মেইন ম্যেনু

জেনে নিন গোলমরিচ চাষ পদ্ধতি

গোলমরিচ (Piper nigrum) Piperaceae গোত্রের একটি লতাজাতীয় উদ্ভিদ। যার ফলকে শুকিয়ে মসলা হিসাবে ব্যবহার করা হয়। গোল মরিচ গাছের আদি উৎস দক্ষিণ ভারত। পৃথিবীর উষ্ণ ও নিরক্ষীয় এলাকায় এটির চাষ হয়ে থাকে।

গোলমরিচের গুঁড়া পশ্চিমা (ইউরোপীয়) খাদ্যে মসলা হিসাবে ব্যবহার করা হয় প্রাচীন কাল থেকে। তবে ভারত বর্ষের মসলাধিক্য রান্নায় এটির ব্যবহার প্রচুর। এছাড়া ঔষুধি গুণাগুণের জন্যেও এটি সমাদৃত।

গোলমরিচ বহুবর্ষজীবী লতা জাতীয় গাছ। লতা রোপনের ৪/৫ বছর পর থেকে ফল ধরতে থাকে। ৮-৯ বছর বয়সে পূর্ণ উত্পাদন ক্ষমতায় আসে এবং ২০-২৫ বছর পর্য়ন্ত ভালো ফলন দেয়। গোলমরিচ গাছ সাধারণত সহায়ক গাছকে আকড়িয়ে বেড়ে ওঠে। এই গাছ সর্বোচ্চ ৩০-৩৫ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়। এই গাছের পাতা দেখতে অনেকটা পান পাতার মতো। একটি গাছ থেকে বছরে দেড় কেজি পর্যন্ত গোল মরিচ পাওয়া যায়।

গোলমরিচ চাষ লাভজনক। কৃষকদের গ্রামীণ অর্থনৈতিক ভিত্তি সুদৃঢ় ও কম সময়ে অধিক উপার্জন পেতে গোলমরিচ এক অর্থকরী ফসল হিসেবে বিবেচিত হয়।

গোলমরিচ লতাজাতীয় উদ্ভিদ। পান গাছ, ওদাল, বেত ইত্যাদির মতো গোলমরিচ এক পরাশ্রয়ী গাছ। এ জন্য গোলমরিচের অন্য গাছের আশ্রয় প্রয়োজন। আম, সুপারি, কাঁঠাল, মান্দার, তেঁতুল, নারিকেল, তাল, সিলভার, খেজুর ইত্যাদি গাছ গোলমরিচের আশ্রয়ী হিসেবে ব্যবহার হয়। এ ছাড়া অমসৃণ ছাল বিশিষ্ট গাছে গোলমরিচ গাছ ওঠার জন্য সুবিধা হয়।

উপযুক্ত মাটিও জমি:

পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হয় ও আর্দ্রতা বেশি এমন এলাকায় গোলমরিচ ভালো জন্মে। এ ফসল ১০০ থেকে ৪০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে। পাহাড়ি এলাকার মাটি এ ফসল চাষের জন্য খুব উপযোগী।

গেলা মরিচের জাত: (হাইব্রিড), কারিমুণ্ডা, বালনকাট্টা, কল্লুভেল্লি, আরকুলপাম মুণ্ডা প্রভৃতি।

চারা তৈরি:
গোল মরিচে ৩ ধরনের লতা/কাণ্ড দেখা যায়। সাধারণ গোল মরিচের চারা ডালের কলম থেকে তৈরি করা হয়। গোলমরিচের গাছের গোড়ার অংশকে ‘রানার’ বলা হয়। ‘রানার’-এর প্রতিটি গিঁট থেকে শিকড় বের হওয়ার স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে। শীর্ষ ডগা ও ব্যবহার করা যায়। ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ মাসে ২ থেকে ৩টি পর্বসন্ধি (গিট) যুক্ত কাণ্ড কাটিং হিসেবে নার্সারিতে বা পলিব্যাগ লাগানো হয়। পলিব্যাগ উর্বর মাটি দিয়ে ভরাট করা হয়। কাটিং-এ ছায়ার ব্যবস্থা রাখা হয় ও প্রয়োজনে সেচ দিতে হয়। পলিব্যাগে চারা রোপণের পূর্বে বাঁশের কাঠি দিয়ে পলিথিন ব্যাগের মাটিতে গর্ত করে নিয়ে শিকড়যুক্ত কাটিং লাগাতে হয়। ৪৫ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে একটি সুন্দর চারা তৈরি হবে। মে থেকে জুন বা চৈত্র থেকে বৈশাখ মাসে কাটিং লাগানোর উপযোগী হয়।

