মেইন ম্যেনু

জেনে নিন, তিন মাসে মুস্তাফিজের যতো ম্যাজিক

২৪ এপ্রিল সন্ধ্যা। শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়াম। পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজে বাংলাদেশের একমাত্র টি-টুয়েন্টি ম্যাচ। টস হওয়ার পর পর স্কোরবোর্ডে ভেসে উঠলো বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের বেস্ট ইলেভেন। টাইগারদের লাইনআপে সবার শেষের নামটি দেখে চমকে উঠেছিলেন অনেকেই। এই মুস্তাফিজুর রহমানটা আবার কে?

টস জিতে আগে ব্যাটিং নিলো পাকিস্তান। অধিনায়ক হিসেবে শহীদ আফ্রিদীকে দলে পেয়ে দারুণভাবে আত্মবিশ্বাসী তারা। ওয়ানডে সিরিজে হোয়াইটওয়াশ হওয়ায় টি-টুয়েন্টি দিয়ে ফিরে আসার একটা সুযোগ। তাই সেটা কাজে লাগাতে চায় দলের সবাই।

ম্যাচের প্রথম ওভার। অভিষিক্ত পেসার মুস্তাফিজুর রহমানের হাতেই বল তুলে দিলেন বাংলাদেশ অধিনায়ক মাশরাফি। হালকা, পাতলা শরীরে বাঁ-হাতে বল নিয়ে দৌড় শুরু করলেন মুস্তাফিজ। অপরপ্রান্তে তার সামনে আনকোড়া এক পাকিস্তানী ব্যাটসম্যান, মুখতার আহমেদ। মুস্তাফিজের মতো তারও টি-টুয়েন্টিতে অভিষেক।

প্রথম বলটা ডানহাতি মুখতারের লেগ স্ট্যাম্পের বাইরে পিচ করালেন মুস্তাফিজ। বাংলাদেশী আম্পায়ার এবং বাংলাদেশ দলের সাবেক বাঁ-হাতি পেসার আনিসুর রহমান দুই হাত প্রসারিত করে জানিয়ে দিলেন: মুস্তাফিজ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তোমার প্রথম বলটা ‘ওয়াইড’।

ওই ওয়াইডসহ নিজের করা প্রথম ওভারে ৪ রান দিয়েছিলেন মুস্তাফিজ। পরের ওভারটার প্রথম ৫টি বল ছিলো ডট, অবশ্য শেষ বলে ১ রান নিতে পেরেছিলেন শেহজাদ।

এরপর তার তৃতীয় ওভারটাই ঘটনাবহুল। প্রথম দুই বলে দুটি ডাবলসে চার রান নিলেন শহীদ আফ্রিদী। তৃতীয় বলে ডিপ স্কয়ার লেগের মাথার উপর দিয়ে ধাম করে মেরে বসলেন ছয়।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এটিই মুস্তাফিজের বিপক্ষে প্রথম বাউন্ডারি। পরের বলটা ছিলো ওয়াইড। কিন্তু এর পরের বলেই ইতিহাস। আফ্রিদীকে মুশফিকের ক্যাচ বানিয়ে নিজের প্রথম উইকেট শিকার করলেন মুস্তাফিজুর রহমান। ৩৭ বলে সেঞ্চুরি করে ক্রিকেট বিশ্বে ঝড় তুলেছিলেন যিনি, দুর্ধর্ষ সেই শহীদ আফ্রিদীর উইকেট দিয়েই শুরু হলো আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মুস্তাফিজের পথচলা।

এরপর নিজের শেষ ওভারের পঞ্চম বলে মোহাম্মদ হাফিজকে এলবিডব্লিউ করে অভিষেক ম্যাচে মুস্তাফিজের বোলিং ফিগার ছিলো ৪ ওভারে ২০ রানে ২ উইকেট। ২২ বল হাতে রেখে বাংলাদেশ ম্যাচ জিতেছিলো ৭ উইকেটে।

পাকিস্তানকে ঘায়েল করার এক মাসের মধ্যেই একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেও অভিষেক হয়ে গেলো ১৯ বছর বয়সী তরুণ পেসারের।

