মেইন ম্যেনু

তনু হত্যার বিচার দাবিতে ক্ষোভে ফুঁসছে ফেসবুক

কুমিল্লায় সেনানিবাস এলাকায় নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনুকে (১৯) ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় বিচারের দাবিতে ‘সরগরম’ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক। তনুকে বর্বর নির্যাতনের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছে বিভিন্ন পেশার মানুষ। ফেসবুকে স্ট্যাটাসে কিংবা ইভেন্ট খুলে এর প্রতিবাদ জানিয়ে বিচার দাবি করছেন তারা।

গত রোববার ময়নামতি সেনানিবাসের অভ্যন্তরে অলিপুর এলাকায় পানির ট্যাংক সংলগ্ন একটি কালভার্টের পাশের ঝোপ থেকে তনুর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তনু হত্যার প্রতিবাদে সবর হয়ে ওঠে ফেসবুক।

এর মধ্যে ধর্ষণ ও হত্যার প্রতিবাদে রাজধানীর শাহবাগে সমাবেশের ডাক দিয়ে ‘আমরা বাংলাদেশের জনগণ; তনু হত্যার বিচার চাই’ নামে একটি ইভেন্ট খোলা হয়েছে। এখানে লেখা হয়েছে, ‘আমরাই ১৬ কোটি, জনতাই শক্তি। সেটাই আজ প্রমাণ করা দরকার। এই ইভেন্ট প্রমাণ করুক নিজেদের অধিকারের প্রশ্নে আমরা কতটা আপোষহীণ, কতটা ঐক্যবদ্ধ।’ বুধবার বিকেলে ডাক দেওয়া হয় এই সমাবেশের। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ২৫ হাজার ফেসবুক ব্যবহারকারী সমর্থন জানিয়েছেন।

‘তনুর হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই এবং নিরাপদ হোক আমার বোনের পথচলা’ শীর্ষক একটি ফেসবুক ইভেন্ট খোলা হয়েছে। এই ইভেন্টে লেখা হয়েছে, ‘আবারো রক্তাক্ত পতাকা, লাঞ্ছিত বাংলাদেশ। বলে দে মা, কোথায় এই বর্বরতার শেষ! কোথায় এই হিস্রংতার শেষ? মাগো, তোমার তারকাঁটার বেষ্টনিও আজ তোমার মেয়ের জন্য নিরাপদ নয়। মাগো, ওরা দরিদ্র তাই শিক্ষিকার চরিত্রেও কালিমা লেপন করা হয়। ওরা বাঁচতে চায়, ওরা লড়তে চায়, ওরা গড়তে চায়, সেটা কি তাদের অপরাধ?’

‘আমার বোনটি রাস্তায় বেরুলে হায়েনারা কেন তার দিকে বাড়ায় কালো হাত? এটা নাকি ক্যান্টনমেন্ট সংরক্ষিত এলাকা? এনএসআই, ডিজিএফআই, মিলিটারি পুলিশের নিরাপত্তা চাদরে ঢাকা। তাহলে তনু আজ ধর্ষিত কেন? লাঞ্ছিত কেন? কেন তার চুলের ছেঁড়া অংশ রাস্তায়? কেন তার লাশের অর্ধেক শরীরে কাপড় নাই? ছি! ছি!! ছি!!! এ লজ্জা আমার, এ লজ্জা এক বাবার, এ লজ্জা এক ভাইয়ের, এ লজ্জা এক পাতাকার, এ লজ্জা এক স্বাধীন বাংলাদেশের।’

‘আমার প্রশ্ন হল সেনানিবাসের মতো এলাকায়কীভাবে খুন হয়? কেন তাকে খুন করলো? কি অপরাধ ছিল? ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তে ভেজা বাংলাদেশের মাটিতেও সে নিরাপদে থাকতে পারেনি। আজ তনুকে মারল আরেক দিন আমার বোনকে মারবে। তারপর তোমার বোনকে মারবে। আর কত জনের মায়ের বুক খালি করবে ওরা। আমরা কী প্রতিবাদ করতে জানি না? আমরা নিশ্চয় প্রতিবাদ করবো। সবাই আমরা একসাথে প্রতিবাদ করবো। আমরা তিব্র নিন্দা জানাই। চলেন আমরা একসাথে প্রতিবাদ করি।’

