মেইন ম্যেনু

টাকা দিলেই ভুয়া বিল, ঢাকায় পানি পায় না ৬৫% লোক

অনিয়ম আর দুর্নীতির কারণে রাজধানী ঢাকায় ৯৭ লাখ মানুষ নিরাপদ পানি সরবারহ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শেখ তৌহিদুল ইসলাম। সেই অনুসারে ৬৫ শতাংশ লোক নিরাপদ পানি থেকে বঞ্চিত।

রোববার দুপুরে ধানমণ্ডিস্থ টিআইবি কার্যালয়ের কনফারেন্স রুমে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। এর আগে তিনি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ও বাংলাদেশ ওয়াটার ইন্টেগ্রিটি নেটওয়ার্ক (বাউইন)-এর যৌথ আয়োজনে ‘বাংলাদেশ পানি ব্যাবস্থাপনায় শুদ্ধাচার; বর্তমান প্রেক্ষিত ও উন্নয়ন সম্ভাবনা’ শীর্ষক একটি বেইজলাইন গবেষণায় প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। গবেষণাটি যৌথভাবে পরিচালনা করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সৈয়দ হাফিজুর রহমান এবং অধ্যাপক ড. শেখ তৌহিদুল ইসলাম।

অধ্যাপক ড. শেখ তৌহিদুল ইসলাম জানান, শুধু রাজধানী ঢাকাতেই ৯৭ লাখ মানুষ নিরাপদ পানি সরবারহ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সেই অনুসারে ৬৫ শতাংশ নিরাপদ পানি পাচ্ছে না। ঢাকা ওয়াসাকে নিয়ে গবেষণার পর দেখা গেছে এখানে নিয়ম বহির্ভূতভাবে কার্যাদেশ পরিবর্তন ও অতিরিক্ত কাজের অনুমোদন দেয়া হয়। অন্যদিকে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডে ভুয়া বিলের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।

বহুমুখি সমস্যা ও দুর্নীতির ভারে জর্জরিত বাংলাদেশের পানি খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে পানি ব্যবস্থাপনাকে জাতীয় শুদ্ধাচারের আওতায় আনার আহ্বান জানানো হয়। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের পানি খাতের সুশাসন নিশ্চিতকরণে টিআইবি ও বাউইন নয় দফা সুপারিশ করে। গবেষণায় উত্থাপিত নয় দফা সুপারিশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- সংশ্লিষ্ট নীতিমালা, আইন, কৌশলপত্র, নির্দেশিকা ইত্যাদি হালনাগাদ করা এবং এর ভিত্তিতে ইস্যুভিত্তিক কার্যপ্রণালী প্রণয়ন করা; জাতীয় পানি আইন, ২০১৩ এর আলোকে জাতীয় পানিসম্পদ কাউন্সিলকে পর্যবেক্ষক হিসেবে কার্যকর করা; প্রকল্পগুলোকে শুদ্ধাচারের মানদণ্ডের সাথে সামঞ্জস্য রেখে প্ল্যানিং কমিশনের ডিপিপি (ডেভলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রফর্মা) পুনঃনিরীক্ষা ও সংস্কার করা; কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধি ও মানবসম্পদ উন্নয়ন করা; আইএমইডি’কে শক্তিশালীকরণ ও পানি ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত প্রকল্প মূল্যায়নে দক্ষতা বৃদ্ধি করা; সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিভিন্ন পর্যায়ে জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং পানি ব্যবস্থাপনায় শুদ্ধাচার নিশ্চিত করার জন্য ইস্যুভিত্তিক গবেষণা করা ইত্যাদি।

বেইজলাইন প্রতিবেদনটিতে দেশে বিদ্যমান পানি বিষয়ক নীতি আইন ও বিধি সংশ্লিষ্ট ২৯টি সরকারি নথিপত্র বিশ্লেষণ এবং ঢাকা ওয়াসা ও বাংলাদেশ ওয়াটার ডেভলপমেন্ট বোর্ডের পানি ব্যবস্থাপনা ও সেবাদান প্রক্রিয়ায় সততার মাত্র নিরূপন করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, দুর্বল আইন এবং তার সঠিক বাস্তবায়নের নির্দেশিকার অভাবে পানি ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে। এক্ষেত্রে সামঞ্জস্যপূর্ণ আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো হালনাগাদ ও আধুনিকায়ন না হওয়ায় নাগরিক সেবা প্রদানে বাধার সৃষ্টি হচ্ছে। সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ও সেবাগ্রহীতাদের কার্যকর যোগাযোগের (অংশগ্রহণসহ) ঘাটতির কারণে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণে চ্যালেঞ্জের সৃষ্টি; দুর্নীতির জন্য দৃষ্টান্তমূলক ও দৃশ্যমান শাস্তি না হওয়ায় দুর্নীতি করার প্রতি উৎসাহ বৃদ্ধি পেয়েছে।

