মেইন ম্যেনু

প্রসিকিউশনের চোখে একাত্তরের নির্মমতা- ২

টানা ৮ মাস পালাক্রমে আমাকে ধর্ষণ করা হয়েছে

একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের মামলা পরিচালনা করে তাদেরকে উপযুক্ত বিচারের কাঁঠগড়ায় দাঁড় করাতে নিরলস পরিশ্রম করছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিম। প্রতিটি মামলা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার স্বার্থে তাদেরকে তদন্ত সংস্থার সঙ্গে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংগঠিত হয়েছে- এমন বিভিন্ন স্থানে যেতে হয়েছে। মামলার বিভিন্ন সাক্ষ্য-প্রমাণ খুঁজতে তারাও হয়েছেন কালের নতুন সাক্ষী। ঘটনাবহুল নির্মম সেই একাত্তরকে নিয়ে বিশেষ এই প্রতিবেদনটিকে সাজানো হয়েছে। ধারাবাহিক এই প্রতিবেদনের আজকের অংশে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর সাবিনা ইয়াসমিন মুন্নি তার সেই নির্মম অভিজ্ঞতার কথা মাধ্যমে তুলে ধরেছেন।

প্রসিকিউটর সাবিনা ইয়াসমিন মুন্নি বলেন, ‘একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে জাতীয় পার্টির সাবেক প্রতিমন্ত্রী কায়সারের মামলা পরিচালনা করার সময় হবিগঞ্জের হীরা মণি নামে এক মহিলা তার একাত্তরের স্মৃতি তুলে ধরেন। একাত্তরে তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া নির্মমতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে তার বারবার স্মৃতিভ্রম হতে থাকে। তার বাড়িতে যাবার পর তিনি ঘরের দরজা বন্ধ করে তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া নির্মমতা শুধু আমাকেই বলতে রাজি হয়।’

তিনি বলেন, ‘ঘটনা অনুসারে হীরা মণিকে একাত্তরের যুদ্ধের শুরুতে হবিগঞ্জের চা বাগান থেকে পাকিস্তানি আর্মিরা তুলে নিয়ে যায়। তুলে নেবার পর একটি ঘরে বন্দি রেখে প্রত্যেকদিন ৪/৫ জন আর্মি তাকে ধর্ষণ করতে থাকে। সেই ঘরের মেঝেতে একটি মাত্র চৌকি (শোবার খাট) ছিলো। একটি মাত্র কাপড়ে সেই বদ্ধ ঘরে তাকে টানা ৮ মাস রেখে তাকে ধর্ষণ করা হয়েছিলো।’

একটি ঘরে টানা ৮ মাস এক কাপড়ে কীভাবে থাকলেন জানতে চাইলে হীরা মণি আমাকে জানায়, ‘ঘরে কোনো কিছুতে ঝুলে আমি যেন আত্মহত্যা করতে না পারি, সেজন্য আমার গায়ের কাপড় আগে থেকেই খুলে নেয়া হয়েছিলো। তখন শুধু পেটিকোট পড়েই ছিলাম।’

এই দীর্ঘ ৮ মাস মেয়েলী সমস্যার ক্ষেত্রে কী করেছিলেন? এমন প্রশ্নে হীরা মণি আমাকে জড়িয়ে ধরেন। তিনি জানান, প্রতিমাসে যখন মেয়েলী সমস্যা দেখা দিত তখন তারা আমাকে মেঝেতে ফেলে ধর্ষণ করতো। তবুও ছেড়ে দিত না। আর যখন সুস্থ্য থাকতাম তখন আমাকে বিছানায় নিয়ে ধর্ষণ করতো। সমস্যা থাকা অবস্থায় আর্মিরা ধর্ষণ করে আমাকে মেঝেতে ফেলে যেত। তখন সমস্ত মেঝেতে রক্ত বয়ে যেত। আমি তখন পেটিকোট খুলে সেই রক্ত পরিষ্কার করতাম। তারপর পেটিকোট বাথরুমে নিয়ে ধুয়ে দিতাম। আবার আর্মিরা আসার সময় হলে আমি পেটিকোট পরে নিতাম।’

