মেইন ম্যেনু

তনু হত্যা: জিজ্ঞাসাবাদের নামে চরিত্রহনন কেন?

বাছির জামাল: বাংলাদেশের একটি অন্যতম উচ্চ বিদ্যাপীঠ কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের মেধাবী ছাত্রী সোহাগী জাহান তনুর হত্যাকা-ের ঘটনা নিয়ে সারা দেশ এখন বিক্ষুব্ধ। তনুকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় সমাজের এমন কোনো স্তরের মানুষ নেই যারা এর প্রতিবাদ জানাননি। ধর্ম-বর্ণ-স্থান-কাল-পাত্র নির্বিশেষে তনু হত্যা ঘটনার নিন্দা জানানো হচ্ছে। সারা দেশে তনু হত্যাকা- নিয়ে যখন এই অবস্থা তখন খবরের কাগজে প্রকাশিত তনুর মা-বাবার একটি অভিযোগ নাগরিক সমাজকে উদ্বেগে ফেলে দিয়েছে। তনুর মা-বাবা অভিযোগ করেছেন যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের কাছ থেকে তনুর প্রেমের সম্পর্ক ছিল এমন স্বীকারোক্তি আদায়ে চাপ দিচ্ছে। এছাড়া তনুকে কেন বিয়ে দেওয়া হয়নি এমন প্রশ্নও ওঠানো হচ্ছে বলে ওই খবরে প্রকাশিত হয়েছে।

সম্প্রতি তনুর মা-বাবা ও চাচাত বোনকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জিজ্ঞাসাবাদ করে। জিজ্ঞাসাবাদ প্রসঙ্গে তনুর মা আনোয়ারা বেগম সাংবাদিকদের বলেন, ‘এক কথা আশিবার জিজ্ঞাস করছে। কন ভিক্টোরিয়া কলেজের কার সঙ্গে তনুর সম্পর্ক আছিল। আমি তো মেয়ে ক্যান্টনমেন্টের বাইরে গেলে খোঁজ রাখছি। ভেতরে তো খোঁজ রাখি নাই। এইখানে সে ছোট বেলা থেকে বড় হইছে। সব অনুষ্ঠানে নাচগান করছে। নাটকও করছে। কোনোদিন কোনো কথা উঠে নাই। এখন মেয়ে নাই, হাজারটা কথা উঠতেছে।’ খবরে বলা হয়, তনুকে কেন তার মা-বাবা বিয়ে দেননি এমন প্রশ্নও উঠেছে। সোহাগীর বড় ভাইয়ের সঙ্গে পরিবারের অন্য আত্মীয়দের মধ্যে কারও সম্পর্ক আছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন করা হচ্ছে। এসব জানিয়ে কাঁদতে কাঁদতে আনোয়ারা বেগম বলেন, ‘এগুলো কী জিজ্ঞাস করে। ক্যান করে? তনুর খুনের সঙ্গে এগুলার কী সম্পর্ক?’

তনু ২০ মার্চ রাতে কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকায় খুন হয়। কিন্তু এ লেখা তৈরি করা পর্যন্ত সন্দেহভাজন কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এর আগেই ঘটনার ব্যাপারে তার বাবা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের কর্মচারী ইয়ার হোসেন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের নামে কোতোয়ালি মডেল থানায় হত্যা মামলা করেন। আসামিদের ধরতে কুমিল্লার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর রয়েছে। এ ব্যাপারে র‌্যাব-১১ কুমিল্লার উপ-পরিচালক মেজর মো. খুরশীদ আলম সাংবাদিকদের জানান, এরই অংশ হিসেবে কয়েকজন সন্দেহভাজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আনা হয়েছিল। তাই তনুর মা ও ভাইবোনকে আনা হয়েছিল।