২৪ এপ্রিল সন্ধ্যা থেকে ১৮ জুন সন্ধ্যা। তিন সপ্তাহের ব্যবধান মাত্র। কিন্তু সেই শেরে বাংলায় আরও ‘ধারালো’ হয়ে আবির্ভ‍ূত হলেন মুস্তাফিজ। তার তোপে পুড়ে ছাড়খার মহাভারতীয় ব্যাটিং লাইনআপ। স্লোয়ার-কাটারে শুরু থেকেই বিষিয়ে তুললেন টিম ইন্ডিয়ার ব্যাটসম্যানদের।

সেই বিষ ভারতীয় অধিনায়ক ঝাড়লেন মাঝমাঠেই। অভিষিক্ত মুস্তাফিজকে ‘ধাক্কা’ দিয়ে ফেলেই দিলেন। সেই ধাক্কা খেয়ে মাঠের বাইরেও যেতে হয়েছিলো তাকে।

কিন্তু এমএস কি জানতেন এই ধাক্কায় নিজেদের বিপদ কতোটা বাড়ালেন তিনি? জানতে পেরেছেন ফিরে আসার পর। রোহিত, রাহানে, রায়না, জাদেজা এবং অশ্বিন-এই ৫ শিকারে অভিষেকেই বাজিমাত। ডেব্যু ম্যাচে মুস্তাফিজুর রহমানের ফিগার দাঁড়ালো ৯.২-১-৫০-৫। বাংলাদেশ জিতলো ৭৯ রানে।

পরের ম্যাচে আরও ভয়ংকর মুস্তাফিজ। রোহিত, রায়না, জাদেজা, অশ্বিনরাতো ছিলেনই শিকারের তালিকায়; এবার যোগ হলেণ এমএস ধোনি, প্যাটেলরাও। আগের ম্যাচে ৫ এর পর এই ম্যাচে ৬! বিশ্বরেকর্ড ছুুঁয়ে মুস্তাফিজের ফিগার ১০-০-৪৩-৬। ডিএল মেথডে বাংলাদেশ ম্যাচ জিতে ৬ উইকেটে।

ভারতের বিপক্ষে শেষ ম্যাচে মুস্তাফিজুর রহমানের ফিগার ১০-০-৫৭-২। রোহিত শর্মা ও সুরেশ রায়নাকে সিরিজের সব ম্যাচেই আউট করা সম্পন্ন। অভিষেক সিরিজে ১৩ উইকেট শিকারে ইতিহাস গড়লেন সাতক্ষীরার তরুণ।

এরপর সাউথ আফ্রিকা সিরিজ। প্রথম টি-টুয়েন্টি ম্যাচে ৪ ওভার বল করে ৩০ রান দিলেও উইকেট পান নি মুস্তাফিজ, তবে দ্বিতীয় ম্যাচে ৪ ওভারে ৩৪ রান দিয়ে প্রোটিয়া অধিনায়ক ফাফ দু প্লেসিসকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।

প্রথম ওয়ানডেতে উইকেট শূন্য থাকলেও দ্বিতীয় ম্যাচে ডি কক, ডুমিনি এবং রাবাদার উইকেট নিয়ে ম্যাচ জয়ে বড় ভূমিকা রাখেন মুস্তাফিজ। চট্টগ্রামে শেষ ওয়ানডেতেও ডি কক এবং রাবাদাকে বিদায় করে শিকারের ধারাবাহিকতা ধরে রাখেন মুস্তাফিজুর রহমান।

চট্টগ্রামেই সিরিজের প্রথম টেস্টে বৃষ্টির জয়জয়কার। তবে যতোটুকু ম্যাচ হয়েছে তাতে সব আলো নিজের উপর টেনে রেখে আবারও অভিষেক ম্যাচে ‘ম্যাচসেরা’ ম্যাজিক পেসার। ইতিহাসে তিনিই প্রথম ক্রিকেটার যিনি ওয়ানডে এবং টেস্ট__ দু’ ধরণের ক্রিকেটে অভিষেক ম্যাচেই ম্যাচ সেরা।






মন্তব্য চালু নেই