মেইন ম্যেনু

তুষার ঝড় নাকি প্রকৃতির প্রতিশোধ?

তুষার প্রলয় বর্তমান পৃথিবীতে একটা বাৎসরিক ঐতিহ্যে দাঁড়িয়ে গেছে। এমন একটা বছর পার হয়না যেখানে পৃথিবীর কেউ না কেউ কোথাও না কোথাও ভয়াবহ তুষার ঝড়ের মধ্যে পড়ে না। দুয়েক বছর পরপরই এর পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। এদিকে আমরা ক্রমাগত শুনছি বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, বরফ সব গলে যাচ্ছে অথচ একইসাথে হঠাৎ অবাক হয়ে শুনছি পৃথিবীর এক জায়গায় তুষার ঝড় হচ্ছে এবং ৩০ ইঞ্চি পুরু তুষার পড়ছে। তারা ঘর থেকে বেরুতে পারছে না, গাড়ি ঘোড়া সব তুষারে চাপা পড়ে গেছে। খবরে দেখা যাচ্ছে ঠাণ্ডায় সেখানকার মানুষ জোব্বা গায় দিয়েও হুহু করে কাঁপছে। একেবারে সাম্প্রতিক সময়ে ঠিক এ ধরনের তুষার প্রলয়ের ঘটনা ঘটেছে। প্রলয়াক্রান্ত দুর্ভাগ্যবান মানুষেরা হচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরের বাসিন্দারা।

ব্যাপারটা পরীক্ষিত সত্য যে, পৃথিবীর উষ্ণতা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। গত ২০১৫ সালকে ঘোষণা করা হয়েছে উষ্ণতম বছর হিসেবে। বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, গত বছরে ভূপৃষ্ঠ এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ছিল উল্লেখযোগ্য হারে বেশি। বিজ্ঞানীরা এই উষ্ণতার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন কলকারখানা, যানবাহন এবং সর্বোপরি মানুষের পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ডকে। কিন্তু এই গ্লোবাল ওয়ারমিং এর মধ্যে যখন শোনা যায় কোথাও বরফ পড়ছে তখন হঠাৎ খটকা লাগে। পৃথিবী কী আসলেই গরম হচ্ছে? যদি হয় তাহলে এতো ভয়াবহ তুষার ঝড় কেন হবে?

ভারী তুষারপাত হলে মানুষের মনে প্রথম যে প্রতিক্রিয়া হয় তা হচ্ছে জলয়ায়ু পরিবর্তন এবং উষ্ণতা বৃদ্ধি একটা গালগপ্পো ছাড়া আর কিছুই না। কিন্তু তারপরও কেউ যদি জলয়ায়ু পরিবর্তনের হাজারো বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতে মেনেও নেয় যে, এটা মোটেই গালগপ্পো নয় বরং খুবই বাস্তব একটা সমস্যা, তারপরেও তুষারপাতের ব্যাপারটা খুব সহজেই বিভ্রান্তিকর। প্রশ্ন জাগে, হয়তোবা পৃথিবী আসলে এখনো ততটা উষ্ণ হয়নি যাতে সব বরফ গলে যাবে?

এই তুষার বিভ্রান্তির প্রকৃত উত্তর কিন্তু চমকপ্রদ। মাত্রাতিরিক্ত তুষারপাত আসলে উষ্ণতম পৃথিবীর একটি প্রত্যাশিত পরিণতি। কথাটাকে আপাত দৃষ্টিতে মনে হতে পারে স্ববিরোধী, কিন্তু সেটা মনে হওয়ার কারণ হচ্ছে, আমরা স্বাভাবিকভাবে ধরে নেই বরফ তৈরি হয় ঠাণ্ডা আবহাওয়ায়।

