মেইন ম্যেনু

টাকা দিলে সব চলে মহাসড়কে

মো. সুমন মিয়া (২৫)। গাবতলীর পার্শ্ববর্তী আমিন বাজার থেকে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের সাভার নবীনগর পর্যন্ত ব্যাটারিচালিত রিকশা চালান প্রতিদিন। মহাসড়কে রিকশা চলাচল নিষেধ। এরপরও তিনি রিকশা কিভাবে চালাচ্ছেন জানতে চাইলে বলেন, ‘পুলিশ মাঝে মধ্যে ধরে, কিন্তু টাকা দিলেই ছেড়ে দেয়।’

অপর রিকশা চালক মঈন উদ্দীনও (৩০) এই মহাসড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশা চালান। তার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আইন আছে, বাস্তবায়ন নেই। আর টাকার কাছে আইন বলতে কিছু নাই।’

বিষয়টি খোলাসা করে তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন ২০টাকা করে পুলিশকে দিয়ে মহাসড়কে রিকশা চালাই। এ রকম আমিনবাজার-হেমায়তপুর ও নবীনগর এলাকায় প্রায় ৫ হাজার রিকশা চলাচল করছে।’

মঈনের দেয়া তথ্যমতে, প্রতিদিন প্রতি রিকশা ২০টাকা হলে ৫ হাজার রিকশায় ১ লাখ টাকা। ৩০ দিনে ৩০ লাখ টাকা অবৈধ চাঁদা বাণিজ্য করছে পুলিশ। চাঁদার বদৌলতেই মহাসড়কে রিকশা, ভ্যান, অটোরিকশা, নছিমন, করিমসহ সবই চলে।

ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের হেমায়েতপুর বাস স্ট্যান্ডে কথা হয় অটোরিকশা চালক রহমান আলীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘জাতীয় মহাসড়কে অটোরিকশা চলাচলের নিষেধাজ্ঞা জারির পর থেকে ৫-৭ দিন প্রশাসনের কড়াকড়ি ছিল। বলতে গেলে এখন সব শিথিল হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। তাই আমরা সবাই মহাসড়কে অটোরিকশা নিয়ে যাচ্ছি। বিনিময়ে অটোরিকশা প্রতি প্রতিদিন ৩০ টাকা করে দিতে হচ্ছে। এ রকম অটোরিকশা আছে প্রায় ৩ হাজার।’

রহমান আলীর হিসেব মতে অটোরিকশা থেকে প্রতিদিন অবৈধ চাঁদা তুলছে ৯০ হাজার টাকা। মাসে ৯ লাখ টাকা। শুধু ব্যাটারি চালিত রিকশা আর অটোরিকশা নয়। হ্যালো বাইক, নছিমন, কমিরমন, ঠ্যালাগাড়ি, ভ্যানসহ সব ধরনের নিষিদ্ধ ধীরগতির ছোট যান চলছে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে।

গত শনিবার সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১ টা পর্যন্ত আমিনবাজার-হেমায়েতপুর-সাভার ও নবীনগর পর্যন্ত প্রায় ৩০ কিলোমিটার ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক সরজমিনে ও সংশ্লিস্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব চিত্র উঠে এসেছে।

দুপুর ১২টা থেকে ১২টা ১০ মিনিট হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ডে অবস্থানকালে দেখা গেছে, হেমায়েতপুর থেকে সাভার, নবীনগর ও আমিনবাজার পর্যন্ত এসব ব্যাটারি চালিত রিকশা, অটোরিকশা, ভ্যান, ঠ্যালাগাড়ি চলতে দেখা গেছে। ১০ মিনিটে এই তিনটি স্থানে প্রায় পঞ্চাশের অধিক অটোরিকশা ছেড়ে গেছে। হেমায়েতপুর এখন অটোরিকশা ও রিকশার স্থায়ী স্ট্যান্ড হিসেবে পরিণত হয়েছে।

