মেইন ম্যেনু

ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে নিয়ে যা বললেন সাকিব আল হাসান

খেলার মাঠে যে মুখ, বিলবোর্ডেও সেই মুখ। পুরস্কারের মঞ্চে যে হাসি, টেলিভিশনের পর্দায়ও সেই হাসি। সাকিব আল হাসান এই মুহূর্তে সম্ভবত বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় মুখ। তিন সংস্করণের ক্রিকেটের বিশ্বসেরা তো বটেই, তাঁর আকাশে খুলে গেছে আরও যে কত জানালা! ক্রিকেট বিজ্ঞাপনচিত্রের মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। পা পড়ছে ব্যবসাজগতেও। সোমবার মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে প্রতিবেদককে দেয়া দীর্ঘ একান্ত সাক্ষাৎকারে সাকিব কথা বলেছেন সবকিছু নিয়েই—

* ক্রিকেটারই আপনার মূল পরিচয়। কিন্তু এখন তো বিজ্ঞাপনজগৎ, ব্যবসা—অনেক দিকেই ছড়িয়ে পড়েছে আপনার জীবন। এত কিছুর সমন্বয় করেন কীভাবে?

সাকিব আল হাসান: সমন্বয় তো করতেই হবে। আমি মূলত পেশাদার ক্রিকেটার। ক্রিকেটই আমার মূল চিন্তা। তবে সব ঠিক থাকলেও আমি হয়তো আর সাত-আট বছরই ক্রিকেট খেলতে পারব। এরপরও আমার একটা জীবন থাকবে। ক্রিকেটার হিসেবে আমার জীবনটা প্রচণ্ড রকমের ব্যস্ততায় কাটে। সে জীবনে যখন মাঝেমধ্যে বিরতি পড়ে, আমার মাথা কাজ করে না। আমি চাই না, খেলা ছেড়ে দেয়ার পর হুট করে আমার জীবন এ রকম বদলে যাক। এ কারণেই এগুলো শুরু করা। তবে সত্যি কথা হলো, এখনো আমি এসব নিয়ে সেভাবে মাথা ঘামাতে শুরু করিনি।

* কোন জীবনটা বেশি উপভোগ করেন? ব্যবসায়ী, বিজ্ঞাপনের মডেল নাকি ক্রিকেটারের জীবন?
সাকিব: এক শ ভাগ ক্রিকেটারের জীবন। বাকি সব এর ধারেকাছেও নেই। তবে পরিবারকে আমার আরও বেশি সময় দেওয়া উচিত। সেটা করতে পারলে আরও ভালো লাগত। কিন্তু আবারও বলছি—আমার কাছে ক্রিকেট মাঠের আশপাশে কিছু নেই।

* এ মুহূর্তে আপনি কয়টি পণ্যের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর?
সাকিব: (হাসি) জানি না…ঠিক বলতে পারব না আসলে। হিসাব করে বলতে হবে।

* বিজ্ঞাপন নির্মাতাদের কাছে অনেক সময় পেশাদার মডেলদের চেয়েও আপনার চাহিদা বেশি দেখা যায়। ক্রিকেটার হয়েও আরেকটি জগতে এমন দাপুটে বিচরণ করতে কেমন লাগে?
সাকিব: অবশ্যই ভালো লাগে। এটা আমি উপভোগ করি। আমার পেশা ক্রিকেট খেলা হলেও খেলতে খেলতে একধরনের ক্লান্তি আসে। তখন অন্য কাজগুলো করে আমি সতেজ থাকি। কিছু সময় মনটা অন্য দিকে থাকলে ভালো লাগে। পরে খেলায় এসে আরেকটু বেশি দিতে পারি। বড় একটা সিরিজ বা টুর্নামেন্টের পর আমরা একটু বিরতি পাই। তখনই এগুলো করি। আর বিজ্ঞাপনের শুটিংয়ে কিন্তু খুব বেশি কষ্ট নেই। হয়তো দুবার, তিনবার, সর্বোচ্চ পাঁচবার একটা টেক দেবেন। নির্মাতাদের মূল সময়টা যায় সবকিছু সেট করতে। আমার কাজটা সব মিলিয়ে এক ঘণ্টাও হয় না। বাকি সময় আড্ডা দিই, গল্প করি। শুটিং স্পটে বন্ধুরা চলে আসে। কাজ না থাকলে অনেক সময় আমার স্ত্রীও সঙ্গে যায়। সব মিলিয়ে পিকনিকের মতো একটা ব্যাপার।

