মেইন ম্যেনু

তনুর স্মৃতি মনে পড়লে খাঁ খাঁ করে বুক

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী সোহাগী জাহান তনু হত্যার ছয় মাস হতে চলল। এখনো উদ্ঘাটিত হয়নি এর রহস্য। এই দুঃখ সঙ্গী করে এবারের কোরবানির ঈদ করল তনুর পরিবার। একই সঙ্গে তাদের সঙ্গী ছিল তনুর অনুপস্থিতির বেদনা। কান্না আর তনুর স্মৃতি হাতড়ে কেটেছে ঈদুল আজহার দিনটি। তনুর বাবা বলেন, তনুর স্মৃতি মনে পড়লে বুকটা খাঁ খাঁ করে ওঠে।

শনিবার সকালে মোবাইল ফোনে কথা বলার সময় ওপারে বারবার ভারী হয়ে আসে তনুর মা-বাবার কণ্ঠ। তারা তখন গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার মুরাদনগরে। সেখানেই কোরবানি দিয়েছেন এবার।

তনুর মা আনোয়ারা বেগম বলেন, ‘তনুর জন্মের পর থেকেই আমরা কুমিল্লা সেনানিবাসের বাসায় থাকা শুরু করি। সেখানেই মেয়েটি বড় হয়েছে। রমজানের ঈদের ছুটি প্রায়ই সেনানিবাসের বাসায় কাটত। আর তনুর দাদার নামে কোরবানি দেওয়া হয় বলে কোরবানির ঈদটা পরিবারের সবাইকে নিয়ে বাড়িতে (মুরাদনগরে) করি। এবারও শ্বশুরবাড়িতে কোরবানি দিয়েছি। কিন্তু তনু নেই।’ বলতে বলতে কেঁদে ওঠেন আনোয়ারা বেগম।

তনুকে হারিয়ে বিষাদগ্রস্ত পরিবারটির ওপর কদিন আগে নেমে আসে আরেক বিপদ। গত ২৪ আগস্ট স্ট্রোক হয় তনুর বাবার।

আনোয়ারা বেগম বলেন, ‘তনুর বাবা এখনো অসুস্থ। তার স্মরণশক্তি কমে গেছে। আর আমি তো শোকের সাগরে ভাসছি। আমার বুকের মানিককে হত্যা করে আমার সংসারটা ধ্বংস করে দিয়েছে ঘাতকরা।’

দুর্বল কণ্ঠে তনুর বাবা ইয়ার হোসেন বলেন, ‘প্রতিবছর কোরবানির ঈদের দিন ঘরের সব রান্নাবান্না করত তনু। এবার তনু নেই। তার কবরের পাশেই গ্রামের বাড়িতে ঈদের দিন কাটালাম। আর বড় ছেলে নাজমুল ঢাকা থেকে সরাসরি গ্রামের বাড়িতে চলে এসেছে দাদার নামে কোরবানি দিতে। আমার মা মারা যাওয়ার পর তনুই ছিল আমার মা। তনুর স্মৃতিগুলো মনে পড়লে আমার বুকটা খাঁ খাঁ করে।’

ইয়ার হোসেন বলেন, ‘মেয়েকে হারিয়ে আমি পাগলপ্রায়। অসুস্থতায় পড়েছি। সামনে কী হবে আল্লাহ জানেন। কদিন পর (২০ সেপ্টেম্বর) ছয় মাস পূর্ণ হবে তনু হত্যার। সেদিন আমার গ্রামের বাড়িতে একটি মিলাদ দেব ছোট বাচ্চাদের নিয়ে।’

এই ছয় মাসেও তনু হত্যার বিচার শুরু না হওয়ায় হতাশ বাবা ইয়ার হোসেন। এমনকি মামলার তদন্ত নিয়েও আছেন অন্ধকারে। তদন্তকারী সংস্থা সিআইডি থেকেও কোনো যোগাযোগ করা হয় না।

ইয়ার হোসেন বলেন, ‘তনুকে হত্যার ৫ মাস ২৭ দিন পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত হত্যাকা-ের রহস্য উদঘাটন বা ঘাতকদের শনাক্ত করতে পারেনি সিআইডি। তনুর মামলাটি যিনি তদন্ত করছিলেন তাকে বাদ দিয়ে জালাল নামে নতুন এক তদন্ত কর্মকর্তা মামলার দায়িত্ব নিয়েছেন। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর আমার সঙ্গে একবার দেখা হয়েছে। এ ছাড়া মামলার বর্তমান অবস্থা কী তার কিছু জানতে পারিনি তার কাছ থেকে।’

ক্ষোভের সঙ্গে ইয়ার হোসেন বলেন, ‘দেশের কত কত হত্যাকা-ের বিচার হতে দেখেছি, কিন্তু আমার তনু হত্যার বিচার হবে না কেন? এত দিন হয়ে গেল সিআইডি শুধু একের পর এক আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছে।’

চলতি বছরের ২০ মার্চ রাতে কুমিল্লা সেনানিবাসের একটি ঝোপ থেকে তনুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরদিন কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগে ময়নাতদন্ত শেষে মুরাদনগর উপজেলার মির্জাপুর গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। পরে আদালতের নির্দেশে কবর থেকে লাশ তুলে ৩০ মার্চ দ্বিতীয় দফা ময়নাতদন্ত করা হয়। দুই দফায় তদন্তকারী কর্মকর্তা বা সংস্থা পরিবর্তন শেষে ৩১ মার্চ মামলাটি সিআইডিতে হস্তান্তর করা হয়।

গত ৪ এপ্রিল প্রথম ও ১২ জুন দ্বিতীয় ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে তনুর মৃত্যুর কারণ নির্ণয় করতে পারেনি কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসকরা। প্রথম প্রতিবেদনে ধর্ষণের আলামত পাওয়া না গেলেও দ্বিতীয় প্রতিবেদনে ‘সেক্সুয়াল ইন্টারকোর্স’ উল্লেখ করায় তনুর পরিবারসহ দেশজুড়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়।

তনু হত্যার বিচারের দাবিতে দেশব্যাপী ব্যাপক প্রতিবাদ-বিক্ষোভ হয়। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে দেয়া হয় বিচারের আশ্বাস। কিন্তু তদন্ত সংস্থা সিআইডি এখনো হত্যারহস্যের জট খুলতে পারেনি। তবে সিআইডির শেষ ভরসা তনুর ডিএনএ প্রতিবেদন।

সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে তনুর ডিএনএ প্রতিবেদনে তিনজন পুরুষের শুক্রাণু পাওয়া গেছে। তবে তা শনাক্ত করতে এখনো সন্দেহভাজনদের ডিএনএ সংগ্রহ করতে আদালতের অনুমতি নেওয়া হয়নি।

তনু হত্যার রহস্য উদঘাটন ক্রমেই অনিশ্চয়তার দিকে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা তনুর পরিবার ও সচেতন মহলের।






মন্তব্য চালু নেই