মেইন ম্যেনু

দিনমজুর থেকে কোটিপতি

আমি পলাশবাড়ীর গফুর। পুরো নাম আব্দুল গফুর। বয়স ৫০ বছর। গাইবান্ধা জেলার পলাশবাড়ী উপজেলা শহর থেকে তিন কিলোমিটার পশ্চিমে সুলতানপুর বড়ইপাড়া গ্রামে আমার বাড়ি। আমি বেশি লেখাপড়া করতে পারিনি। অষ্টম শ্রেণি পাস করেছি। আমার স্ত্রী আছিয়া বেগম গৃহিণী। বড় ছেলে আতিয়ার রহমান (৩২) নবম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছে। দ্বিতীয় ছেলে ফারুক হাসান (২৫) উচ্চমাধ্যমিক পাস করেছে। তারা আর লেখাপড়া করেনি। একমাত্র মেয়ে মুক্তা রানী অষ্টম শ্রেণিতে লেখাপড়া করছে।
আমি একসময় দিনমজুরের কাজ করতাম। প্রতিদিন কাজ পেতাম না। এ-গ্রাম ও-গ্রাম কাজ খুঁজেছি। কাজ করলে মজুরি পেতাম দৈনিক ১০০ টাকা। তা দিয়ে সাত সদস্যের সংসার চলত না। কিন্তু এখন আমি কোটিপতি। ভাবতে অবাক লাগে। আপনারা হয়তো জানেন না, একসময় কোটিপতি হওয়ার লোভে এক দালালকে পৈতৃক সূত্রে পাওয়া জমি বিক্রি করে তিন লাখ টাকা দিয়েছিলাম। স্বপ্ন দেখেছিলাম ছেলে ফারুক হাসানকে বিদেশে পাঠিয়ে কোটিপতি হব। কিন্তু ওই দালাল আমার টাকা আত্মসাৎ করে। জমি হারিয়ে আমি নিঃস্ব হয়ে পড়ি। তখন দিনমজুরের কাজ বেছে নিই।
দিনমজুরের কাজ করে যা আয় হতো, তা দিয়ে দৈনিক সাংসারিক খরচে শেষ হয়ে যেত। তাই সঞ্চয়ের সিদ্ধান্ত নিই। স্থানীয় একটা সঞ্চয় সমিতির সদস্য হই। অতিরিক্ত কাজ করে সমিতিতে সাপ্তাহিক সঞ্চয় দিই। ২০০৩ সালে সমিতি থেকে সাত হাজার টাকা ঋণ নিয়ে একটি ছোট গাভি কিনি।
২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের কথা। একদিন আমার গ্রামের এক গৃহস্থের সঙ্গে পলাশবাড়ী উপজেলা শহরের একটি হোটেলে চা খেতে যাই। সেখানে গিয়ে জানতে পারলাম, হোটেল মালিক দুলু ভাইয়ের গরুর খামারের দুধ দিয়ে হোটেল চলে। দুলু ভাই নেপিয়ার জাতের ঘাস চাষও করেন। ওই দিনই তাঁর গরুর খামার ও ঘাসের জমি দেখতে যাই।
ওই দিন রাতে বাড়ি ফিরে ঘাস চাষের কথা ভাবতে থাকি। ঘাস চাষ করলে গরু খাবে, গরু খেলে দুধ বেশি হবে, দুধ বিক্রি করলে টাকা হবে। শুয়ে শুয়ে প্রতিজ্ঞা করি, দুলু ভাই পারলে আমি কেন পারব না। আমিও তো রক্ত-মাংসের মানুষ। আর অনুভব করি ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়ে কোটিপতি হওয়ার লোভ আমাকে দিনমজুর বানিয়েছে।
পরদিনই উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ে যাই। ওই দিনই আমি প্রাণিসম্পদ কার্যালয় থেকে নেপিয়ার জাতের ঘাসের চারা সংগ্রহ করি। কাটিং পদ্ধতিতে প্রথমে নিজের ৫ শতক বসতভিটায় ঘাস লাগাই। এক মাস পর পর তিন বছর পর্যন্ত ঘাস কাটা যায়। এদিকে গাভিটি একটি বাছুর দেয়।
প্রথমে নিজের গাভিকে ঘাস খাওয়ানো শুরু করি। গাভির দুধ বাড়তে থাকে। একদিকে দুধ, অন্যদিকে ঘাস বিক্রির আয়। ব্যবসা বেশ লাভজনক হতে থাকে। ধীরে ধীরে আমি ঘাস চাষের পরিমাণ বাড়াতে থাকি।
বর্তমানে আমি ১৬ বিঘা জমিতে নেপিয়ার জাতের ঘাস রোপণ করেছি। এর মধ্যে আট বিঘা নিজের, আট বিঘা বন্ধক নেওয়া। এক বিঘা জমিতে উৎপাদন খরচ পড়েছে ১০ হাজার টাকা। এক বিঘা জমি থেকে তিন বছর ঘাস পাওয়া যাবে। তিন বছরে আয় হবে তিন লাখ টাকা। প্রতি মাসে খরচ বাদে ঘাস বিক্রি করে আমার মাসিক আয় ৯০ হাজার টাকা। তবে প্রতি মাসে জমিতে পানি সেচ ও ইউরিয়া সার দিতে হয়।
