মেইন ম্যেনু

ঢাকার সব কোরবানি হাট আ’লীগের দখলে

রাজধানী ঢাকার দুই সিটি করপারেশনের ১৮টি পশুর হাট ইজারা পেয়েছেন ক্ষমতাশীন দল আওয়ামী লীগ বা তার অঙ্গসংগঠনের নেতারা। এসব হাট ইজারায় ভিন্ন মতাদর্শী বা সাধারণ ব্যবসায়ীরা সিডিউল কিনেও তা জমা দিতে পারেননি বলে অভিযোগ। কোনো কোনো হাটে কাঙ্ক্ষিত দরও পায়নি সিটি করপোরেশন। এমনকি অনেক হাটের দর গত বছরের তুলনায় কমে গেছে। বরাবরের মতো এবারও সিন্ডিকেটের বাইরে ইজারায় অংশ নেয়া ব্যবসায়ীদের বাদ দিতে নানা কৌশল নেয়ার অভিযোগ উঠেছে দুই সিটি করপোরেশনের বিরুদ্ধে।

খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, রাজধানীর ১৭টি অস্থায়ী হাট ও একটি স্থায়ী হাটের মধ্যে সবকটিই ইজারা পেয়েছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও এর অঙ্গ-সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এর মধ্যে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১০টি হাট রয়েছে। আর উত্তর সিটি করপোরেশন প্রথম দফায় ছয়টি হাট ইজারা দেয়া হয়। পরবর্তীতে আরো তিনটি হাটের অনুমতির জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের কাছে আবেদন করে সংস্থাটি। এগুলো হচ্ছে- বাণিজ্যমেলার হাট, মিরপুর সিরামিক সড়কসংলগ্ন সরকারি বঙ্গবন্ধু কলেজের পিছনের খালি জায়গা, রায়ের বাজার হাট। এর মধ্যে শুধু রায়ের বাজার হাটটি ৫২ লাখ টাকার বিনিময়ে ইজারা দেয়া হয়েছে।

এছাড়া বাণিজ্যমেলার হাটটি ইজারা দিয়েও প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা জনিত করণে তা বাতিল করা হয়েছে। এই হাটটি ৫০ লাখ টাকা সর্বোচ্চ দর দিয়ে ইজারা পেয়েছিলেন যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক এসএম জাহিদ। আর কাঙ্ক্ষিত দর না পাওয়ায় মিরপুর সিরামিক সড়কসংলগ্ন সরকারি বঙ্গবন্ধু কলেজের পেছনের খালি জায়গার হাটটি ইজারা দেয়া হয়নি।

সিটি করপোরেশনের একাধিক কর্মকর্তা জানান, আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে প্রতিটি হাটের ইজারা বাগিয়ে নিয়েছেন। এ কারণে কোটি টাকা রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে দুই সিটি করপোরেশন।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন:

এক কোটি ৫১ লাখ ৫০ হাজার টাকায় উত্তর সিটি করপোরেশনের খিলক্ষেত বনরুপা আবাসিক প্রকল্পের খালি জায়গার হাটটি পেয়েছেন স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসলাম উদ্দিন।

এক কোটি ৯ লাখ ৭৮৬ টাকায় উত্তরা ১৫ ও ১৬ নম্বর সেক্টরের মধ্যবর্তী সেতুসংলগ্ন খালি জায়াগার হাটটি পেয়েছেন কেন্দ্রীয় যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এসএম জাহিদ।

৪৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৮৬ টাকায় মিরপুর সেকশন ৬, ওয়ার্ড-৬ ইস্টার্ন হাউজিংয়ে খালি জায়গার হাটটি পেয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্যের (ইলিয়াস মোল্লা) সমর্থক খোকন মৃধা। যদিও জানা গেছে, এ হাটটি মৃধাকে দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করছেন সাংসদ নিজেই।

২ কোটি ৩৪ লাখ ৫০ হাজার টাকায় কুড়িল ফ্লাইওভার সংলগ্ন পূর্বাচলমুখি ৩০০ ফুট প্রশস্ত সড়কের বসুন্ধরা ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারের পর থেকে সড়কের দুই পাশের কাঁচা অংশের খালি জমিতে নির্ধারিত হাট পেয়েছেন স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বিল্লাল হোসেন সেলিম।

আর একমাত্র গাবতলীর স্থায়ী পশুর হাটটি বরাবরের মতো স্থানীয় সংসদ সদস্যের (আসলামুল হক) মদদপুষ্ট সিন্ডিকেট মো. লুৎফর রহমান পেয়েছেন।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন:

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১০টি হাটের মধ্যে প্রথম দফা জিগাতলা হাজারীবাগ মাঠ, রহমতগঞ্জ খেলার মাঠ, মেরাদিয়া বাজার, উত্তর শাহজাহানপুর খিলগাঁও রেলগেট বাজার সংলগ্ন মৈত্রী সংঘের মাঠ, ধূপখোলার ইস্ট অ্যান্ড ক্লাব মাঠ ও কামরাঙ্গীরচর ইসলাম চেয়ারম্যানের বাড়ির মোড় থেকে দক্ষিণ দিকে বুড়িগঙ্গা নদীর বাঁধ সংলগ্ন জায়গার হাট ইজারায় কাঙ্ক্ষিত দর পাওয়া যায়নি। দ্বিতীয় দফায়ও পর্যাপ্ত দর না উঠলেও হাটগুলো ইজারা দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে গত বছরের চেয়ে ঝিগাতলা হাজারীবাগ মাঠ ১১ লাখ টাক ও মেরাদিয়া বাজার হাট ১৫ লাখ ৮০ হাজার টাকা কম দামে ইজারা দেয়া হয়েছে।