‘আর একবার জেগে উঠি ভাই ও বোনরা। আমার বোনের নিরাপদ পথ চলার জন্য। ‘নিরাপদ হোক আমার বোনের পথচলা।’ ফেসবুকের এই ইভেন্টকে বুধবার বিকেল চারটা পর্যন্ত ২১ হাজার ফেসবুক ব্যবহারকারী সমর্থন জানিয়েছেন।

কবি আবু হাসান শাহরিয়ার লিখেছেন,

অনাচার দেখেও অাপন বৃত্তে উটপাখির মতো মাথা-গুঁজে-থাকারাও এই মর্মান্তিক মৃত্যুর জন্য দায়ী। মূক ও বধিরদের দেশে নানা প্রকরণে এমন নৃশংশ ঘটনা পুনঃপুনঃ ঘটতেই থাকবে। কথা বলো বাংলাদেশ।

‘নিজের বোনের কিছু না হলে তো আমরা দাঁড়াবো না, তাই না? নিজের বোনকে বাঁচাতে হলেও আসুন রাজপথে নামি।’ গতকাল এমন আহবান জানিয়েছিলেন গণজাগণ মঞ্চের মূখপাত্র ড. ইমরান এইচ সরকার। আর আজ বুধবার তিনি ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘সাবাস সংগ্রামী জনতা! শুধু ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক নয়, দরকার ছিলো সারাদেশ অচল করে দেওয়া। এভাবে একের পর এক হত্যা-ধর্ষণ চলতে থাকবে আর আমরা তামাশা দেখতে থাকবো? ধামাচাপা নয়, তনু হত্যার বিচার করুন।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ড. কামরুল হাসান তার ফেসবুক ওয়ালে লিখেছেন, “…একটা জিনিস আমি খেয়াল করলাম। এতো বড় একটা নৃশংস ঘটনা; তবুও না পেরেছে আমাদের ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে তোলপাড় তুলতে, না পেরেছে আমাদের প্রিন্ট মিডিয়াতে, না পেরেছে আমাদের সামাজিক মিডিয়াতে তোলপাড় তুলতে। গুটিকয়েক যারা ফেইসবুকে লিখছে তাদের একটা ক্লাস আর যারা তুলছে না তাদেরও মোটাদাগে একটা শ্রেণীতে ফেলা যায়…”

পুরো বিষয়টি কিছু প্রশ্নের উদ্রেক করছে-

১) হত্যার বিষয়ে সোহাগীর পরিবার যেন কোনো তথ্য দিতে না পারে, সেজন্য তাদের নজরদারি রাখা হয়েছে। বন্ধ করে রাখা হয় তাদের মোবাইল ফোন। এর কারণ কি?

২) সকালে সোহাগীর সহপাঠীদের সেই বাসায় প্রথমে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি, পরবর্তীতে জোরাজুরিতে বিস্তারিত পরিচয় নিয়ে মাত্র অল্প কয়েকজনকে যেতে দেয়া হয়েছে, এর কারণ কি?

৩) ক্যান্টনম্যান্ট এলাকার ভেতরে এরকম একটা ঘটনা ঘটলো তারপর সেই অঞ্চলের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কাউকে কি গ্রেফতার কিংবা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে?  না করা হয়ে থাকলে কেন করা হয়নি ?

৪) কেন কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট থেকে অফিসিয়াল বিবৃতি দেয়া হচ্ছে না সার্বিক পরস্থিতি নিয়ে?

৫) কেন টেলিভিশন মিডিয়া রিপোর্ট করছে না কিংবা করতে পারছে না?

৬) ভিক্টোরিয়া কলেজে হয়ে যাওয়া হাজারো ছাত্রের প্রতিবাদ সমাবেশের খবর কেন মিডিয়া কভারেজ পাচ্ছে না?

এইসব প্রশ্নের জট আদৌ খুলবে কি?

