঝি বলছিলেন- বিদায় দিতি। আর কোনোদিন দেখা হবে না, কথা হবে না। অদেখা ভুবনে ভালো থেকো তুমি।






মন্তব্য চালু নেই