মেইন ম্যেনু

ঝিনাইদহের ক্লিনিকগুলোতে মৃত্যুর মিছিল

ঝিনাইদহের হাটে বাজারে গজিয়ে ওঠা ক্লিনিকগুলোতে যেন মৃত্যুর মিছিল চলছে। সেবা নিয়ে সুস্থ হওয়ার পরিবর্তে রোগীরা বাড়ি ফিরছেন লাশ হয়ে। ফলে শহর ও হাটে বাজারে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা ক্লিনিকগুলো কসাইখানায় পরিণত হয়েছে।

এ সব ক্লিনিকে স্বাস্থ্যসম্মত কোন পরিবেশ নেই, নেই নুন্যতম সেবা, আছে মালিকদের ব্যবসা বাজিন্য করার মনোভাব। যে করণে ভুল ও অপচিকিৎসায় অহরহ মানুষ মারা যাচ্ছে। কয়েক দিনের ব্যাবধানে জেলার মহেশপুর উপজেলার ভৈরব বাজারের জননী ক্লিনিক ও শৈলকুপার আয়েশা ক্লিনিকে ছয় জনের মৃত্যু হয়েছে। এর আগেও এই দুটি ক্লিনিকে ১০/১২ জন মারা গেছে।

সরেজমিন তদন্ত করে জানা গেছে, কয়েক দিনের ব্যবধানে মহেশপুর উপজেলার ভৈরবা বাজারে অবস্থিত জননী ক্লিনিক ও নার্সিং হোমে ৯ জন প্রসুতিকে ভর্তি করা হয়।

এরমধ্যে অপারশেনের পর মৃত্যুবরণ করেন মহেশপুরের জাগুসা গ্রামের আক্তার আলীর স্ত্রী রুপা খাতুন (২০), অনন্তপুর গ্রামের আবদুস সামাদের স্ত্রী আরিফা খাতুন (১৮), কৃষ্ণচন্দ্রপুর গ্রামের নাজমুল ইসলামের স্ত্রী বিথি খাতুন (২০) ও জীবননগর উপজেলার বারান্দী গ্রামের ইউনুচ আলীর স্ত্রী সালেহা বেগম (২৬)। এ ছাড়া মৃত্যু যন্ত্রনায় ছটফট করছেন আরো পাঁচজন। এরা হলেন মহেশপুর উপজেলার গাড়াপোতা গ্রামের আলী কদর মোল্লার মেয়ে উম্মে সালমা, মাইলবাড়িয়া গ্রামের জহুরুল ইসলামের স্ত্রী পারভিনা খাতুন (২৫), বাগানমাঠ গ্রামের আবদুল আজিজের মেয়ে জেসমিন আক্তার (২৩), হুদাপাড়া গ্রামের আনিসুর রহমানের স্ত্রী নার্গিস খাতুন (২১) ও কাজিরবেড় ইউনিয়নের কোলা গ্রামের আবদুল আজিজের স্ত্রী পারুল খাতুন (২২)। এদিকে শৈলকুপা উপজেলার আয়েশা ক্লিনিকে হিটলার নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। প্রতিটি মৃত্যুর পর রাজনৈতিক দালালরা মধ্যস্থতা করেন এবং মোটা অংকের টাকা নিয়ে ক্লিনিক মালিকদের পালিয়ে যেতে সহায়তা করেন।

যথারীতি মহেশপুর ও শৈলকুপার দুই ক্লিনিক মালিক পালিয়ে গেছে। দুই উপজেলায় কয়েক দিনের ব্যবধানে পাঁচজন রোগীর মৃত্যুর বিষয়ে ঝিনাইদহের সিভিল সার্জন ডাঃ মোঃ আবদুস সালাম জানান, খবর পেয়ে তিনি ক্লিনিক পরিদর্শন করেছেন। ক্লিনিক দুটিতে অজ্ঞান করার (অ্যানেসথেসিয়া) কোনো যন্ত্রপাতি তাঁর চোখে পড়েনি। অস্ত্রোপচারের যন্ত্রপাতি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার অটোক্লেভ মেশিনও নেই। অস্ত্রোপচার কক্ষে আবর্জনাময় জািনসি স্তূপ করে রাখা আছে।