৪৬ লাখ টাকা ইজারা দিয়ে জিগাতলা হাজারীবাগ মাঠ পেয়েছেন ২২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর এবং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তরিকুল ইসলাম সজীবের ছোট ভাই জাহিদুল ইসলাম রাজিব। গত বছর কাঙ্ক্ষিত দর না পাওয়ায় সিটি করপোরেশন হাটটিতে খাস আদায় করেছে ৫৭ লাখ টাকা। এবছর তিনি ১১ লাখ টাকা কম দিয়ে হাটটি ইজারা পেয়েছেন। হাটটির জন্য প্রথম দফায় ১১টি শিডিউল বিক্রি হলেও জমা পড়েছে মাত্র তিনটি।

খিলগাঁও মেরাদিয়া বাজারের পশুর হাটের ইজারা পেয়েছেন স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাকসুদ হোসেন মহসীনের ভাতিজা ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আমিনুল ইসলাম মিঠু। তিনি হাটটির ইজারা দিয়েছেন ৪০ লাখ ২০ হাজার টাকা। গত বছর ৫৬ লাখ টাকা দর দিয়ে হাটটির ইজারা পেয়েছিলেন স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা আহম্মদ উল্লা পপ্পী। এ বছর মিঠু ১৫ লাখ ৮০ হাজার টাকা কম দিয়ে হাটটি ইজারা নিয়েছেন। এ হাটটির জন্য সাতটি দরপত্র বিক্রি হলেও জমা পড়ে মাত্র তিনটি।

৪ লাখ টাকা দর দিয়ে কামরাঙ্গীরচর ইসলাম চেয়ারম্যানের বাড়ির মোড় সংলগ্ন হাটটির ইজারা পেয়েছেন হাজি মো. আবুল হোসেন সরকার। তিনি কামরাঙ্গীরচর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি। হাটটির সঙ্গে স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর সাঈদুল ইসলাম সরদারও সম্পৃক্ত রয়েছেন বলে দাবি করেছেন।

৫৮ লাখ ৫ হাজার টাকা দর দিয়ে সাদেক হোসেন খোকা খেলার মাঠ ইজারা পেয়েছেন যুবলীগ নেতা ফরহাদ ভূঁইয়া বাবু। ১১ লাখ ১০ হাজার টাকা দর দিয়ে পোস্তগোলা শ্মশানঘাট সংলগ্ন খালি জায়গার হাটটি পেয়েছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা হাজি মো. রুবেল। ১ কোটি ৯৫ লাখ টাকা ইজারা দিয়ে লালবাগ মরহুম হাজী দেলোয়ার হোসেন খেলার মাঠ ইজারা পেয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতা দেলোয়ার হোসেন।

৮ লাখ ৩০ হাজার টাকা দর দিয়ে রহমতগঞ্জ খেলার মাঠ হাটের ইজারা পেয়েছেন রহমতগঞ্জ মুসলিম সোসাইটির উপদেষ্টা ও আওয়ামী লীগ নেতা হাজি মো. আলম মিয়া। ধূপখোলা ইস্ট অ্যান্ড ক্লাব মাঠটি পেয়েছেন যুবলীগ নেতা মশিউর রহমান খান। তিনি হাটটির ইজারা দিয়েছেন ৪৪ লাখ ৯৯৯ টাকা।

ব্রাদার্স ক্লাবের পক্ষে ২৬ লাখ টাকা ইজারা দিয়ে ব্রাদার্স ইউনিয়ন সংলগ্ন বালুর মাঠটি পেয়েছেন সহিদ উদ্দিন আহমেদ সেলিম। সেলিমের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় পাওয়া না গেলেও হাট স্থানীয় কাউন্সিলরের সহায়তায় পরিচালনার প্রস্তুতি নিচ্ছে আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা।

৫ লাখ ৯০ হাজার টাকা ইজারা দিয়ে খিলগাঁও রেলগেট বাজার সংলগ্ন মৈত্রী সংঘের মাঠটি পেয়েছেন স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. জাকির হোসেন।

এসব বিষয়ে জানাতে চাইলে ডিএসসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা খালিদ আহম্মেদ বলেন, ‘ইজারাদারদের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচ্য বিষয় নয়। আইনের মধ্য থেকেই আমাদেরকে হাট ইজারা দিতে হয়। সর্বোচ্চ দরদাতারাই ইজারা পেয়েছেন।’

তিনি বলেন, ‘আমরা দশটি হাটের ইজারা চূড়ান্ত করেছি। গত তিন বছরের গড় মূল্যের ওপর ভিত্তি করে যাচাই-বাচাইয়ের মাধ্যমেই হাট ইজারা দেয়া হয়েছে। এ বছর কিছু হাটের দর বেড়েছে। আবার কিছু হাটের দর কমেছে। একে কম দাম বলা যাবে না।’বাংলামেইল






মন্তব্য চালু নেই