‘দীর্ঘ ৮ মাস বন্দি করে রাখা সে ঘরটির দরজা সব সময় তালা দিয়ে বন্ধ করা থাকতো। ঘরের জানালা পেরেক দিয়ে বন্ধ করা ছিলো, যেন বাইরে কারো সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারি। দরজার একটি ফাঁকা দিয়ে তারা কখনো খেতে দিত, কখনো খেতে দিত না। প্রতিদিন ১ বেলার বেশি খাবার তারা দিত না। প্রতিদিন ৪/৫ জন করে ধর্ষণ করতে থাকায় খুব অসুস্থ্য হয়ে পড়লাম। তারা তখন ১টা মাত্র ব্যাথার ওষুধ দেয়। ওতে আমার ব্যাথা যেত না। কারণ প্রতিদিনই তো তারা আমাকে ………।’

‘এসব সহ্য করতে না পেরে প্রথম দিকে আমার মরে যেতে ইচ্ছে করতো। কিন্তু পরে আর সেই ইচ্ছা করেনি। পরে মনে হয়েছে এইটাই হয়ত আমার বেঁচে থাকা, এইটাই হয়ত আমার যুদ্ধ। একদিন আমি এখান থেকে বের হবোই। আমি শুধু গোলাগুলির অপেক্ষায় থাকতাম। এখান থেকে আমাকে কেউ বাঁচাতে আসবেই। কিন্তু কেউ কখনো আমাকে বাঁচাতে আসেনি। আর যারা আমাকে খাবার দিত তারা আমাদের কাছের লোকই ছিলো। তাদেরকে বলতাম, আমাকে এখান থেকে বের করে দাও। তখন তারা বলতো, আমাদের হুকুম নেই।’

‘আমি এভাবে ৮ মাস বন্দি থাকার পর গোলাগুলির শব্দ শুনতে পেলাম। আমি ভাবলাম হয়ত আমাদের দেশ স্বাধীন হচ্ছে। তারপর আমি দরজার কড়া নাড়তে থাকলাম। এভাবে কড়া নাড়তে নাড়তে দুই দিন পর আমার দরজা একজন খুলে দেয়। কিন্তু কে সেই দরজা খুলে দেয় তা আমার মনে নেই। সে আমাকে চা পাতা তোলার গাড়িতে করে নিয়ে আমার গ্রামের পাশে ফেলে রেখে চলে যায়। তখন শরীরে একটা ছেড়া পেটিকোট ছাড়া আমার আর কিছুই ছিলো না। তখন আমি গাছের আড়ালে লুকাই। মানুষের শব্দ শুনতে পেয়ে তাদের কাছে একটি কাপড় চাই। একজন আমাকে একটি লুঙ্গি দেয়। সেই লুঙ্গি আমি গায়ে জড়ানোর পর তাকে আমার সামনে আসতে বলি। তখন সে আমার সামনে আসে। কথা বলার খুব বেশি শক্তি না থাকলেও তখন তাকে দীর্ঘ ৮ মাসের নির্মমতার বর্ণনা দেই।’

প্রসিকিউটর সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, ‘দীর্ঘ ৮ মাসের নৃশংসতার শিকার এই হীরা মণিকে আমরা ট্রাইব্যুনালে সাক্ষী দিতে আনতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তিনি আসেননি। লোকলজ্জার ভয়ে এই ঘটনা তিনি কাউকে জানাতেও নিষেধ করেছিলেন। তার পাশে থাকা অপর একজন বলেছিলেন, ট্রাইব্যুনালে সাক্ষী দিতে গেলে আমরা বাঁচবো না। হয়ত এখনো বেঁচে আছি। সাক্ষী দিলে বাঁচবো না। তুমি (প্রসিকিউটর) অনেক অনুরোধ করায় তোমাকে এ ঘটনা বললাম। হীরা মণির ছেলেও তার মাকে ট্রাইব্যুনালে সাক্ষী হিসেবে আনতে দেয়নি। সে চায়না তার মা আবার মানুষের জেরার মুখোমুখি………. হোক।’