তিনি ধারণা করছেন, সংক্রমণ থেকে প্রসূতিদের মৃত্যু হয়েছে। সিভিল সার্জন আরো জানান, শহর ব্যতিত বাইরের ক্লিনিকগুলোতে অপারশেন করার কোন পরিবেশ নেই। ক্লিনিকে সর্বক্ষন চিকিৎসক ও ট্রেনিংপাপ্ত নার্স নেই। তারপরও এই ক্লিনিকগুলো চলছে বলে তিনি জানান। তবে মহেশপুরের ভৈরব বাজারের কসাইখানা খ্যাত জননী ও শৈলকুপার আয়েশা ক্লিনিক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলে সিভিল সার্জন জানান। জননী ক্লিনিকের মালিক মো. মোমিনুর রহমান ও আয়েশা ক্লিনিকের মালিক সাইদুর রহমান জনরোষে আগেই পালিয়েছেন।

ঝিনাইদহ সিভিল সার্জন অফিস সুত্রে জানা গেছে জেলায় ১১৪টি ক্লিনিক রয়েছে। এর মধ্যে ৬০টির বেশি ক্লিনিকের নবায়ন নেই। এছাড়ও রয়েছে বৈধ অবৈধ ভাবে গজিয়ে ওঠা প্যাথজলিক্যাল ক্লিনিক। অনেকে গায়ের জোরে ক্লিনিক ও প্যথলজি চালাচ্ছেন। মহেশপুর এলাকায় ৩০টি ক্লিনিক রয়েছে। এ সব ক্লিনিকে দেদারছে অপারেশন করেন পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের কর্মকর্তা গোলাম রহমান, ৩৩তম বিসিএসে নিয়োগ পাওয়া চিকিৎসক মো. আসাদুজ্জামান ও ডাঃ নিপু।

এছাড়াও গোলাম রহমান জীবননগর, কোটচাঁদপুর ও দর্শনা এলাকায় অফারেশন করেন। সারা রাত ধরে তিনি দাপিয়ে বেড়ান টাকার লোভে। অভিযোগ উঠেছে মফস্বলের ক্লিনিকগুলোতে গ্রাম থেকে যুবতী মেয়ে এনে নাসের্র পোশাক পরিয়ে দেহ ব্যবসা করা হচ্ছে। সদর উপজেলার হলিধানী, বৈডাঙ্গা বাজার, সাধুহাটী মোড়, ডাকবাংলা বাজার, দশমাইল, বাজারগোপালপুর, নারায়নপুর ত্রীমোহনী, বিষয়খালী বাজার ও হাটগোপালপুরে এ ধরণের ক্লিনিকের অস্তিত্ব রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে বৈডাঙ্গা বাজার, সাধুহাটী মোড়, ডাকবাংলা বাজার, দশমাইল ও বাজারগোপালপুর এলাকায় মুন্সি মোঃ শাহিন রেজা সাঈদের নিউ ইসলামী প্রাইভেট হাসপাতাল নামে একাধিক ক্লিনিক রয়েছে। এখন প্রশ্ন উঠেছে জমজমাট ব্যবসা না হলে কি করে তিনি এতোগুলো ক্লিনিক চালান ? এ সব ক্লিনিকে অপচিকৎসা চলছে বলে অভিযোগ। তাছাড়া সাঈদের ক্লিনিকে সর্বক্ষনিক ডাক্তার ও নার্স নেই। মানসম্মত পরিবেশও দেখা মেলেনি। দুর্গন্ধ পরিবেশে রোগীরা ছটফট করেন।

এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, জেলার ক্লিনিকগুলোতে রোগী মারা গেলেও চিকিৎসক বা ক্লিনিক মালিকের দৃষ্টান্তমুলক কোন শাস্তি হয়নি। ডাক্তারা রোগীর স্বজনদের সাথে দ্রুত টাকা লেদদেন করে রফা করেন। এ সংক্রান্ত আইনটিও দুর্বল। ফলে ডাক্তার ও ক্লিনিক মালিকের ভয় নেই। কিন্তু শোক বয়ে বেড়াতে হয় স্বজনদের। ফলে কতিপয় ডাক্তাররাও যেন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।

মহেশপুর ও শৈলকুপায় পাঁচ রোগীর মৃত্যুর আগেও জেলায় অপচিকৎসা ও ভুল অপারেশনে অহরহ মৃত্যু হয়েছে রোগীর। জানুয়ারী মাসে বৈডাঙ্গা ক্লিনিকে মারা যান কুল্লোগাছা গ্রামের চুমকি। ডক্টরস ক্লিনিকে মাগুরা এলাকার জুয়েল ও তার স্ত্রী নাসরিণ মারা যান। গত এপ্রিল মাসে ঝিনাইদহ শহরের প্রিন্স প্রাইভেট হাসপাতালে হাসান আলী শেখ (৪৫) নামে এক রোগির মৃত্যু হয়।

এ ঘটনায় রোগীর স্বজনরা শহরের হামদহ এলাকায় অবস্থিত প্রিন্স হাসপাতাল ভাংচুর ও লুটপাট করে। মৃত হাসান আলী ঝিনাইদহ সদর উপজেলার ঘোড়ামারা গ্রামের কপিল শেখের ছেলে। অজ্ঞানের ডাক্তার প্রবির কুমার মন্ডল অজ্ঞান করলে সদর হাসপাতালের সার্জন ডা. জাহিদুর রহমান তাকে অপারেশন করেন। অপারশেনের পর তার আর জ্ঞান ফেরেনি।

গত মে মাসে শৈলকুপার আয়েশা ক্লিনিকে রাফেজা ও বারইপাড়া গ্রামের তহুরা খাতুন নামে দুই প্রসুতি মারা যান অপচিকৎসায়। শৈলকুপার খোন্দকার প্রাইভেট হাসপাতালে মারা যান কোহিনুর খাতুন। দুষিত ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে অনেক ক্লিনিককে জরিমানা ও সিলগালা করা হলেও বিশেষ কায়দায় তারা আবারো মুক্ত হয়ে যান।

জেলা প্রশাসন সুত্রে জানা গেছে, ইতিমধ্যে কালীগঞ্জে ইবনে সিনা, সুমন, হরিণাকুন্ডুর ভাই ভাই ও ফারজানা ক্লিনিকসহ ৭টি ক্লিনিকে অভিযান চালিয়ে জরিমানা করা হয়েছে। এসব ক্লিনিকে স্বাস্থ্যকর কোন পরিবেশ নেই।

এ বিষয়ে অস্ত্রোপচারকারী চিকিৎসক গোলাম রহমান বলেন, ‘অপারেশনের যন্ত্রপাতি ঠিকমতো দূষণমুক্ত না করায় এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে আমরা ধারণা করছি। ওই কারণেই রোগীদের মেনিনজাইটিস দেখা দিচ্ছে এবং মৃত্যু হচ্ছে।

মহেশপুরের জাগুসা গ্রামের আবু বক্কর বলেন, ‘দেড় লাখ টাকা খরচ করেও তার মেয়ে রুপাকে বাঁচাতে পারিনি। আমরা গরিব মানুষ। এখন রুপার শিশুটির কী হবে ভেবে পাচ্ছি না।

ক্লিনিক মালিক খোকন তাদের ৫০ হাজার টাকা ক্ষতিপুরণের প্রস্তাব দিয়েছে বলে রুপার চাচা মসিয়ার রহমান জানান। তিনি বলেন, ‘টাকা নয়, বিচার চাই আমরা।






মন্তব্য চালু নেই