আসলে হত্যাকা-ের রহস্য উদঘাটনে তনুর মা-বাবা অথবা ভাইবোনকে জিজ্ঞাসাবাদ করায় কোনো সমস্যা নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তদন্তের স্বার্থে যে কাউকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে। কিন্তু আমাদের প্রশ্ন হচ্ছে, ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নেই এমন অপ্রাসঙ্গিক কোনো কিছু জিজ্ঞাসা করাটা আদৌ প্রয়োজন রয়েছে কি না। তাও আবার ভিকটিমের পরিবারকে। একমাত্র কন্যাকে হারিয়ে পরিবারটি এমনিতেই গভীর শোকাহত অবস্থায় রয়েছে, এর মধ্যে যদি আবার এমন ধরনের প্রশ্ন করা হয়, যা ভিকটিমের পরিবারকে আরও গভীর হতাশায় নিমজ্জিত করে দেয়, তাহলে তা কী ওই পরিবারকে সহযোগিতা করা হলো, না পরিবারটিকেই হতাশার খাদের কিনারে ফেলে দেওয়া হলো? আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে এমন প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

জিজ্ঞাসাবাদের নামে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এতটা নীচে নামবে তা আমরা বিশ্বাস করতে চাই না। কিন্তু অভিযোগটি এসেছে স্বয়ং যে মেয়েটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে তার মা-বাবার কাছ থেকে। ভিকটিমের মা-বাবা কী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করবে? এটাও তো বিশ্বাসযোগ্য নয়। তাহলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তনুর মা-বাবাকে জিজ্ঞাসাবাদের নামে ‘মেয়েকে (তনু) বিয়ে দেওয়া হলো না কেন’ এবং ‘মেয়ের প্রেমের সম্পর্ক ছিল কি না’এমন সব প্রশ্ন কিসের স্বার্থে করছেন এ প্রশ্ন তো আমরা রাখতেই পারি।

সোহাগী জাহান তনুর সম্পর্কে ইতিমধ্যে আমরা যা জানতে পেরেছি তাতে দেখা যায়, তনু কোনো সাধারণ মেয়ে ছিল না। সে ছাত্রী হিসেবে ছিল মেধাবী। তাই লেখাপড়াতেও ছিল তুখোড়। আবার নাটক ও নাচগানের সঙ্গেও সে জড়িত ছিল। তার লক্ষ ছিল সেনানিবাসের স্কুলগুলোয় নাচগানের শিক্ষক হতে। এসব কিছুই জানতে পেরেছি আমরা তার বাবা ইয়ার হোসেনের কাছ থেকে। অর্থাৎ তনু একটি নির্দিষ্ট লক্ষপানে এগিয়ে যাচ্ছিল। আর মেয়ের এসব চাওয়াকে পূর্ণতা দিতে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছিলেন তার মা-বাবা। তাই তার লক্ষ পূরণ হওয়ার আগে বিয়ে না করাই যথার্থ।

আর প্রেম? সে তো যে কারও সঙ্গে হতেই পারে। প্রেম হওয়া তো আর অন্যায় কিছু নয়। তবে প্রেম প্রসঙ্গে তনুকে যদি কেউ জোরাজুরি বা ডিস্টার্ব করত, তাহলে তনু বিষয়টি তার মা-বাবাকে অবশ্যই জানাত। আর প্রেম যদি তনুর কারও সঙ্গে হয়েও থাকে, তাহলে তা ছিল কেবলই দুজনের মধ্যে বোঝাপড়ার পর্যায়ে। জিজ্ঞাসাবাদের সময় তনুর চাচাত বোন লাইজু জাহান এ বিষয়টি খোলাসা করে বলেছেন, ‘আমার কাছ থেকে নাম জানতে চাইছে। আমি বলছি একজন তাকে (তনু) প্রপোজ (প্রস্তাব) করছিল। কিন্তু সে খুন করছে এই কথা বলি নাই। কারণ, তাকে কখনো দেখি নাই জোরাজুরি করতে বা ডিস্টার্ব করতে। সে এইখানে থাকেও না।’

