মেইন ম্যেনু

জোড়া খুন ও টুকু হত্যা মামলা তদন্তে অগ্রগতি নেই

রাজশাহী নগরীর হোটেল নাইস ইন্টারন্যাশনাল থেকে ২ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর লাশ উদ্ধার এবং রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের অর্থ সম্পাদক জিয়াউল হক টুকু হত্যা মামলার তদন্তে অগ্রগতি নেই।

চাঞ্চল্যকর এসব হত্যাকান্ডের সঠিক কোনো ক্লু-ই উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। দায় এড়াতে উল্টো ঘটনা দুটিকেই ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ২২ এপ্রিল হোটেল নাইস ইন্টারন্যাশনাল থেকে জোড়া লাশ উদ্ধারের ঘটনায় থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন নিহত বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী সুমাইয়া নাসরিনের (২১) বাবা গাইবান্ধা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) আবদুল করিম। ওই মামলায় তার মেয়েকে হত্যার পাশাপাশি ধর্ষণেরও অভিযোগ আনেন তিনি।

এদিকে নিহত অপর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র মিজানুর রহমানের (২৩) মৃত্যুর ঘটনায় থানায় কোনো মামলা হয়নি। তবে পুলিশের দাবি, প্রেমিকা সুমাইয়া নাসরিনকে হত্যার পর আত্মহত্যা করেন মিজানুর। কিন্তু পুলিশের এমন দাবি আমলে নেননি নিহতের পরিবারের সদস্যরা।

তাদের দাবি, সুমাইয়া-মিজানকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। তদন্তে পুলিশ ঘাতকদের চিহ্নিত করতে না পেরে নিজেদের দায় এড়াতে এমন বক্তব্য দিচ্ছে।

মিজানের পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য, মিজান যদি আত্মহত্যায় করবে তবে তার ঝুলন্ত লাশের হাত বাঁধা ছিল কেন? আর অর্ধনগ্ন অবস্থাতেই বা কেন মিজান আত্মহত্যা করবে? তাদের দুজনকেই পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে তারা ধারণা করছেন।

তারা বলছেন, মিজান এমনিতেই শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী। তার এক পা ছোট। হাঁটেন কিছুটা খুঁড়িয়ে। এ অবস্থায় কোনোভাবেই সুঠামদেহী সুমাইয়াকে সে হত্যা করতে পারে না। তা ছাড়া তার ঝুলন্ত লাশের হাত পেছন দিকে বাঁধা থাকায় এটি স্পষ্টতই প্রমাণিত, তাদের দুজনকেই পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। আর এর সঙ্গে হোটেল কর্তৃপক্ষও জড়িত থাকতে পারে বলে আশঙ্কা তাদের।

তারা আরো বলছেন, মিজানের ফেসবুক আইডিতে যে সুইসাইড নোট পোস্ট করা হয়েছে তা দিতে হয়ত মিজানকে জোরপূর্বক বাধ্য করা হয়েছে অথবা তাদের হত্যার পর ঘটনাটিকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে মিজানের মোবাইলে লগ ইন থাকা ফেসবুকে ঘাতকরা কৌশলে ওই স্ট্যাটাস দিয়েছে।

তাদের দাবি, এটি যদি হত্যাকা-ই হয় তবে নিশ্চিতভাবেই এর সঙ্গে হোটেল কর্তৃপক্ষ জড়িত রয়েছে। তাদের সহযোগিতা ছাড়া সিসি ক্যামেরার চোখ ফাঁকি দিয়ে অত্যন্ত সুরক্ষিত ওই হোটেলটিতে খুনিরা যেমন ঢুকতেও পারবে না, তেমনি বেরুতেও পারবে না।

তবে ঘটনার পর কয়েক দিন পার হয়ে গেলেও এখনো পর্যন্ত পুলিশ হোটেলের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ জব্দ না করায় সঠিক তদন্ত নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন নিহত মিজানের পরিবারের সদস্যরা।

এদিকে মামলাটি নিয়ে রীতিমতো লুকোচুরি খেলছেন পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। প্রায় সব তথ্যই আড়াল করা হচ্ছে ‘তদন্তের স্বার্থে’।

পুলিশেরই একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, মঙ্গলবার হোটেল নাইসের মালিক খন্দকার হাসান কবিরকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছে পুলিশ। তবে এ বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে দাবি করেছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নগরীর বোয়ালিয়া মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি-তদন্ত) সেলিম বাদশা।

