মেইন ম্যেনু

মিরসরাই ট্র্যাজেডি

থামেনি স্বজনহারাদের কান্না

১১জুলাই চট্টগ্রামের ‘মিরসরাই ট্র্যাজেডি’র বার্ষিকী। দিনটি মিরসরাইবাসীর জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক। ‘মিরসরাই ট্র্যাজেডি’ এ এক বিভীষিকাময় গল্পের নাম। একে একে ৪৫টি জীবনের কঠিন নিয়তির গল্প। ৪৫টি পরিবারের সারাজীবনের অশ্রুপাতের গল্প। মুহূর্তেই হইচই পড়ে গেল ঘটনাস্থলে। আশপাশের সবাই ছুটে এলো ঠিকই, বাঁচানো গেল না পিকআপের তলানিতে আটকে পড়া কোনো খুদে ছাত্রকে। অকালেই ঝরে যায় একে একে ৪৫টি তাজা প্রাণ।

১১ জুলাই, ২০১১। দিনটি ছিল সোমবার। দুপুরের কড়া রোদ মাথার ওপর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক পাড়ি দিয়ে আঁকাবাঁকা গ্রামীণ পথ ধরে ছুটে চলছিল পিকআপ। পিকআপে বিজয়োল্লাস। উল্লাসে মাতোয়ারা আবুতোরাবের আশপাশের কয়েকটি গ্রামের প্রায় শতাধিক শশু-কিশোর। চালকের সামান্য ভুলে এতগুলো খেলাপাগল শিশু-কিশোর নিয়ে পিকআপটি উল্টে গেল পাশের ডোবায়। নিমিষেই হারিয়ে যায় ৪৫টি তাজা প্রাণ। সেদিন পিতার কাধে উঠেছিল আদরের সন্তানের লাশ।

ট্র্যাজেডিতে চার বছর পরও আদরের সন্তানের স্মৃতি যেন কোনভাবেই ভুলতে পারছেন না মা-বাবারা। সেদিন নিহত আনন্দ দাস, সাইদুল, নয়ণশীল, ইফতেখার, কামরুলের হতভাগীনী মায়েরা সন্তানের ছবি বুকে নিয়ে এখনো পথ চেয়ে থাকেন, ছেলে বাড়ি ফিরবে মা বলে ডাকবে এ আশায়।

মিরসরাই ট্র্যাজেডির চার বছরের পূর্ণ হওয়ায় স্মৃতিচারন করতে গিয়ে আবুতোরাব উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জাফর সাদেক বলেন, ‘দুর্ঘটনায় আমাদের স্কুলের ৩৪ জন ছাত্র মারা গেছে। তাদের শূন্যতা কখনো পূরন হবার নয়। এখনো মনে হচ্ছে তারা আমার আশেপাশে ঘুরাফেরা করছে। বিশেষ করে আবু সুফিয়ান, ধ্রুব নাথ ও কাজল নাথকে আমার খুব বেশি মনে পড়ছে। এরা তিনজনই খুব মিধাবী ছিল।’

তিনি আরো বলেন, ‘ট্র্যাজেডির সময় শিক্ষা-সচিব এসে আবুতোরাব বহুমূখী উচ্চ বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করার ঘোষনা দিলেও এখনো কিছুই হয়নি।’ এছাড়া দূর্ঘটনাস্থলে স্মৃতিস্তম্ভ অন্তিম নির্মাণ না হওয়ায় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

বিভীষিকাময় সেদিনের কথা:
১১ জুলাই ২০১১, সোমবার : মিরসরাই স্টেডিয়াম থেকে ফিরছিল বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ ফুটবল ফাইনাল খেলা শেষে একটি মিনি ট্রাকে করে বিজয়ী এবং বিজিত উভয় দলের খেলোয়াড় ও সমর্থকরা আবুতোরাব এলাকায় যাচ্ছিল। বড়তাকিয়া-আবুতোরাব সড়কের সৈদালী এলাকায় ৬০-৭০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে ডোবায় উল্টে যায় মিনিট্রাকটি। যার নং চট্টমেট্রো – ড – ১১-০৩৩৭। ডোবার জল থেকে একে একে উঠে আসে লাশ আর লাশ। পরে সে লাশের রথ গিয়ে থামে পঁয়তাল্লিশে গিয়ে। অপর দিকে ছেলের মৃত্যু হয়েছে ভেবে হৃদক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা গেলেন এক বাবা হরনাথ।

সর্বশেষ ২০১১ সালের ২৪ নভেম্বর রাত ৯ টায় নয়নশীলের প্রয়াণ পর্যন্ত ৪৫টি মৃত্যু গুনতে হয়। সব মিলিয়ে ৪৫ জনের প্রাণের বিনিময়ে রচিত হয় মিরসরাই ট্র্যাজেডী। ৪৫ জনের মৃত্যুর ঘটনায় ৮ ডিসেম্বর চালক মো. মফিজুর রহমান ওরফে মফিজ উদ্দিনকে দুটি ধারায় মোট ৫ বছরের সশ্রম কারাদন্ড দিয়েছে আদালত।

মিরসরাই ট্র্যাজেডির চার বছর পার হয়ে গেলেও এখনো আলোর মুখ দেখেনি স্মৃতি স্তম্ভ ‘অন্তিম’। ঘটনাস্থলে নির্মানের জন্য গত বছরের ১০ জুলাই ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন গৃহায়ন ও গনপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন।

এদিকে ট্রাজেডিতে নিহত শিক্ষার্থীদের স্মরণে আবুতোরাব বহুমূখী উচ্চ বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ১১ জুলাই দিনব্যাপী কর্মসূচী রয়েছে। কর্মসূচীর মধ্যে রয়েছে সকাল দশটায় কালো বেইজ ধারণ ও শোক পাতাকা উত্তোলন, তারপরে নিহতদের স্মরণে বিশেষ দোয়া প্রার্থনা, সাড়ে দশটায় শোক র‌্যালী, সকাল ১১টায় স্মৃতিস্তম্ভ ‘আবেগ’ ও ‘অন্তিম’ এ পুষ্পস্তবক অর্পন, বিকেল ৩ টায় শিক্ষার্থীদের স্মরণে আলোচনা সভা এবং নিহতদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে দোয়া প্রার্থনা। সর্বশেষ ইফতার ও জেয়াফত। এছাড়াও নিহতদের স্মরণে আবুতোরাব উচ্চ বহুমূখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত স্মারক গ্রন্থ ‘অসমাপ্ত জীবনের গল্প’ এর মোড়ক উন্মোচন করা হবে।

এছাড়া আগামী ১৩ জুলাই মিরসরাই ট্র্যাজেডি উদযাপন পরিষদের উদ্যোগে নিহতদের স্মরণে কোরআনখানী, মিলাদ মাহফিল, সনাতন ধর্মাবলম্বী নিহত ছাত্রদের স্মরণে প্রার্থনা, স্মৃতিফলক ‘আবেগ’ এ পুষ্পস্তবক অর্পণও স্মরণ সভার আয়োজন করা হয়েছে।






মন্তব্য চালু নেই