মেইন ম্যেনু

এটিএম বুথ জালিয়াতি : পিটারের স্ত্রী মেরিনা

টাকা আর নতুন সংসারের প্রয়োজনে বিয়ে করেছি

পাসপোর্ট অনুযায়ী থমাস পিটারের বয়স ৪২ বছর। তবে চেহারা দেখে গোয়েন্দারা ধারণা করছেন, তার প্রকৃত বয়স ৫৬ ছুঁই ছুঁই। আর তার বাংলাদেশী স্ত্রী মেরিনার বয়স মাত্র ৩০-এর কোঠায়। বয়সের এই বিস্তর ফারাক হলেও তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এর পেছনে ছিল মেরিনার নিষ্ঠুর নিয়তি। অভাব যেন তাকে তাড়া করে ফিরছিল। সন্তানসহ স্বামী ফেলে গেছে অথৈ সাগরে। নিজের পরিবারের আর্থিক অবস্থাও নড়বড়ে। তাই তাকে টাকাওয়ালা পঞ্চাশোর্ধ বিদেশীর প্রেম-প্রস্তাবে ধরা দিতে হয়। বিয়েও করেন অনেকটা রাতারাতি। গোয়েন্দাদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মেরিনা তার বিদেশী স্বামী থমাস পিটারের জালিয়াতি নিয়ে কিছুই জানেন না বলে জানিয়েছেন। আর তিনি বলেছেন একই কথা। তবে থমাস পিটারের সব ধরনের জালিয়াতির বিষয়ে মেরিনা অবগত আছেন বলে গোয়েন্দারা অনেকটা নিশ্চিত।

মঙ্গলবার মেরিনা বলেন, থমাস পিটারকে একজন ব্যবসায়ী হিসেবেই জানেন তিনি। শুধু এই পরিচয়ের সূত্র ধরেই তাকে বিয়ে করেন। তাছাড়া কঠিন কস্টে অভাব-অনটনের মধ্যে তার জীবন চলছিল। তাই টাকা আর নতুন একটি সংসারও তার প্রয়োজন ছিল। বলতে পারেন, টাকা আর নতুন সংসারের প্রয়োজনে পিটারকে বিয়ে করেছি। মূলত এ কারণেই জাত-ধর্মের দিকে তিনি তাকাননি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পিটার তার ধর্ম পালন করত, আমি আমার (মুসলিম) ধর্ম। সন্তানের নামের বিষয়ে জানতে চাইলে মেরিনা বলেন, ওর নাম পিটারই রেখেছে আলেকজান্ডার এলেক্স। পিটার শিশুপুত্রকে এলেক্স বলেই ডাকত।

এ বিষয়ে মেরিনার মা মঙ্গলবার জানান, মেয়ের বিয়ের বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। সে নিজেই বিয়ে করেছে। ‘তবে পিটারের টাকায় আমার মেয়ে ভালো ছিল’। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘মেয়েজামাই লাখ টাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে থাকত। সে আমার মেয়ের জীবনটা পাল্টে দিয়েছে।’ নিজের অভাবের কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘একসময় আমাদের অবস্থা তেমন ভালো ছিল না। এখন আগের তুলনায় ভালো আছি।’ অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পিটারকে ছাড়িয়ে আনতে আদালতে আইনজীবী নিয়োগ করা হয়েছে।

ইতিমধ্যে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা একরকম নিশ্চিত হয়েছেন, পিটার টাকা নিয়ে কোনো চিন্তা করতেন না। তিনি মেরিনাকে প্রায় বলতেন, মানি ইজ নো প্রবলেম। শুরু থেকেই তার শুধু একটাই চিন্তা ছিল, ‘নিরাপদ একটি আশ্রয়স্থল’। কারণ এর আগে ইউরোপসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশে তিনি ফেরারি হিসেবে কঠিন সময় পার করেছেন। ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি বা ডিজিটাল পকেটমেরে তিনি এই জীবনে বহু অর্থকড়ির মুখ দেখেছেন। কিন্তু সে অর্থ কোথাও স্থির রেখে শান্তিমতো ভোগ করতে পারেননি। তবে বাংলাদেশে তিনি কিছুটা হলেও আশার আলো দেখতে পেয়েছিলেন। বিশেষ করে মেরিনাকে বিয়ে করে ধীরে ধীরে রাজা-মহারাজা ভাবতে শুরু করেছিলেন।