২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৫ সালের জুন পর্যন্ত পরিচালিত এই গবেষণায় ঢাকা ওয়াসা ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা ও কর্মচারিদের নিয়ম লঙ্ঘন, আর্থিক দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়া, দুর্নীতির শাস্তি না হওয়া এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হওয়ার তথ্যও উদঘাটিত হয়েছে। ঢাকা ওয়াসায় অনানুষ্ঠানিকভাবে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে রাজনৈতিক নেতা ও দালাল কর্তৃক পানি সরবরাহ নিয়ন্ত্রিত; নিয়ম-বহির্ভূতভাবে কার্যাদেশ পরিবর্তন ও অতিরিক্ত কাজের অনুমোদন, নিয়ম-বহির্ভূতভাবে কর্মকর্তা নিয়োগ-বিজ্ঞাপন না দিয়ে নিয়োগ প্রদান, কর্মকর্তাদের একাংশ কর্তৃক ওয়াসার ভূমি দখল ইত্যাদি। অন্যদিকে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের ক্ষেত্রে প্রকল্প প্রস্তাবনায় উল্লিখিত কারিগরি নির্দেশনা না মেনে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা, বাঁধের জন্য উল্লিখিত জিওব্যাগ ব্যবহার না করা, ২৬ ইঞ্চি ড্রেজারের পরিবর্তে ২২ ইঞ্চি ব্যবহার ও ভুয়া বিলের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।

ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় সততার বিষয়টি তুলে ধরার জন্য ঢাকা ওয়াসার কর্মকাণ্ডও বিশ্লেষণ করা হয়। চাহিদার বিপরীতে পানি সেবা/সরবরাহ প্রদানে ক্ষমতার অভাব, পানি বিতরণ প্রক্রিয়ার বিভিন্ন পর্যায়ে অনানুষ্ঠানিক ও অনুমোদনহীন ব্যক্তিদের (যেমন দালাল) হস্তক্ষেপ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নাগরিকদের অংশগ্রহণের সীমিত সুযোগ, কার্যকর পানি ব্যবস্থাপনার জন্য স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা, বৈধতা ও আইনসিদ্ধতা, সমতা এবং অন্তর্ভূক্তির মতো প্রয়োজনীয় আচরণরীতির অভাবকে ঢাকা ওয়াসার জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ঢাকায় পানি সঙ্কটের মূল কারণ হলো ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের (সরকারি ও বেসরকারি উভয় প্রকার) অবৈধ/অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়ে কর্তৃপক্ষের অক্ষমতা; বেআইনিভাবে নদী/খাল দখল থেকে শুরু করে শিল্পবর্জ্য ফেলা এবং অপরিকল্পিতভাবে নগর এলাকার উন্নয়ন অন্যতম।

অন্যদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বাংলাদেশে নতুন পানি প্রকল্পের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন এবং বিদ্যমান পানি-নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পগুলোর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে নিয়োজিত। এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান কাজ হলো বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ। অধিকন্তু, বিভিন্ন খাতে পানির বর্ধিষ্ণু চাহিদা, উৎপত্তিস্থলে পানির ঘাটতি, পানি ব্যবহারের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ চরিত্র, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত হুমকিসহ দুর্যোগের নতুন ধরন এবং সংঘটনের অধিক হার, বিষাক্তকরণ (যেমন আরসেনিক ও ক্লোরিন) ও পানি দুষণ, এবং খাল ও জলপথের অবৈধ দখল পানি খাতের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে; এগুলো বিদ্যমান সমস্যাগুলোকে আরো জটিল করে তুলেছে। এসব পুরোনো ও নতুন চ্যালেঞ্জ সম্মিলিতভাবে বিদ্যমান সমস্যাগুলোয় নতুন মাত্রা যোগ করেছে, যেগুলো সমাধানে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নতুন নীতির অভাব রয়েছে এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মসূচি ও কাজে তা অল্পই প্রতিফলিত হচ্ছে।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘ঢাকা ওয়াসা ও পানি উন্নয়ন বোর্ডে এলাকা ও ব্যক্তি ভিক্তিক বৈষম্য আছেই। এসব সেবা প্রদানকারী সংস্থায় রাজনৈতিক ও এক ধরনের দালাল চক্র নিয়ন্ত্রণ করছে। এদের আবার বিভিন্ন স্তর ভেদে সিন্ডিকেট আছে। এরকম শত শত অভিযোগ থাকলেও কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় সুফল আসছে না।’ যারা এসব দুর্নীতিতে জড়িত তাদের আইনে আওয়তায় এনে শাস্তি প্রদান করলেই কেবল এসব সেবা প্রতিষ্ঠান সেবার পরিমান আরো বৃদ্ধি করা সম্ভাব বলে যোগ করেন তিনি।

এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন টিআইবি’র উপ-নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের, অধ্যাপক ড. সৈয়দ হাফিজুর রহমান এবং বাউইন সমন্বয়কারী সনজীব বিশ্বাস সঞ্জয়।

উল্লেখ্য, বাউইন হলো ২০০৯ সালে টিআইবির উদ্যোগে পানি খাতের ১৭টি বিভিন্ন সংস্থা ও বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে গঠিত একটি নেটওয়ার্ক।






মন্তব্য চালু নেই