মেইন ম্যেনু

তোমারি নাম সকল তারার মাঝে… আজ বাইশে শ্রাবণ

আকাশজুড়ে শুনিনু ওই বাজে তোমারি নাম সকল তারার মাঝে…। সকল তারার মাঝে অত্যুজ্জ্বল রবীন্দ্রনাথ। বাঙালীর ‘আকাশভরা সূর্য তারা’ হয়ে ছিলেন। আজও ‘প্রাণের মানুষ আছে প্রাণে।’ ‘আছে সে নয়নতারায় আলোকধারায়, তাই না হারায়।’ মহাপ্রয়াণেও হারিয়ে যাননি বিশ্বকবি। বাংলাভাষা, সাহিত্য ও সঙ্গীতের ভা-ারকে বহুমাত্রিক অবদানে সমৃদ্ধ করা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৭৫তম প্রয়াণ দিবস আজ ২২ শ্রাবণ। ১৩৪৮ বঙ্গাব্দের এই দিনে পৃথিবী থেকে চিরপ্রস্থান করেন তিনি। এরপর ৮ দশক অতিক্রান্ত হয়েছে। বিলীন হয়েছে অনেক কিছু। রবীন্দ্রনাথ মৃত্যুঞ্জয়ী। বাঙালীর প্রতিটি আবেগ আর সূক্ষ্ম অনুভূতিকে স্পর্শ করে আছেন। প্রয়াণ দিবসে নানান আয়োজনে মহান স্রষ্টাকে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালবাসা জানাবে বাঙালী।

প্রথম জীবনে ভানুসিংহের পদাবলীতে কবি লিখেছিলেন- মরণ রে,/ তুঁহু মম শ্যামসমান… মৃত্যু অমৃত করে দান। একইভাবে মৃত্যুকে জীবনের নিস্তাররূপে বর্ণনা করে লিখেছিলেন- প্রেম বলে যে যুগে যুগে, তোমার লাগি আছি জেগে, মরণ বলে আমি তোমার জীবনতরী বাই। জীবনের শেষদিকে এসে কবি জীবনের প্রতি নিজের তৃষ্ণার কথা জানিয়ে লেখেন বিখ্যাত সেই পঙ্ক্তি- মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে/ মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই। বলা বাহুল্য, মানবের মাঝে রবীন্দ্রনাথের বেঁচে থাকার স্বপ্ন শতভাগ পূর্ণতা পেয়েছে।

চেয়ে দেখি তিমিরগহন রাতি।/ কেঁদে বলি মাথা করে নিচু,/ ‘শক্তি আমার রইল না আর কিছু!’/ সেই নিমেষে হঠাৎ দেখি কখন পিছু পিছু/ এসেছে মোর চিরপথের সাথী…। বাঙালীর চিরপথের সাথী রবীন্দ্রনাথ। আজ যখন অন্ধকারের শক্তি সব বিনষ্ট করার ষড়যন্ত্র করছে, মানবসমাজ যখন হুমকির মুখে, কবিগুরু যেন ভরসা দিতে চলে এসেছেন। নতুন করে। চুকিয়ে দেব বেচা কেনা,/মিটিয়ে দেব গো, মিটিয়ে দেব লেনা দেনা,/বন্ধ হবে আনাগোনা এই হাটে-/ তখন আমায় নাইবা মনে রাখলে…। বাঙালী নিজের আত্মার স্পন্দনে রক্তধারায় বাঁচিয়ে রেখেছেন রবীন্দ্রনাথকে। আলোর অনন্ত উৎস হয়ে আছেন এই মহামানব।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাঙালীর আত্মপরিচয়। তিনি একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, ছোট গল্পকার, সংগীতস্রষ্টা, নট ও নাট্যকার, চিত্রকর, প্রাবন্ধিক, কণ্ঠশিল্পী ও দার্শনিক। বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন। বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে তার সাহিত্য। ১৯১৩ সালে ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থের জন্য সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন তিনি। তার এ প্রাপ্তি বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে বড় অর্জন।

কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে ১২৬৮ বঙ্গাব্দের ২৫ বৈশাখ জন্মগ্রহণ করা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজ কর্মের মাধ্যমে সূচনা করে গেছেন একটি কালের; একটি সংস্কৃতির। কৈশোর পেরোনোর আগেই বাংলা সাহিত্যের দিগন্ত বদলে দিতে শুরু করেন তিনি। তার পরিণত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিণত হয়েছে বাঙালীর শিল্প-সাহিত্য। বাংলাভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথের ৫২ কাব্যগ্রন্থ, ৩৮ নাটক, ১৩ উপন্যাস ও ৩৬ প্রবন্ধ ও অন্যান্য গদ্যসঙ্কলন প্রকাশিত হয়েছে। তার সর্বমোট ৯৫ ছোটগল্প ও ১৯১৫ গান যথাক্রমে- গল্পগুচ্ছ ও গীতবিতান সঙ্কলনের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের যাবতীয় প্রকাশিত ও গ্রন্থাকারে অপ্রকাশিত রচনা ৩২ খ-ে রবীন্দ্র রচনাবলী নামে প্রকাশিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের কাব্য-সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য- ভাবগভীরতা, গীতিধর্মিতা চিত্ররূপময়তা, অধ্যাত্মচেতনা, ঐতিহ্যপ্রীতি, প্রকৃতিপ্রেম, মানবপ্রেম, স্বদেশপ্রেম, বিশ্বপ্রেম, রোমান্টিক সৌন্দর্যচেতনা, ভাব, ভাষা, ছন্দ ও আঙ্গিকের বৈচিত্র্য, বাস্তবচেতনা ও প্রগতিচেতনা। রবীন্দ্রনাথের গদ্যভাষাও কাব্যিক। ভারতের ধ্রুপদ ও লৌকিক সংস্কৃতি এবং পাশ্চাত্য বিজ্ঞানচেতনা ও শিল্পদর্শন তার রচনায় গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিল। কথাসাহিত্য ও প্রবন্ধের মাধ্যমে তিনি সমাজ, রাজনীতি ও রাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে নিজ মতামত প্রকাশ করেছিলেন। সাহিত্যের পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথের গান বাংলা সঙ্গীতভা-ারকে দারুণভাবে সমৃদ্ধ করেছে। আজকের বদলে যাওয়া সময়েও বিপুল ঐশ্বর্য নিয়ে টিকে আছে রবীন্দ্রসঙ্গীত। এর আবেদন যেন কোন দিন ফুরোবার নয়। বরং যত দিন যাচ্ছে ততই রবীন্দ্রসঙ্গীতের বাণী ও সুরের ইন্দ্রজালে নিজেকে জড়িয়ে নিচ্ছে বাঙালী। তাদের আবেগ অনুভূতি কবিগুরুর গানের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। রবীন্দ্রনাথের লেখা ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’ গানটি বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের জাতীয় সঙ্গীতেরও রচয়িতা তিনি। বহু প্রতিভার অধিকারী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রায় সত্তর বছর বয়সে নিয়মিত ছবি আঁকা শুরু করেন। ১৯২৮ থেকে ১৯৩৯ সালের মধ্যে অঙ্কিত তার স্কেচ ও ছবির সংখ্যা আড়াই হাজারের বেশি। দক্ষিণ ফ্রান্সের শিল্পীদের উৎসাহে ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে তার প্রথম চিত্রপ্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয় প্যারিসের পিগাল আর্ট গ্যালারিতে। এরপর সমগ্র ইউরোপেই কবির একাধিক চিত্রপ্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। তার আঁকা ছবিতে আধুনিক বিমূর্তধর্মিতাই বেশি প্রস্ফুটিত হয়েছে।

মানবতাবাদী রবীন্দ্রনাথ মানুষের ওপর দৃঢ়ভাবে আস্থাশীল ছিলেন। তার মতে, মানুষই পারে অসুরের উন্মত্ততাকে ধ্বংস করে পৃথিবীতে সুরের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে। তাই ‘সভ্যতার সঙ্কট’ প্রবন্ধে তিনি লিখেছিলেনÑ ‘মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ।’ ১৯১৫ সালে ব্রিটিশ সরকার তাকে নাইট উপাধিতে ভূষিত করে। কিন্তু ১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকা-ের প্রতিবাদে সেই উপাধি বর্জন করেন রবীন্দ্রনাথ।

সমাজের কল্যাণেও নানান উদ্যোগ গ্রহণ করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সমাজকল্যাণের উপায় হিসেবে তিনি গ্রামোন্নয়ন ও গ্রামের দরিদ্র জনসাধারণকে শিক্ষিত করে তোলার পক্ষে মতপ্রকাশ করেন। এর পাশাপাশি সামাজিক ভেদাভেদ, অস্পৃশ্যতা, ধর্মীয় গোঁড়ামি ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে তিনি তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের দর্শনচেতনায় ঈশ্বরের মূল হিসেবে মানব সংসারকেই নির্দিষ্ট করা হয়েছে। তিনি দেববিগ্রহের পরিবর্তে কর্মী অর্থাৎ মানুষ ঈশ্বরের পুজোর কথা বলেছিলেন।

