মেইন ম্যেনু

টাম্পাকো ট্র্যাজেডি: দুই দিনেও খোঁজ নেননি মালিক মকবুল

টঙ্গীর বিসিক শিল্পনগরীর টাম্পাকো কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের দুই দিনেও ঘটনাস্থলে আসেননি মালিক মকবুল হোসেন কিংবা কর্তৃপক্ষের কেউ। অগ্নিকাণ্ডের পরপরই গা ঢাকা দিয়েছেন কারখানার কর্মকর্তারা। তাদের কাউকে না পাওয়ায় ঘটনার সময় কারখানাটিতে কত শ্রমিক কাজ করছিলেন তার সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যাচ্ছে না।

ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের জন্য মালিকপক্ষ থেকে কোনো ধরনের সহযোগিতার কথাও রবিবার পর্যন্ত জানা যায়নি। রবিবার রাত আটটায় এ রিপোর্ট লেখা পর‌্যন্ত ওই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি কারো বিরুদ্ধে।

ফয়েল পেপার উৎপাদনকারী টাম্পাকো কারখানাটির মালিক সিলেট-৬ (বিয়ানীবাজার ও গোলাপগঞ্জ) আসনের দুবারের সংসদ সদস্য ড. সৈয়দ মকবুল হোসেন একসময় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। স্থানীয়ভাবে লিচু মিয়া নামে বেশি পরিচিত তিনি।

কারখানাটিতে ব্যাপক প্রাণহানি ও অগুনতি শ্রমিকের অনিশ্চয়তার মধ্যেও ঘটনাস্থলে মকবুল হোসেন কিংবা মালিকপক্ষের কেউ না আসায় ক্ষুব্ধ প্রশাসন। তার সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগও করতে পারছেন না কেউ। তিনি এখন কোথায় আছেন এ বিষয়ে কোনো তথ্য দিচ্ছেন না তার ঘনিষ্ঠজনরাও।

শনিবার ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিলেন,মালিকপক্ষের এ ধরনের আচরণ দায়িত্বহীনতার পরিচায়ক।

এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, মালিকপক্ষের কোনো ধরনের গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।

কিন্তু রবিবার রাত পর‌্যন্ত দেখা মেলেনি মারিকপক্ষের কারো। গাজীপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক রাহেনুল ইসলাম বলেন, ঘটনার পর কারখানার মালিক বা ম্যানেজারদের কাউকে পাননি তারা।

মকবুল হোসেনের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সিলেটের স্থানীয় আইনজীবী দেলোয়ার হোসেন দিলু জানান, মকবুল এখন কোথায় আছেন, তার সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ করা যাবে- এ বিষয়ে কিছু বলতে পারছেন না তিনি।

স্থানীয়ভাবে লেচু মিয়া নামে বেশি পরিচিত মকবুল হোসেন ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা। এরশাদ আমলে তিনি ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত পান। একপর্যায়ে ধনকুবের বলে পরিচিত হয়ে ওঠেন তিনি।

এরশাদের আমলে ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মকবুল। ১৯৯১ সালের পর যোগ দেন বিএনপিতে। ২০০১ সালের নির্বাচনে তিনি বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদকে হারিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এক-এগারোর পর রাজনীতি থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন মকবুল ।

এই সময়ে মকবুল হোসেন সুযোগসন্ধানী রাজনীতিক হিসেবে পরিচিতি পান। সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান সম্পর্কে কটূক্তি করে তিনি দেশব্যাপী আলোচনায় আসেন। এরপর ২০১১ সালে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার লাংমার্চে ২০ লাখ টাকা দেয়া নিয়ে আবারও আলোচিত হন তিনি। খালেদা জিয়ার পাশের আসনে বসার শর্তে ২০ লাখ টাকা দেন তিনি ওই লংমার্চে।

রাজনীতিতে এমন ‘উদারহস্ত’ মকবুলের কোনো ধরনের সহযোগিতার হাত এখনো পাননি কারখানার দগ্ধ শ্রমিকরা। এমনকি ঘটনার দুই দিনে কোনো সহানুভূতির বার্তাও পাঠাননি কোনো মাধ্যমে।

রবিবার বিকালে সরেজমিনে দেখা যায়,কারখানার আশপাশে আহাজারি করছেন স্বজন হারানো অনেক মানুষ। কারো স্বজনের খোঁজ নেই। কারো স্বজনের লাশ মিলেছে। কারখানার আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে তখনো কিছু কিছু জায়গায় ধোঁয়া উঠছে। আগুন নেভাতে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা পানি দিচ্ছেন। কারখানার সামনে ধসে যাওয়া দেয়ালের নিচ থেকে গলিত চারটি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে কারখানার ভেতরে এখনো কেউ প্রবেশ করেতে পারেনি।

কারখানার বাইরে গাজীপুর জেলা প্রশাসন টাম্পাকো অগ্নিকাণ্ডে নয়জন শ্রমিক নিখোঁজ বলে তালিকা প্রকাশ করে। কিন্তু স্বজনদের খোঁজে আসা লোকজনের যে ভিড় তাতে আরও অনেক নিখোঁজ বলে আশঙ্কা করছেন উদ্ধারকারীরা। কিন্তু মালিকপক্ষের কারো সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি বলে অনুমান করা যাচ্ছে না কতজন নিখোঁজ থাকতে পারে। এ ছাড়া কারখানার দায়িত্বশীল কর্মকর্তারাও পলাতক বলে কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যাও অজানা।

গতকাল শনিবার ভোর ছয়টার কিছু আগে টাম্পাকো কারখানায় বিকট শব্দ করে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এ সময় রাতের শিফটে ৮০ জনের মতো শ্রমিক কাজ করছিলেন বলে জানান ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন একজন আহত শ্রমিক। তিনি সকালের শিফটে মাত্র কারখানায় ঢুকেছিলেন। তার মতো আরো বেশ কিছু শ্রমিক এ সময় কাজে যোগ দেন। এরপরই ঘটে দুর্ঘটনা। কাজেই ওই সময় কতজন শ্রমিক কারখানার ভেতরে ছিলেন তা কেউ বলতে পারছেন না।

শনিবার ভোরে বিকট শব্দে আগুন লাগার পর স্থানীয় লোকজন প্রথমে উদ্ধারকাজে এগিয়ে আসে। পরে ঢাকা, গাজীপুরের ২৫টি দমকল ইউনিট প্রায় ২৯ ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে রবিবার দুপুরের দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। রবিবার সন্ধ্যায় শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ২৯টি লাশ উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে ২৫টি উদ্ধার হয় শনিবার, আর চারটি রবিবার। তবে কারখানাটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় উদ্ধারকর্মীরা ভেতরে প্রবেশ করেননি। ফলে ধ্বংসস্তূপের ভেতরে আরো লাশ থাকতে পারে আশঙ্কা করা হচ্ছে।






মন্তব্য চালু নেই