এদিকে তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, পিটার বাংলাদেশে আসার পর তার ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি হোটেল হলিডে প্লানেট কর্তৃপক্ষ জানত। কিন্তু মাসের পর মাস একজন বিদেশীর কাছ থেকে মোটা অংকের স্যুট ভাড়া পাওয়ায় তারা বিষয়টি চেপে যায়। হোটেল ভাড়া হিসেবে প্রতিমাসে বিপুল অংকের টাকা পরিশোধ করতেন তিনি। শুধু নিজের কক্ষের ভাড়া নয়, বিভিন্ন দেশ থেকে আসা তার সহযোগীদেরও এই হোটেলে এনে রাখতেন। সেসব কক্ষের পুরো বিলই পরিশোধ করতেন তিনি। সে সময় একই হোটেলে কর্মরত ছিলেন মেরিনা। তবে কয়েক দফা ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। এরপর ঢাকায় স্থায়ীভাবে থাকার জন্য মেরিনাকে প্রেমের জালে ফেলেন পিটার। চেয়েছিলেন মেরিনাকে বিয়ে করে এখানে নাগরিকত্ব নেবেন। তার বিয়ের স্বপ্ন পূরণ হলেও শেষেরটা আর হয়নি। ডিজিটাল পকেটমারায় ধরা খেয়ে এখন তার ঠাঁই হয়েছে ডিবির হাজতখানায়। অপরাধ অনেকটা প্রমাণিত হয়ে যাওয়ায় রিমান্ড শেষে সহসা তাকে জেলেও যেতে হবে।

সূত্র জানায়, অবৈধভাবে বসাবাসকারী একজন বিদেশীকে বিয়ে করার পেছনেও ছিল মেরিনার গোপন চুক্তি। চুক্তি অনুযায়ী বিয়ের সময় এককালীন মোটা অংকের নগদ টাকা দেয়ার কথা ছিল। অবশ্য পিটার বিয়ের সময় কথা রেখেছেন। মেরিনা এ টাকা তার পরিবারের কাছে পাঠিয়ে দেয়। এছাড়া প্রতি মাসে পরিবারের খরচের জন্য পিটার টাকার জোগান দিতেন।

সূত্র জানায়, পিটার ২০১১ সালের শেষদিকে বাংলাদেশে প্রথম আসেন। কিছুদিন আসা-যাওয়ার মধ্যে ছিলেন। ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি ছাড়াও সে সময় তিনি আদম পাচারের একটি আন্তর্জাতিক চক্রের সঙ্গে সক্রিয় ছিলেন। এ সুবাদে ঢাকায় কয়েকজন আদম ব্যবসায়ীর সঙ্গে তার সখ্য গড়ে ওঠে। আর একপর্যায়ে ঢাকায় একেবারে থেকে যাওয়ার জন্য সব শেষে তিনি শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পা রাখেন ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে। ওই সময় তিনি একজন ব্যবসায়ী হিসেবে অন-অ্যারাইভেল ভিসা নিয়ে এক মাসের জন্য বাংলাদেশে আসেন। যথারীতি থমাস পিটার ওঠেন হলিডে প্লানেটে। এরপর ২০১৫ সালের জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়েই তার ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর জন্য কয়েক দফায় চেষ্টাও করেন। কিন্তু সিদ্ধান্ত পাওয়ার আগেই বাংলাদেশে থাকার বৈধতা হারিয়ে যায়। অতঃপর পূর্ব পরিকল্পনা অনুযাী ওই সময় তিনি মেরিনাকে বিয়ে করেন।

সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক ক্রেডিট কার্ডের পাসওয়ার্ড চুরি করে ঢাকায় এসে এটিএম বুথ থেকে যে পরিমাণ টাকা পিটার হাতিয়ে নিয়েছেন তার পরিমাণ কয়েক কোটি। কিন্তু এখানকার আইনশৃংখলা বাহিনী কোনোদিন তার টিকিটিও ছুঁতে পারেনি।

গোয়েন্দাদের জিজ্ঞাসাবাদে বিষয়টি অকপটে স্বীকার করে বলেছেন, এটিএম বুথ থেকে বাংলাদেশী গ্রাহকের যে ২০-২২ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে এগুলো তার কাছে কোনো বিষয় না। উল্টো গোয়েন্দা পুলিশকে পিটার বলেছেন, ‘আমি ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি করে আরও বহুগুণ টাকা তুলে নিয়েছি। কিন্তু ওই ক্রেডিট কার্ডের গ্রাহকরা তোমার দেশের না হওয়ায় তোমরা কোনো অভিযোগ পাওনি।’ বাংলাদেশী ব্যাংক গ্রাহকদের টাকার তুলনায় সেই টাকার পরিমাণ শত শত গুণ বেশি। পিটারের এমন স্বীকারোক্তিতে গোয়েন্দারাও বিস্মিত। চাঞ্চল্যকর এ স্বীকারোক্তি যাচাই করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাহায্য চাইবে তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

এদিকে মেরিনা নবজাতকের মা হওয়ায় গোয়েন্দারা তাকে তেমন একটা জিজ্ঞাসাবাদও করেননি। তবে তাকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে। তবে স্বামী আটক হওয়ার পর গুলশানের বিলাসবহুল ফ্ল্যাট বাসা ছেড়ে হাজারীবাগে মায়ের বাসায় ওঠেছেন।






মন্তব্য চালু নেই