প্রসিকিউটর জানান, এই ৮ মাসের নির্যাতনের আরো নৃশংস ও বর্বর ঘটনা ঘটেছে- যা সংবাদ মাধ্যমে উল্লেখ করার মত নয়। তাই সেসব ঘটনা বলা থেকে আমাকে বিরত থাকতে হলো। প্রসিকিউটর হিসেবে কাজ করতে এসে সেই ৮ মাসের ঘটনাগুলোর কথা যখন ভাবি তখন আমার খুব কষ্ট হয়।

প্রসিকিউটর সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, ‘একাত্তরের নৃশংসতার পর এই ঘটনার কথা লুকিয়ে রেখে তাকে বিয়ে দেয়া হয়। স্বামীর ঘরে তার একটি ছেলে জন্ম নেয়। কিন্তু কিছুদিন পর একাত্তরে হীরা মণির ওপর ঘটে যাওয়া নির্যাতনের কথা শুনতে পেরে তার স্বামী তাকে ত্যাগ করে চলে যায়।’

‘একাত্তরে নির্মমতার শিকার এই হীরা মণি এখন চোখের পানিতেই দিন কাঁটায়। কারো সাথে বেশি কথা বলেন না। আমার দাবি, কায়সারের রায়ের মধ্য দিয়ে যেন মানুষের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি পায়। সামাজিকভাবে ধর্ষণের শিকার হওয়া নারীকে আর যেন তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য না করা হয়। বিশেষ করে তরুণ সমাজ যেন এই বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখে। গ্রামে-গঞ্জে এখনো দেখি, ধর্ষণের শিকার হয়ে মেয়েরা ঘরে মুখ লুকিয়ে বসে থাকে। আর ধর্ষকরা আনন্দে ঘুরে বেরায়। আমরা আমাদের এই সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তন চাই।’

প্রসিকিউটর বলেন, ‘এর আগে ট্রাইব্যুনাল কায়সারের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণার সময় বলেছিলেন, ‘বুলেটের আঘাতের চেয়েও ধর্ষণের আঘাত অনেক যন্ত্রণাদায়ক, ভয়ঙ্কর। পাশাপাশি একাত্তরে নির্যাতনের শিকার এমন ব্যক্তিদের জাতীয় বীর উল্লেখ করে তাদেরকে স্যালুট করা উচিত বলেও মন্তব্য করেছিলেন ট্রাইব্যুনাল। এ কারণেই এ মামলায় ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি দেয়া হয়েছিলো কায়সারকে। পরে এই রায়টি ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিম একাত্তরের বীরঙ্গণাদেরকে উৎসর্গ করেছিলেন।’

প্রসঙ্গত, প্রসিকিউশনে যোগ দেয়ার পর প্রসিকিউটর সাবিনা ইয়াসমিন মুন্নি বাচ্চু রাজাকার, আশরাফুজ্জামান, মইনুদ্দিন, আব্দুল আলিম, মতিউর রহমান নিজামী, সৈয়দ কায়সার, মুজাহিদ, খোকন রাজাকার, ফোরকান মল্লিকসহ নেত্রকোনার ননী-তাহেরের মামলা পরিচালনায় কাজ করেছেন।

বর্তমানে তিনি নেত্রকোনার পূর্বধলা, আটপাড়া এবং মৌলভীবাজারের বড়লেখার তিনটি মামলায় কাজ করছেন।



« (পূর্বের সংবাদ)



মন্তব্য চালু নেই