* বিজ্ঞাপন করতে গিয়ে শোবিজ তারকাদের কাছ থেকে দেখছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অন্য জগতের খ্যাতিমানদের সঙ্গেও দেখা হয়। কখনো কি কাউকে দেখে মনে হয়েছে তিনি আপনার চেয়েও বড় তারকা?
সাকিব: আমি কিন্তু নিজেকে তারকা ভাবি না। বরং বড় কোনো অনুষ্ঠানে গেলে আমিই গর্ববোধ করি। এই সবার সঙ্গে আমিও আছি! কখনোই চিন্তা করি না, আমি অমুকের ওপরে বা নিচে। আমার তো মনে হয় বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রেই অনেক বড় বড় মানুষ আছেন, যাঁরা অনেক ভালো কাজ করছেন। কিন্তু তাঁদের আমরা সেভাবে স্বীকৃতি দিই না। আমাদের দেশের শ্রদ্ধেয় ড. মুহাম্মদ ইউনূস নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। পৃথিবীতে কয়জন মানুষ নোবেল পুরস্কার পান? এটা একটা মাত্র উদাহরণ।

ওয়াসফিয়া নাজরীন সিক্সথ সামিট শেষ করেছেন। সেভেনথ সামিটও বোধ হয় করবেন। আমরা হয়তো দেশে ওনার কথা সেভাবে বলি না, কিন্তু বিদেশে উনি অনেক বড় তারকা। ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি, রাজনীতি, সামাজিক কাজ—সব ক্ষেত্রেই আমাদের এ রকম বড় বড় ব্যক্তিত্ব আছেন। ব্যবসা-বাণিজ্যে বাংলাদেশ এখন অনেক ভালো করছে। আইটি সেক্টরে তো চিন্তার বাইরে উন্নতি করেছি আমরা। এমনকি ইউটিউবের উদ্যোক্তাদের মধ্যেও বাংলাদেশের একজন আছেন। যেহেতু আমরা ক্রিকেট খেলি এবং ক্রিকেটটা বাংলাদেশের মানুষের কাছে আবেগের একটা জায়গা হয়ে গেছে, সে জন্যই হয়তো আমাদের নিয়ে হইচইটা বেশি হয়।

* ক্রিকেটাররা তাহলে ভাগ্যবান…
সাকিব: হতে পারে… আমি তো ভাগ্যবান অবশ্যই। অন্য কোনো কাজ করলে হয়তো মানুষের চোখে এতটা পড়তাম না। তা ছাড়া আমার সতীর্থরাও জানে, আমি অত কঠোর পরিশ্রম করি না। ভাগ্যবান বলেই যখন যা দরকার পেয়ে গেছি। মানুষের প্রথম সুযোগগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমি সব জায়গাতেই সেই সুযোগগুলো কাজে লাগাতে পেরেছি। আসলেই আমি অনেক ভাগ্যবান।