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক একেএম ওয়াহিদুজ্জামান লিখেছেন, একটা মেয়ে হিজাব পরতো, কষ্ট করে প্রাইভেট পড়িয়ে নিজের পড়ালেখার খরচ জোগাড় করত। প্রাইভেট পড়িয়ে ফেরার পথে তাকে ধর্ষণ করার পর গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। লাশ পাওয়া গেছে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে। বিষয়টা নিয়ে নারীবাদীরা চুপ, প্রধান মিডিয়াগুলো চুপ, মানবাধিকার সংস্থ্যাগুলো চুপ, বিদেশি মিডিয়া নিশ্চুপ। আহারে! মেয়েটা কেন এথেইস্ট ব্লগার বা সংখ্যালঘু হইলো না? তাইলেই তো আর কেউ চুপ থাকত না।

রবীন আহসান লিখেছেন, বন্ধু তালিকার সকলকে অনুরোধ করছি তনু হত্যার বিচারের দাবিতে আওয়াজ তুলুন। দেশটা বর্বর অমানুষে ভরে গেছে। আসুন দেশটা বাঁচাই।

মারুফ বিল্লাহ তন্ময় লিখেছেন, ‘তনুর ঘটনায় সবাই খুব অবাক হয়েছেন দেখছি অথচ পার্বত্য অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরেই চলছে একই ধরনের ঘটনা। পার্থক্য হইল ময়নামতি একটা ছোট ক্যান্টনমেন্ট আর পার্বত্য অঞ্চল কিছুটা বড় এই যা।

আশা করবো তনু হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার নিশ্চিতের সাথে সাথে পার্বত্য অঞ্চলে ঘটে যাওয়া সকল ধর্ষণ ও খুনের বিচারের দাবিতেও সবাই সোচ্চার হবেন। আর মা বোন ইস্যু সকল ক্ষেত্রে টেনে না এনে নারীকে মানুষ ভাবতে শিখুন।’

ক্রিকেটার তাসকিন আহমেদ তার ফেসবুক পেজে লিখেছেন,

শুধু‬ ক্রিকেট নয় সব জায়গাতেই আমাদের দেশপ্রেম জরুরী। আমার নিষেধাজ্ঞার চেয়েও তনু হত্যার বিচার জরুরী। সে আমাদেরই দেশের মেয়ে। স্বাধীন দেশে কেন তাকে ধর্ষনের শিকার হয়ে মরতে হবে?- তাসকিন

‪#‎Want_justice_For_tonu‬
‪#‎শেয়ার‬ করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সবাই এগিয়ে আসুন।

আবু রায়হান মিকাঈল লিখেছেন,

“সোহাগী জাহান তনু। যে মেয়েটি আজ আমাদের মাঝে আর নেই। কি দোষ ছিল মেয়েটির? যে কারণে ধর্ষণের পর তাকে হত্যা করা হলো? এই সংবাদটি দেখে মনে পড়ে যায় আমার বোনদের কথা। মনে হয়, মেয়েটিতো আমার বোনও হতে পারতো। আশ্চার্য হই এ খবরটি নিয়ে কোথাও তেমন তোলপাড় হয় না। আবার দেশের বড় বড় ঝানু পত্রিকা গুলোও গুরুত্ব দিয়ে এই সংবাদ প্রকাশ করে না। কিন্তু কেন? এভাবে আর কতদিন চলবে? আর কতদিন মুখ বুঝে সহ্য করবে এ জাতি?

নারী সমাজ কি বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে? আজ না হয় আমরা তনুকে হারিয়েছি, কাল তো আপনার-আমার বোনকেও হারাতে হতে পারে। আমি দেখেছি কত সাধারণ বিষয়ে হয় প্রতিবাদ, বিক্ষোভ, আন্দোলন। কিন্তু তনুরা মরে গেলে কি হয়??? তখন কোথায় থাকে সেই প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর গুলো? কোথায় থাকে তখন সেই শাহবাগীদের হুঙ্কার গর্জন???

হিজাবি মেয়ে তনু। তার এই হত্যাকান্ড শুধু জাতিকে নয়, পবিত্র ‘হিজাব’কেও অপমানিত করেছে।
সময় এসেছে জেগে ওঠার, কিছু বলার, কিছু করার। আমরা আর কোনো তনুকে হারাতে চাই না। এখনই সোচ্চার হই, প্রতিবাদী বজ্রকণ্ঠে আওয়াজ তুলি “বিচার চাই, বিচার চাই-তনু হত্যার বিচার চাই।”

এছাড়া শিক্ষক, নাট্য ব্যক্তিত্ব, বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব, খেলোয়াড়, শিক্ষার্থীরাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিরা এর প্রতিবাদ জানিয়েছে ফেসবুক স্ট্যাটাস কিংবা প্রফাইল ছবি পরিবর্তনের মাধ্যেমে।



« (পূর্বের সংবাদ)



মন্তব্য চালু নেই