রবীন্দ্রনাথের জীবনের শেষ চার বছর ঘন ঘন অসুস্থতার মধ্য দিয়ে গেছে। এ সময়ের মধ্যে দু’বার অত্যন্ত অসুস্থ অবস্থায় শয্যাশায়ী থাকতে হয়েছিল কবিকে। ১৯৩৭ সালে একবার অচৈতন্য হয়ে গিয়েছিলেন। আশঙ্কাজনক অবস্থা হয়েছিল। তখন সেরে উঠলেও ১৯৪০ সালে অসুস্থ হওয়ার পর আর তিনি সুস্থ হয়ে উঠতে পারেননি। নিজের সৃষ্টির মাঝে এখন লীন হয়ে আছেন কালজয়ী স্রষ্টা।

৭৫তম প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে নানান আয়োজনে কবিগুরুকে স্মরণ করছে বাঙালী। শুক্রবার থেকে উত্তরা ক্লাবে শুরু হয়েছে ‘রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা ভাবনা’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলন। দুই দিনব্যাপী সম্মেলনের উদ্বোধন করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও ভারতের রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মিলিত আয়োজনে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেনÑ ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. বরুণ কুমার চক্রবর্তী, চীনের পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশিয়ান স্টাডিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ঝাংঝিং ও জাপানের হিরোশিমা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মাছাহিকো টোগাওয়া। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. মুনমুন গঙ্গোপাধ্যায় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. এএসএম আবু দায়েন। উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইয়াসমীন আরা লেখার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিষয়ভিত্তিক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ড. হায়াৎ মামুদ।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংস্কৃতিমন্ত্রী বলেন, আমরা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে নানানভাবে রবীন্দ্রনাথকে আশ্রয় করি। আমাদের সুখে-দুঃখে সঙ্কটে প্রবলভাবে উপস্থিত তিনি। মন্ত্রী বলেন, রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা ভাবনার মূল বিষয় হলো নান্দনিকতা, মানবিকতা ও আনন্দের সঙ্গে শিক্ষালাভ। শুধু পুঁথিগত শিক্ষা নয়, প্রকৃত জ্ঞান অর্জনকেই তিনি প্রাধান্য দিয়েছেন। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা ভাবনার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। আমাদের শিক্ষায় মানবিকতা, সহনশীলতা, ভ্রাতৃত্ববোধ, নান্দনিকতা ও আনন্দযোগের অভাব রয়েছে। এ পরিস্থিতি উত্তরণে একটি সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন। অনুষ্ঠানে রবীন্দ্র গবেষণায় উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য সৈয়দ আকরাম হোসেন ও আহমদ রফিককে সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়।

প্রয়াণ দিবসে আজ শনিবার রাজধানী ঢাকায় বিভিন্ন উৎসব অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে। বিকেলে বাংলা একাডেমির শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে আহমদ রফিকের লেখা ‘রবীন্দ্রজীবন’ তৃতীয় খ-ের মোড়ক উন্মোচন করা হবে। গ্রন্থের ওপর আলোচনা করবেন অধ্যাপক শফি আহমেদ এবং অধ্যাপক ভীষ্মদেব চৌধুরী। সভাপতিত্ব করবেন ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। পরদিন রবিবার বিকেলে একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে থাকবে একক বক্তৃতা, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা এবং রবীন্দ্র পুরস্কার-২০১৬ প্রদান অনুষ্ঠান। রবীন্দ্রবিষয়ক একক বক্তৃতা করবেন বিশিষ্ট রবীন্দ্র সঙ্গীতশিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা। এ বছর রবীন্দ্র পুরস্কার প্রদান করা হবে অধ্যাপক সৈয়দ আকরম হোসেন এবং শিল্পী তপন মাহমুদকে।

ছায়ানটের উদ্যোগে সন্ধ্যায় থাকছে প্রয়াণ দিবসের অনুষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও খ্যাতনামা রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পীরা গানে গানে অঞ্জলি জানাবেন রবীন্দ্রনাথকে। ঢাকার বাইরে কবিগুরুর স্মৃতিধন্য স্থানগুলোতেও থাকবে বিভিন্ন কর্মসূচী। সমস্ত আয়োজন থেকে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালবাসায় স্মরণ করা হবে চিরকালের কবিকে।






মন্তব্য চালু নেই