অপরাধ বিজ্ঞানীরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তনুর ধর্ষণ ও খুনের সঙ্গে জড়িতদের বের করার দিকে আরও মনোযোগ দেওয়া উচিত বলে মনে করেন। তবে অপরাধ বিজ্ঞানীদের মতো এটা বলছি না যে, জড়িতদের বের করার ব্যাপারে তাদের কোনো মনঃসংযোগ নেই। মনঃসংযোগ আছে বৈকি! তবে আমাদের কথা হচ্ছে, তনুর পরিবারকে জিজ্ঞাসাবাদের নামে যেন হেনস্তা না করা হয়। কারণ আজকালকার তদন্তে ‘কেঁচো খুঁজতে গিয়ে সাপ’ না বের করে বরং ‘সাপ খুঁজতে গিয়ে কেঁচো’ বের করে আনা হচ্ছে। এতে তদন্তেই বা কী পাওয়া যায়, আর ভিকটিমেরই বা কী লাভ হয়?

01_108218

বাছির জামাল

একটি সমাজ সভ্য কি না, তার অন্যান্য নির্ণয়কের মধ্যে ওই সমাজে নারীদের নিরাপত্তা কেমন, সমাজে তাদেরক্ষমতায়ন কতটুকু হয়েছে তা দেখা হয়। আমাদের এই সমাজ ধীরে ধীরে এই দিকে যে এগুচ্ছে তা আশার কথা। কিন্তু মাঝেমধ্যে উটকো ঝড় এসে সব কিছু এলোমেলো করে দিয়ে যায়। উন্নত দেশগুলোতেও যে এমন ঝড় আসে না তা কিন্তু নয়। সেখানেও এমন হয়। কিন্তু আমাদের তুলনায় তাদের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা ব্যাপক। সামাজিক এই সুরক্ষার মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্ষমতার চৌহদ্দিও উল্লেখ রয়েছে। আমাদের আইনেও এসবের উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু ওই পর্যন্তই।

অপরাধ বিজ্ঞানীরা মনে করেন, হত্যা রহস্য উদঘাটনে যদি ভিকটিমের জীবনের এমন কিছু স্পর্শকাতর বিষয় জানার প্রয়োজন হয়, তাহলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এ নিয়ে অবশ্যই জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে। তবে এ ব্যাপারে ভিকটিমের মা-বাবাকে যদি কিছু জিজ্ঞেস করতে হয়, তাহলে তাদের সেভাবে প্রস্তুত করে নেওয়াই ভালো। পরিবারের সদস্য বা মা-বাবা যেন মনে করেন যে, তাদের যেসব প্রশ্ন করা হচ্ছে, তা তার মেয়ের খুনিদের বের করতে সহায়তা করবে। এতে তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যে কোনো প্রশ্নের উত্তর সানন্দে জবাব দেবে। উন্নত দেশগুলোয় এভাবেই জিজ্ঞাসাবাদ করায় বেশ ভালো ফল পাওয়া যায় বলে অপরাধ বিজ্ঞানীরা উল্লেখ করেন।

কিন্তু কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই যদি এসব প্রশ্ন করা হয় তাহলে পরিবারের সদস্যরা ভাবতেই পারেন, ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতেই জিজ্ঞাসাবাদে এসব প্রশ্ন করা হচ্ছে, যা ঘটনার সঙ্গে আদৌ সংশ্লিষ্ট নয়। কারণ নিজের মেয়েকে হারিয়ে এমনিতেই মা-বাবা মানসিকভাবে বিপর্যয়ের মধ্যে থাকেন, তার ওপর যদি মেয়ের জীবনের স্পর্শকাতর এসব বিষয়ের মুখোমুখি হতে হয়, তাহলে তাদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক। একসময় তাদের মধ্যে মানসিক বৈকল্যও দেখা দিতে পারে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দক্ষতা এবং আন্তরিকতা নিয়ে আমাদের কোনো কথা নেই। তাদের কাছে আমাদের একটিই চাওয়া, তারা জিজ্ঞাসাবাদের নামে যেন কারও চরিত্রহনন না করেন।

[email protected]

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। আওয়ার নিউজ বিডি এবং আওয়ার নিউজ বিডি’র সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)






মন্তব্য চালু নেই