ব্যবসায়িক ভিত্তিতে গোলমরিচের চারা উৎপাদনের জন্য দ্রুত চারা উৎপাদন পদ্ধতি বেশি কার্যকর। একটি গাছ থেকে বছরে অন্তত ৩০ থেকে ৩৫টি চারা উৎপাদন করা সম্ভব। এ জন্য একটি ছায়াঘর তৈরি করতে হবে। প্লাস্টিকের তৈরি বিশেষ ধরনের শেডনেট ব্যবহার করে ছাউনিও তৈরি করা যায়।

ঘরের বাঁশের খুঁটির সারির উচ্চতা হবে ৩ মিটার এবং দুই পাশের খুঁটির উচ্চতা হবে ২ মিটার। ঘরের মধ্যে ১ মিটার দূরত্ব বজায় রেখে ৭৫ সেন্টিমিটার গভীর এবং ৩০ সেন্টিমিটার প্রস্তের নালা তৈরি করতে হবে। নালাগুলো বালিমাটি, কম্পোস্ট, কাঁঠালের গুঁড়ো এবং সারমিশ্রিত মাটি সমানভাগে মিশিয়ে ভর্তি করতে হবে। এখন ওই নালার এক ফুট অন্তর অন্তর ভালো জাতের সুস’ চারা ‘মাতৃগাছ’ হিসেবে রোপণ করতে হবে। দুই নালার মধ্যবর্তী জায়গার দুই মাথায় খুঁটি পুঁতে মাটির সঙ্গে আনুভূমিকভাবে একটি লম্বা বাঁশ বেঁধে দিতে হবে।

গোলমরিচের গাছ প্রতিটি গিঁট মাটির সংস্পর্শে বেঁধে দিতে হয়, এর ফলে প্রতি গিঁট থেকে শিকড় বেরিয়ে আসবে। ৩-৪ মাসের মধ্যে গোলমরিচের লতা আধাখানা বাঁশের মাথা পেরিয়ে যাবে। এ সময় লতার আগা কেটে নিন এবং গাছের গোড়ার তিনটি গিঁটের উপরে লতা থেঁতলে দিন। তখন পাতার অঙ্কুর বাড়তে আরম্ভ করবে। ১০ দিন পর থেঁতলানো অংশটুকু কেটে ফেলুন।

গোলমরিচবংশ বিস্তার:
গোলমরিচের বীজ থেকে বংশবৃদ্ধি করা যায়। কিন্তু এতে উৎপাদন পেতে অনেক বেশি সময় লাগে। গোলমরিচের গুণাগুণ মাতৃগাছের মতো নাও হতে পারে। সেজন্য সাধারণত অঙ্গজ প্রজননের দ্বারা গোলমরিচের বংশবৃদ্ধি করা হয়। সাধারণত এক মুকুল একপত্রী কাটিং দ্বারা বংশবৃদ্ধি করা হয়। ওই পদ্ধতি দ্বারা অতি সহজেই গোলমরিচের চারা প্রস্তুত করা যায়।

চারা লাগানো:
গোলমরিচ ঠেস গাছের ছায়ায় লাগাতে হয়। ঠেস গাছ আগে থেকে ২ দশমিক ৫ মিটার দূরত্বে লাগিয়ে গোল মরিচের কাটিং লাগানো হয়। ২ থেকে ৩টি কাটিং এক গর্তে লাগানো হয়।

চারা রোপণ পদ্ধতি:
গোলমরিচের চারা দুই প্রকারে রোপণ করা যায়। যদি বাগানে সুপারি, নারকেল, আম, মান্দার, কাঁঠাল ইত্যাদি আশ্রয় গাছ হিসেবে ব্যবহারের গাছ থাকে, তখন ওই গাছ থেকে দেড় হাত দূরে, দেড় হাত দৈর্ঘ্য, দেড় হাত প্রস্ত এবং দেড় হাত গভীর গর্ত করতে হয়। গোবর, পচনসার, বালুযুক্ত মাটি দিয়ে গর্তটি পূর্ণ করে চারা রোপণ করা হয়। গাছ ওঠার সুবিধার জন্য বাঁশের অবলম্বন দেয়া প্রয়োজন।