বাস্তবে ভারী তুষারপাতের জন্য ঠাণ্ডা আবহাওয়া দরকার হয় না। দরকার পড়ে অন্য কিছু- প্রচুর পরিমাণ বায়ুমণ্ডলীয় আদ্রতা। আর ঠিক এখানেই চমকপ্রদ ব্যাপারটি ঘটে। এই আদ্রতা তৈরি হয় গরম বাতাসের ঘূর্ণি বা পকেট থেকে। কারণ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা যদি ১ ডিগ্রি বৃদ্ধি পায় তাহলে এর জলীয় বাষ্প ধারণ ক্ষমতাও বৃদ্ধি পায় ৭ শতাংশ। প্রত্যেকবার তাপমাত্রা বাড়লে জলীয় বাস্পের ধারণ ক্ষমতাও বাড়ে।

জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সাথে গরম বাতাসের এই ধরনের পকেট তৈরির মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এটা থেকেই ব্যাখ্যা করা সম্ভব গত সপ্তাহে ঠিক কী ঘটেছিল যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলে। জলবায়ু পরিবর্তনের পরিণতিতে বর্তমানের আটলান্টিক মহাসাগর গত কয়েক দশক আগের থেকে অনেক বেশি উষ্ণ। সাগরের উষ্ণতা যদি বৃদ্ধি পায় তাহলে সাগর পৃষ্ঠের উপরের বায়ুও অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ এবং আদ্র হয়ে ওঠে। এই উষ্ণ বায়ু যখন আর্কটিকের হিমশীতল বায়ুর সাথে গিয়ে মেশে তখন সৃষ্টি হয় শৈত্য প্রবাহের ঝড়। কাজেই একটা দানব আকৃতির তুষার ঝড়ের জন্য অবস্থাটা ছিল যথার্থ।

যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলে ঠিক একই ধরনের তীব্র ঠাণ্ডা আবহাওয়ার পুনরাবৃত্তি হওয়ার সম্ভাবনা আগামী বছরগুলোতে ভালমতোই রয়েছে। কারণ একটা প্রলয়ঙ্কারী তুষার ঝড় তৈরিতে যে দুইটি মূল উপাদান প্রয়োজন সেটা এখানে উপস্থিত। শীতকালে আটলান্টিক মহাসাগর জোগান দিতে থাকবে উষ্ণ আদ্র বাতাস এবং সেইসাথে আর্কটিক দক্ষিণে জোগান দেবে ঠাণ্ডা শুষ্ক বাতাস। সৃষ্টি হবে বিস্ফোরণ।

কলোরাডোর দ্যা ন্যাশনাল সেন্টার ফর অ্যাটমসফেরিক রিসার্চের গবেষক কেভিন ট্রেনবার্থ বলেন, ‘আগামী ৩০ বছরের মধ্যে এটা খুবই সম্ভব যে গ্রীষ্মকালে আর্কটিক হয়ে পড়বে বরফ শুন্য, কিন্তু শীতকালে ঠিকই আর্কটিকে বরফ জমা হবে। কাজেই ঠাণ্ডা মহাদেশীয় বায়ু ঠিকই তৈরি হবে।’

জলবায়ু পরিবর্তন যদি জটিলই না হতো তাহলে তো কোনও সমস্যা ছিল না। এমনকি যদি একটি উষ্ণতর পৃথিবীর ফলে কোনো কোনো অঞ্চলে মারাত্মক তুষার ঝড়ের মত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়ও, তারমানে কিন্তু ঠিক এটা নয় যে সবজায়গায় অনেক বেশি তুষারপাত হবে। ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) বিজ্ঞানী পল ও’গরম্যান বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যে তীব্র তুষারঝড় হয়, তার সাথে মৌসুমি তুষারপাতের তফাৎ রয়েছে।’

২০১৪ সালে ও’গরম্যান এর উপরে একটি গবেষণা করেছিলেন। সেখানে তিনি কম্পিউটার নির্মিত একটি মডেল ব্যবহার করে দেখিয়েছিলেন, উচ্চ মাত্রার গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণের কারণে এই শতাব্দীর শেষে পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধের মাঝারি এবং মারাত্মক তুষারঝড়ের ধরণ কিভাবে বদলে যাবে।