আগে ছিল ১০ শতক বসতভিটা। এখন ঘাস ব্যবসার আয় দিয়ে আমি ২০ শতক বসতভিটার মালিক। আমার বাড়িতে এখন ১০৫ হাত দৈর্ঘ্যের আধা পাকা ঘর। এই ঘরের তিনটি কক্ষে গড়ে তুলেছি গরুর খামার। বর্তমানে আমার খামারে ফ্রিজিয়ান জাতের ১৫টি গাভি আছে। এসব গাভি দৈনিক ৬০ কেজি দুধ দিচ্ছে। দুধ বিক্রি করেও আয় হচ্ছে। ঘাসের জমিতে পানি সেচের জন্য দুটি শ্যালো মেশিন কিনেছি। এ ছাড়া ৫০-৬০টি হাঁস-মুরগি, ছয়টি ছাগল, চারটি ভেড়া আছে।
আমার বাড়িতে বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি। কিন্তু আমি সোলার বিদ্যুৎ নিয়েছি। বাড়িতে রয়েছে দুটি রঙিন টেলিভিশন। ঘাস বিক্রির টাকা আদায় ও যোগাযোগের সুবিধার জন্য দুটি মোটরসাইকেল ও পাঁচটি রিকশাভ্যান কিনেছি। প্রতিজনের মাসিক বেতন পাঁচ হাজার টাকা হিসাবে পাঁচজন কর্মচারী আছেন। তাঁরা প্রতিদিন জমি থেকে ঘাস কেটে পলাশবাড়ী, ঢোলভাঙ্গা, ধাপের হাট, মাঠের হাট ও গাইবান্ধা শহরের বাজারে বিক্রি করেন। আমি নিজেও হাটবাজারে ঘাস বিক্রি করি। আমার দুই ছেলেও ঘাস বিক্রির কাজে সহায়তা করে। চার কেজি ওজনের প্রতি আঁটি ঘাস বর্তমান বাজারে ১০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে দিনমজুর থেকে বর্তমানে আমি প্রায় এক কোটি টাকার বেশি সম্পদের মালিক হয়েছি। আমার স্বপ্ন ব্যাপক হারে ঘাস চাষ করে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত হব।
যখন অন্যের জমিতে কামলার কাজ করেছি, তখন আমাকে কেউ দাম দিত না। এখন আমার টাকাপয়সা হয়েছে, এখন সবাই সম্মান করে, খাতির করে। আগে যারা আমাকে গফুর মিয়া বলে ডাকত, তারা এখন ডাকে গফুর ভাই বলে। কেউ কামলা হয়ে জন্মে না, কর্মদোষে কামলা হয়। বুদ্ধি খাটিয়ে কাজ করলে সবাই আমার মতো হতে পারবে।
বাণিজ্যিক ভিত্তিতে গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি চাষের মাধ্যমে কৃষি উন্নয়নে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য ২০১৪ সালে আমি বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কার পাই। পুরস্কার হিসেবে আমাকে একটি সনদ ও একটি রৌপ্যপদক দেওয়া হয়। আমার সাফল্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে সুলতানপুর বড়ইপাড়া ও আশপাশ গ্রামের অর্ধশতাধিক কৃষক ঘাস চাষ করেন। তাঁরাও স্বাবলম্বী হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে সুলতানপুর বড়ইপাড়া গ্রামের কৃষক মাসুদ মিয়া আমার সাফল্য দেখে তিন বছর ধরে এক বিঘা জমিতে ঘাস চাষ করছেন। প্রতি মাসে তাঁর সাত হাজার টাকা আয় হচ্ছে। একই গ্রামের কৃষক সিরাজুল ইসলাম গত বছর দুই বিঘা জমিতে ঘাস চাষ করেন। নিজের গাভিকে খাওয়ানোর পরও তিনি প্রতি মাসে প্রায় ১৪ হাজার টাকার ঘাস বিক্রি করছেন।
ওই গ্রামের অপর কৃষক আবদুর রশিদ আগে ভেবেছিলেন, আমি নাকি পাগলামি করছি। পরে আমার আয়ের কথা শুনে চার বছর আগে তিনি তিন বিঘা জমিতে ঘাস চাষ করেন। ঘাস বিক্রির আয় দিয়ে সংসারের দায়দেনা মিটিয়ে এক বিঘা জমি বন্ধক নিয়েছেন তিনি। পার্শ্ববর্তী কাশিয়াবাড়ী গ্রামের দেলোয়ার হোসেন আমার পরামর্শে দুই বিঘা জমিতে ঘাস চাষ করেন। নেপিয়ার জাতের ঘাস খাওয়ানোর কারণে তিনি দুই বছর ধরে তাঁর গাভি থেকে বেশি দুধ পাচ্ছেন। পাশাপাশি তিনি ঘাস বিক্রি করেও টাকা আয় করছেন। এমনকি জয়পুরহাট ও লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রামের অনেক কৃষক আমার সাফল্য দেখে ঘাস চাষ করছেন। প্রতিদিন অনেক কৃষক আমার কাছে ঘাস চাষের পরামর্শ নিতে আসেন। ­­






মন্তব্য চালু নেই