সাভারের ব্যাংক কলোনি স্ট্যান্ডেও একই চিত্র লক্ষ্য করা গেছে। তবে সেখানে ব্যাটারিচালিত রিকশার আধিপত্য বেশি বলে মনে হয়েছে। সাভার স্ট্যান্ডেও শত শত রিকশা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় গেট ও নবীনগরের ২০ মাইল এলাকায় জুড়ে একই চিত্র চোখে পড়েছে। সব মিলে রিকশা ও অটোরিকশার দখলে রয়েছে মহাসড়ক।

হেমায়েতপুর মোড়ে কর্তব্যরত মো. আরিফ নামের এক ট্রাফিক পুলিশ বলেন, ‘রিকশা ও অটোরিকশার পরিমাণ গত ৫ বছরে দ্বিগুণ হয়েছে। সে হারে আমাদের জনবল বাড়েনি। একদিকে আটকালে অন্যদিক মহাসড়কে উঠে যাচ্ছে রিক্শা ও অটোরিকশাগুলো। লোকসঙ্কটের কারণে আমরা হিমশিম খাচ্ছি। তা ছাড়া বিআরটিএ থেকেও তেমন কোনো সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে না।’

এ চিত্র শুধু ঢাকা-আরিচা মহাসড়কেই নয়, ঢাকা-গাজীপুর, টাংগাইল, মহয়নসিংহ, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ, কুমিল্লাসহ প্রায় সব মহাসড়কেই এসব যান্ত্রিক-অযান্ত্রিক নিষিদ্ধ ধীরগতির যান চলাচল করছে।

এ ব্যাপারে সাভার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ প্রসঙ্গে কোনো কথা বলতে চান নি।

গত ১ আগস্ট (শনিবার) থেকে জাতীয় মহাসড়কে সিএনজি চালিত অটোরিকশাসহ সবধরনের অযান্ত্রিক যানবাহন চলাচলের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এর পর থেকে নিষিদ্ধ যানবাহন চলাচল বন্ধে সারাদেশে অভিযান পরিচালনা শুরু করে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) ও জেলা প্রশাসন।

তবে বিআরটিএ দাবি করেছে জেলা প্রশাসনের পাশপাশি মহাসড়কে নিষিদ্ধ যানবাহন চলাচল বন্ধে বিআরটিএর ৫ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছেন। মহাসড়কে ধীরগতির যান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আগে থেকেই ছিল। ২০০৬ সাল থেকে ব্যাটারিচালিত নছিমন, করিমন, ভটভটি চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়। নতুন করে নিষিদ্ধ হয়েছে সিএনজি চালিত অটোরিকশা।

গত ২৭ জুলাই সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের প্রজ্ঞাপণে, সড়কের নিরাপত্তা বিধানে সব জাতীয় মহাসড়কে থ্রি হুইলার অটোরিকশা/অটোটেম্পো এবং সব ধরনের অযান্ত্রিক যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ এবং ১ আগস্ট শনিবার থেকে তা কার্যকর করা হলেও বাস্তবে তা চোখেই পড়ছে না।

এর আগে গত ২২ জুলাই সচিবালয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে এক সভায় মহাসড়কে অটোরিকশা নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ওই বৈঠক শেষে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, মহাসড়কে নতুন উপসর্গ সিএনজি অটোরিকশা। যা দ্রুত দুর্ঘটনায় পড়ে। এগুলো মহাসড়কে খুব বেশি হারে চলে এসেছে। এ সব অটোরিকশাই বেশি দুর্ঘটনা ঘটাচ্ছে। তাই দুর্ঘটনা রোধে মহাসড়কগুলোতে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচল বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।

এখও পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, ‘জাতীয় মহাসড়কে তিন চাকার যানবাহন চলাচল বন্ধে কঠোর আছে সরকার। প্রয়োজনে আরো কঠোর হবে।’

উল্লেখ্য, সারাদেশে ২ লাখ ৫০ হাজার সড়ক মহাসড়ক রয়েছে। এরমধ্যে মাত্র ৩ হাজার ৫৭০ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়কে অটোরিকশা চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। বাংলামেইল






মন্তব্য চালু নেই