পৃথিবীর যে সমস্ত অঞ্চল সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ১ কিমি এর চেয়ে কম উঁচু, শীতকালে সেই সমস্ত অঞ্চলের তাপমাত্রা বর্তমানে নেমে যাচ্ছে শুন্যের কেবলই নিচে। ও’গরম্যান গবেষণায় দেখেছেন, এই সমস্ত অঞ্চলের ক্ষেত্রে তীব্র তুষারঝড়ের সম্ভাবনা কমে যাবে গড়ে ৮ শতাংশ। কিন্তু ঐ সমস্ত অঞ্চলে প্রত্যেক শীতকালে সার্বিকভাবে মোট যে পরিমাণ তুষারপাত হয়, তার মাত্রাও গড়ে কমে যাবে ৬৫ শতাংশ। তিনি বলেন, ‘কিছু কিছু অঞ্চলে মোট মৌসুমি তুষারপাতের সম্ভাবনা কমবে, কিন্তু সেই তুলনায় তুষারপাতের তীব্রতার মাত্রায় খুব একটা পরিবর্তন হবে না। বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে তীব্রতা বেড়ে যাবে।’

কেভিন ট্রেনবার্থের মতে, ভবিষ্যতে তুষারপাতের মৌসুমও আকারে ছোট হয়ে যেতে পারে। কারণ উত্তর গোলার্ধের শীতকালের শুরু এবং শেষটা আরও বেশি উষ্ণ হয়ে পড়বে। কাজেই এই মুহূর্তে যে কোনো ধরনের বর্ষণই তুষার না হয়ে বৃষ্টি হয়ে পড়বে। অন্য কথায় বলতে গেলে, তুষার পাতের ঘটনা ভবিষ্যতে আরও কমে যাবে এবং শীত মৌসুমও আকারে ছোট হয়ে যাবে। কিন্তু ভয়াবহ তুষার ঝড়ের ঝুঁকি এখন যেমন আছে ঠিক তেমনই থেকে যাবে।

পৃথিবীর অনেক দেশেই এখনো বছরের প্রথম তুষারপাতের জন্য অপেক্ষা করে মানুষ। কারণ তুষারপাতের দৃশ্য পৃথিবীর অতি সুন্দর দৃশ্যগুলোর মধ্যে একটা। ঠিক যেমন বৃষ্টিপাতের দৃশ্য। বছরের প্রথম বৃষ্টির ফোঁটা গায়ে মাখার জন্য মানুষ যেমন অপেক্ষা করে থাকে, তেমনি তুষারপাতের জন্যও অপেক্ষা করে মানুষ। বৃষ্টি পড়লে শব্দ হয়, তুষার পড়লে শব্দ হয়না। সাদা তুষার যখন আকাশ থেকে নেমে আসে নিঃশব্দে, তখন অনেক সময় প্রাচীন নিরাবতাও গ্রাস করে বসে আধুনিক মানুষের মন। মোলায়েম তুষার গায়ে মেখে বাচ্চার যখন ছোটা ছুটি করে তখন সেই দৃশ্য ভিডিও করে রাখে অনেক বাবা-মা। তুষারপাত ঠিক এই রকম আনন্দদায়ক ঘটনাগুলোর একটা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এই আনন্দ এখন পরিণত হয়েছে মূর্তিমান আতঙ্কে। তুষারপাত পরিণত হয়েছে আক্রোশে ফুঁসতে থাকা তুষার প্রলয়ে। মানুষ নির্দয়ের মত যেভাবে প্রকৃতিকে ধ্বংস করেছে, প্রকৃতিও যেন সবাইকে জানিয়ে তার প্রতিশোধ নিচ্ছে মানুষের উপরে। আক্রোশ নিয়ে যান্ত্রিক মানুষকে বলছে, প্রকৃতিতে ফিরে যেতে।






মন্তব্য চালু নেই