রোপণের সময়:
গোলমরিচ ভালো জাতের চারা বৈশাখের ১০ থেকে ১৫ দিন থেকে আষাঢ়ের ১০ থেকে ১৫ দিন পর্যন্ত রোপণের উপযুক্ত সময়।

মাটি:
অব্যবহৃত বা পতিত জমিতে উচ্চ জৈবসার বিশিষ্ট পানি জমে না থাকা, পাহাড়ের লালমাটি গোলমরিচ চাষের জন্য বেশি উপযোগী। বন্যা কবলিত অঞ্চল ছাড়া বেলে দো-আঁশ মাটিতে গোলমরিচের চাষ করা যায়। আর্দ্রতাহীন মাটি গোলমরিচ চাষের জন্য অনুপযোগী।

জাত:
পানিউর-১ (হাইব্রিড), কারিমুণ্ডা, বালানকাট্টা, কল্লুভেল্লি, আরকুলাম মুণ্ডা প্রভৃতি গোল মরিচের জাত।

সার ব্যবস্থাপনা:
প্রতি গর্তে ৩০০ গ্রাম ইউরিয়া, ১১০ গ্রাম টিএসপি ও ৪৫০ গ্রাম পটাশ দিতে হয়। তবে এ পরিমাণ সার তৃতীয় বছর হতে দিতে হবে। এ পরিমাণের ১/৩ ভাগ ১ম বছর এবং ২/৩ ভাগ দ্বিতীয় বছরে দিতে হবে। সার সাধারণতঃ বছরে দু’বারে দিতে হয়। একবার মে-জুন মাসে ও পরের বার আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে দিতে হয়। এছাড়া প্রতি বছর প্রতি গর্তে মে-জুন মাসে ১০ কেজি পঁচা গোবর ও প্রতি ১ বছর অন্তর-অন্তর প্রতি গর্তে ৬০০ গ্রাম চুন দিতে হবে।

সেচ ও আগাছা ব্যবস্থাপনা:
আগাছা দেখা দিলে পরিষ্কার করতে হবে ও মাটিতে রসের অভাব হলে পানি সেচ দিতে হবে। ডগা বাড়তে থাকলে ঠেস গাছের সাথে বেঁধে দিতে হবে।

পোকার আক্রমণ ব্যবস্থাপনা:

ভূমিকা: এ পোকার আক্রমণে শতকরা ৩০ থেকে ৪০ ভাগ ক্ষতি হতে পারে। সে কারণে এ পোকা দেখামাত্র প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। নিয়মিত গাছ ছাঁটাই করে বৃদ্ধি কমাতে হবে। অনুমোদিত কীটনাশক প্রয়োগ।

রোগ ব্যবস্থাপনা:

নার্সারিতে পাতা পচা ও ঢলে পড়া রোগ দেখা যায়। পাতা পচা রোগে পাতায় কাল দাগ পড়ে এবং ঢলে পড়া রোগ হলে কাটিং নেতিয়ে পড়ে।

দমন:

ব্যাভিস্টিন বা কপার অক্সি ক্লোরাইড নামক ছত্রাক নাশক প্রতি দশ লিটার পানিতে ২০ গ্রাম হারে ১০-১২ দিন অন্তর অন্তর ৩ বার প্রয়োগ করলে এ রোগ দমন করা যায়।

ফসল তোলা:
মে থেকে জুন মাসে ফুল আসে এবং ৬ থেকে ৮ মাস পর ফল তোলা যায়। থোকায় ২/১টি ফল উজ্জ্বল কমলা বা বেগুনি হলে সংগ্রহ করে ৭ থেকে ১০ দিন রোদে শুকিয়ে সংরক্ষণ করা যায়।

প্রতি গাছ থেকে ৫-৬ কেজি কাঁচা গোলমরিচ উৎপাদন হয়। কাঁচা গোলমরিচ থেকে প্রায় ৩০ শতাংশ শুকনো গোলমরিচ পাওয়া যায়। অর্থাৎ, একটি গাছ থেকে গড়ে দেড় থেকে দুই কেজি শুকনো গোলমরিচ পাওয়া যায়। প্রতি কেজি ৫০০ টাকা হলে একটি গোলমরিচের গাছ থেকে ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকা উপার্জন করা যায়। হিসেব অনুযায়ী একটি গাছের জন্য খরচ প্রায় ৩৫ টাকা। সুতরাং খরচের তুলনায় লাভ যথেষ্ট।

তথ্য: নেট থেকে সংগৃহীত






মন্তব্য চালু নেই