* শোবিজ জগতের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ আপনার। তবে ওই জগতের তারকাদের জীবন এক রকম, খেলোয়াড়দের জীবনযাপন আরেক রকম। দুটির মধ্যে ভারসাম্য রাখেন কীভাবে?
সাকিব: পেশা আপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তার মানে এই নয় যে, এটাই জীবনের সবকিছু হয়ে যাবে। যে সময়টাতে কাজ থাকে না, তখন যাদের সঙ্গে পরিচয় আছে তাদের সঙ্গে ঘোরাফেরা করি, বসি, আড্ডা দিই। বাইরের খেলোয়াড়দের দেখে শিখেছি…এই জিনিসটা তাদের মধ্যে অনেক বেশি এবং এ কারণেই তারা অনেক নির্ভার থাকতে পারে। সামাজিক জীবন তারা অনেক বেশি উপভোগ করে। পরিবারকে সময় দেয়, বন্ধুদের সময় দেয়। কোনো একটা ম্যাচে ভালো না খেললে হয়তো সাময়িক মন খারাপ হয়, কিন্তু তার পরের দিনটা পুরো নতুন একটা দিন।

* জাতীয় দলে নতুন আসা ক্রিকেটারদেরও সাংঘাতিকভাবে টানছে বিজ্ঞাপনের জগৎ। সঙ্গে নানা প্রলোভনও। তাঁদের জন্য কোনো পরামর্শ?
সাকিব: আসলে আমি যতই বলি আর ওরা যতই শুনুক, কিছু কিছু ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা তেমন কাজে আসে না। ওরা যা-ই করবে বুঝেশুনে করবে… এটাই গুরুত্বপূর্ণ। যাদের কথায় ওরা আশ্বস্ত হয়, আস্থা রাখতে পারে, তাদের সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নিলে ভালো হয়। তারপরও দু-একটা ভুল হবেই। যতই চেষ্টা করুক, এটা এড়ানো সম্ভব নয়। তবে সেই ভুল থেকে যেন শিক্ষাটা নিতে পারে। অনেক প্রলোভন থাকবে। কিন্তু সবকিছু নির্ভর করবে তারা নিজেদের কতটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে সেটার ওপর। কারণ দিন শেষে ক্যারিয়ারটা ওদেরই। অনেকেই আছে এক-দুই বছর খুব ভালো খেলে হারিয়ে যায়। আমি চাই, এখন আমরা যে দলটা আছি, তারা যেন একসঙ্গে অনেক দিন খেলতে পারি। অন্তত আগামী বিশ্বকাপ পর্যন্ত সেটা পারি, আমরা এমন একটি দল হব, যাদের নিয়ে সবাই সবার আগে চিন্তা করবে। এখন যে রকম কথা উঠলেই বলে অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড ওয়ানডের বড় দল, তখন বাংলাদেশের কথাও বলতে হবে। এর মধ্যেই অবশ্য সেটা শুরু হয়ে গেছে। এখন তা ধরে রাখতে হবে।

* সাকিব’স ডাইন কেমন চলছে? রেস্টুরেন্টের ফর্মও কি আপনার ফর্মের মতোই দুর্দান্ত?
সাকিব: প্রথম কথা হচ্ছে সাকিব’স ডাইন নয়, নো ‘ডাইন’। অনলি সাকিবস। প্রথমে সাকিব’স ডাইনই ছিল। পরে আমরা বুঝতে পারলাম ‘ডাইনের’ আলাদা একটা ব্যাখ্যা আছে। সে জন্য নামটা এখন শুধু ‘সাকিবস’। আমি চাই মানুষ আমার রেস্টুরেন্টে যাক, দেখুক, খাওয়া-দাওয়া করুক। তারপর সঠিক জায়গায় তাদের মতামত দিক। কিন্তু সবাই এখন ফেসবুকে ভুল পেজে চেক ইন দিচ্ছে। আমাদের আসল পেজে সবাই মন্তব্য করছে না বলে আমরা বুঝতে পারছি না এখানে এসে মানুষের কেমন লাগছে। আসলটাতে মন্তব্য করা শুরু করলে বুঝতে পারব। সরাসরি তো কেউ আমাকে বলবে না খারাপ, সবাই বলে ভালো। তারপরও দু-একটা ছোটখাটো নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া পেয়েছি। সেগুলো ঠিক করার চেষ্টা করছি।

* রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় সবচেয়ে গুরুত্ব দিচ্ছেন কিসের ওপর?
সাকিব: স্বাস্থ্যকর খাবার পরিবেশনের ওপর। আমি যখনই রেস্টুরেন্টে যাই, প্রথম কাজ কিচেনে ঢোকা। সবকিছু স্বাস্থ্যকর অবস্থায় আছে কি না দেখা। এখানে দিনের বাজার দিনে করা হয়। বিশেষ করে মাংস, মাছ, সবজি। একসঙ্গে বেশি জিনিস কিনে ফ্রিজে রেখে দিলে হয়তো খরচ কম পড়ত। কিন্তু আমরা সেটা করি না। আমি বলে দিয়েছি, মানুষ যেন তাজা জিনিসটা খেতে পারে। তাতে কোনো আইটেম শেষ হয়ে গেলেও মানুষকে বলে দেওয়া হয়, আজ ওটা শেষ হয়ে গেছে। কোনো জিনিস ১০ দিন ফ্রিজে রেখে মানুষকে খাওয়াতে চাই না।

* রেস্টুরেন্ট শুরুর সময় বলেছিলেন ভবিষ্যতে অনেক নতুনত্ব আসবে। সে রকম কিছু ভেবেছেন?
সাকিব: স্পোর্টস লাউঞ্জটা যেভাবে চেয়েছিলাম, সেভাবে এখনো শুরু করতে পারিনি। তবে দু-এক দিনের মধ্যে প্রজেক্টর লেগে যাওয়ার কথা। তখন বড় পর্দায় খেলা দেখা যাবে। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ বা বিদেশি ক্লাব ফুটবল আমাদের এখানে অনেক জনপ্রিয়। জানি না, ৪০-৫০ জনের একটা গ্রুপ মিলে এসব খেলা বড় পর্দায় উপভোগের মতো জায়গা বাংলাদেশে আছে কি না। প্রজেক্টর লেগে গেলে আগামী সপ্তাহ থেকে আমাদের ওখানে জায়গা বুক করে যেকোনো খেলা এভাবে দল বেঁধে দেখা যাবে। এতে মানুষের বিনোদনের ভালো একটা জায়গা হবে বলে মনে করি। সেকেন্ড ফ্লোরে স্পোর্টস লাউঞ্জ করার মূল লক্ষ্যই ছিল এটা। তবে আমি যেহেতু ক্রিকেটার, বাংলাদেশের ক্রিকেট খেলা হলে কিন্তু রেস্টুরেন্টে অন্য কোনো খেলা দেখার সুযোগ থাকবে না (হাসি)।

* আগে তো আরও একটা ব্যবসা শুরু করেছিলেন…কসমেটিকসের। ওটার কী অবস্থা?
সাকিব: আলহামদুলিল্লাহ, খুবই ভালো। ব্যবসাটা দাঁড়িয়ে গেছে বলতে পারেন। চাইলে এখন আরও বাড়ানো যায়। এখন তো এমন অবস্থা যে, ক্রেতাদের চাহিদাই পূরণ করতে পারছি না। এত চাহিদা! ওখানে গিয়ে কেউ বিশেষ কিছু অর্ডার করলে আমরা দুই সপ্তাহের মধ্যে এনে দিই।

* বাবা হতে যাচ্ছেন। জীবনের নতুন আরেকটা অধ্যায়। নিশ্চয়ই খুব রোমাঞ্চিত?
সাকিব: খুবই রোমাঞ্চিত। আল্লাহর কাছে একটা জিনিসই চাই, সব যেন ঠিকঠাকভাবে হয়। তাহলেই আর কোনো টেনশন নেই। আমেরিকাতেই সন্তান ডেলিভারি হবে। আপনারা সবাই দোয়া করবেন।-প্রথমআলো






মন্তব্য চালু নেই