মেইন ম্যেনু

দর্জির মজুরি না দিলে সম্মান বাড়ে!

আপনি দর্জির কাছ থেকে পোশাক বানিয়েছেন। কিন্তু তাকে মজুরি দেবেন না। বরং মজুরি চাইলে তাকে শাস্তির আওতায় আনবেন। সভ্য সমাজে এমনটি কল্পনাতীত। অন্তত আপনি যদি অন্যেরটা মেরে না খাওয়ার স্বভাবের হয়ে থাকেন, তাহলে দর্জিকে তার কাজের পারিশ্রমিক অবশ্যই দেবেন। নিদেনপক্ষে, নিজের সম্মান রক্ষার্থে। আপনি দিতে না চাইলেও দর্জি ব্যাটা কিন্তু আপনাকে সহজেই রেহাই দেবে না।

দর্জিকে দিয়ে কাজ করিয়ে তার মজুরি না দেওয়ার ঘটনা সাধারণ মানুষের মধ্যে হলেও না হয় মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু এই ঘটনা যদি কোনো রাজপুত কিংবা রাষ্ট্রীয় প্রধান করেন, তাহলে কেমন হবে!

কেউ এমন কাজ করলে তার প্রতি ছি ছি রটবে। খোলা চোখে এটি স্পষ্টতই অন্যায়, দৃষ্টিকটু, ন্যায়বিরুদ্ধ। তবে এমনটিই একসময় প্রথা ছিল ইংরেজ ভদ্রলোকদের মাঝে। দর্জির বিল পরিশোধ করায় অস্বীকৃতি জানানোকে তারা ‘সম্মানজনক’ ঘটনা বলে মনে করতেন। এমনকি অনেক সময় ওই দর্জিকে শাস্তিও দেওয়া হতো। দর্জি মজুরির জন্য তাদের পেছন পেছন ঘুরবে, হাত পাতবে, কান্নাকাটি করবে, আর এতে মান বাড়বে ওই ‘ভদ্রলোকের’।

33

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন ব্রিটিশ নেতা উন্সটন চার্চিল

খুব বেশি দিন আগের কথা নয়। এইতো গেল শতাব্দীতেও ইংরেজ প্রতাপশালী ব্যক্তিবর্গের মাঝে এমন রীতির প্রচলন ছিল। এসব ব্যক্তির তালিকায় রয়েছেন ব্রিটেনের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী উন্সটন চার্চিল, রাজা সপ্তম এডওয়ার্ড, এমনকি ঔপন্যাসিক চার্লস ডিকেন্সের ছেলেও।

ইংল্যান্ডের সরকারি ও ঐতিহাসিক দলিল-দস্তাবেজের সংরক্ষণাগার ঘেঁটে থেকে এমন তথ্যই পাওয়া গেছে।

হেনরি পোল অ্যান্ড কোং নামের লন্ডনের বিখ্যাত টেইলার্সের আর্কাইভ ঘেঁটে জেমস শেরউড নামের এক ইতিহাসবিদ জানান, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন ব্রিটিশ নেতা চার্চিল তার পোশাক বানাতেন হেনরি পোল অ্যান্ড কোং টেইলার্স থেকে। এই টেইলার্সের স্বত্বাধিকারী হেনরি পোল চার্চিলের কাছে ১৯৩৭ সালে মোট ১৯৭ পাউন্ড মজুরি পাওনা ছিলেন, বর্তমানে যার মূল্য ১২ হাজার পাউন্ড। চার্চিল পোলের মজুরি দিতে বেশ কয়েকবার অস্বীকৃতি জানান, পোলকে শাস্তির ভয় দেখান এবং এমনকি পোলের আঙিনা মাড়ানোও বন্ধ করে দেন।

মজুরি প্রসঙ্গে চার্চিলের কথা বলতে গিয়ে তার দর্জি বলেন, ‘তিনি (চার্চিল) মনে করতেন এটি নৈতিক এবং ভালো কাজ। তিনি ভাবতেন, আমরা তার জন্য পোশাক বানাতেই থাকব। কিন্তু আমাদের যে অর্থের প্রয়োজন সে বিষয়ে তার খেয়াল ছিল না। তিনি কখনো বকেয়া পরিশোধ করতেন না এবং মজুরি চাইলে কখনোই ফিরে আসতেন না- তিনি কখনোই আমাদের ক্ষমা করতেন না।’

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও তার পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ সরকার পরিচালনাকারী চার্চিলের এই দর্জিকে মজুরি পরিশোধ না করার স্বভাব তার বন্ধু মহলে বেশ প্রশংসিত হতো।

তবে বকেয়া থাকা সত্ত্বেও পোল কখনো চার্চিলের পোশাক বানানো বন্ধ করেননি।

‘এ টেল অব টু সিটি’র মতো বিখ্যাত উপন্যাসের জন্মদাতা ঔপন্যাসিক চার্লস ডিকন্সের ছেলেও দর্জির মজুরি মেরে দেওয়াটাকে সম্মানের চোখে দেখেছিলেন। তিনি তার দর্জির পাওনা পরিশোধই করেননি। শেষ পর্যন্ত ছেলের মান বাঁচাতে ও দর্জির মুখের দিকে চেয়ে বাবা ডিকেন্সই সেই বকেয়া পরিশোধ করেছিলেন।

22

রাজা সপ্তম এডওয়ার্ড

১৮৭০ সালে ওয়েলসের প্রিন্স থাকাকালীন রাজা সপ্তম এডওয়ার্ড ‘মাঝে মাঝে’ তার দর্জির বিল পরিশোধ করতেন। কয়েক বছরে সেই পাওনা বড় অঙ্কে গিয়ে পৌঁছেছিল। অবশেষে দর্জি নিরুপায় হয়ে যখন একটি বিল এডওয়ার্ডের কার্যালয়ে পাঠান, ‘দর্জিকে মজুরি না দেওয়ার প্রথা’ ভাঙতে হয়েছিল প্রিন্স অব ওয়েলসকে। তবে ২০ বছর পর এডওয়ার্ড যখন রাজা হন, তিনি পুরোনো প্রথায় ফিরে যেতে ভুল করেননি।

দর্জির মজুরি দিতে ‘অস্বীকৃতি’ জানানোর তালিকায় অন্যান্য বিখ্যাত লোকের মধ্যে রয়েছেন লেখক ব্রাম স্টোকার, আধুনিক জার্মানির জনক প্রধানমন্ত্রী প্রিন্স অটো ভন বিসমার্ক, আমেরিকার ব্যাংকার জে পি মরগান, ইথিওপিয়ার সম্রাট হেইলি সেলাসি।

11

আমেরিকার বিখ্যাত ব্যাংকার জে পি মরগান

হেনরি পোল ও কোং এর প্রতিষ্ঠাতা হেনরি পোল মারা যাওয়ার আগে বেশ আর্থিক দুর্দশায় ছিলেন। তাকে ‘খ্যাতির বিড়ম্বনায়’ পড়তে হয়েছিল এবং তিনি বহু হাই-প্রোফাইল লোকের কাছে বহু অর্থ পাওনা ছিলেন।

মৃত্যুর আগে লেখা পোলের এক চিঠিতে দেখা যায়, তিনি লিখেছেন, ‘মৃত্যুর পর আমার খুব বেশি কিছু অবশিষ্ট থাকবে না। আমি একজন যুবরাজ ও বিভিন্ন বিখ্যাত লোকের জন্য কাজ করেছি। কিন্তু আমাকে দারিদ্র্য নিয়ে মরতে হচ্ছে।’






মন্তব্য চালু নেই