মামলার তদন্তের বিষয়ে জানতে চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা সেলিম বাদশা বলেন, এ বিষয়ে আমার কিছু বলার নেই। কিছু জানতে হলে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনারের কাছে জানতে পারেন।

এদিকে রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের অর্থ সম্পাদক ও রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক প্রশাসক জিয়াউল হক টুকু হত্যা মামলারও তদন্ত কর্মকর্তা বোয়ালিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি-তদন্ত) সেলিম বাদশা। এ মামলার তদন্তেও তিনি খুব বেশিদূর এগুতে পারেননি বলে জানা গেছে।

টুকু হত্যার তিন দিন পেরিয়ে গেলেও হত্যাকান্ডের জড়িত হিসেবে যে নয়নের কথা বলা হচ্ছে তার হদিস পায়নি পুলিশ। তার পুরো ঠিকানাও উদ্ধার করতে পারেনি তারা। শুধু জেলা আওয়ামী লীগের এক নেতার ভাষ্য অনুযায়ী পুলিশ বলছে, তার বাড়ি ঢাকার মতিঝিলে।

অন্যদিকে ধরা পড়েনি হত্যাকান্ডের সময় টুকুর চেম্বারে উপস্থিত থাকা টুকুর বন্ধু তরিকুল ও তার ড্রাইভার। ফলে টুকুকে কেন খুন করা হয়েছে, সে রহস্য নগরবাসীর এখনও অজানা। তবে হত্যাকা-ের সময় টুকুর চেম্বারে উপস্থিত থাকা রবিউল ও জসিম নামে দুজনকে আটক করা হয়েছে। মঙ্গলবার তাদের জেলহাজতেও পাঠানো হয়েছে। তবে তার আগে তাদের জিজ্ঞাসাবাদে কি তথ্য পাওয়া গেছে তাও জানাতে নারাজ পুলিশ।

এদিকে নিহতের পরিবারের বরাত দিয়ে নগর পুলিশের একটি সূত্র দাবি করছে, রোববার বিকেলে নগর ভবনের সামনে টুকুর সিটি চেম্বারে তাকে গুলি করার সময় সেখানে টুকুর ব্যবসায়ীক কাজের প্রায় দেড় কোটি টাকা ছিল। এই টাকা হাতিয়ে নিতেই টুকুকে ঠান্ডা মাথায় গুলি করে খুন করা হয়। তারপর নিজের রিভলবারের গুলিতে টুকু নিহত হয়েছেন বলে প্রচার করে টাকা নিয়ে পালিয়ে যান নয়ন।

আবার নগর পুলিশেরই আরেকটি সূত্র দাবি করছে, রাজশাহীর বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) ঠিকাদারি কাজ নিয়েছিল ‘মেসার্স প্রমিনেন্ট কনস্ট্রাকশন’। ঠিকাদারি এই প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার ছিলেন জিয়াউল হক টুকু। তার কাজে অংশীদার হিসেবে যুক্ত ছিলেন ঢাকার বন্ধু নয়ন। নয়নের সঙ্গে টুকুর দেনা-পাওনার দ্বন্দ্ব চলছিল। এই দ্বন্দ্বের জেরেই খুন হন টুকু।

তবে পরিবার ও পুলিশের বক্তব্য আলাদা আলাদা হওয়ায় এ বিষয়টি নিয়েও ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়েছে। এসব বিষয়ের কোনোটিরই শতভাগ নিশ্চিত করে কিছুই বলতে পারছেন না মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সেলিম বাদশা। এ মামলারও তদন্তের বিষয়েও মুখ খোলেননি তিনি।

রাজশাহী মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সহকারী কমিশনার সুশান্ত চন্দ্র রায় বলেন, এ মামলায় আমরা দুজনকে আটক করেছি। তাদের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। এখন নয়নকে আটক করতে পারলেই পুরো বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে।

অন্যদিকে হোটেল নাইস থেকে জোড়া লাশ উদ্ধারের বিষয়ে সুশান্ত চন্দ্র রায় বলেন, আমরা ফরেনসিক রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করছি। ফরেনসিক রিপোর্ট পেলেই নির্দিষ্ট একটি পথে মামলার তদন্ত কাজ এগোবে।






মন্তব্য চালু নেই