মেইন ম্যেনু

দিনাজপুরে ধুমধাম আয়োজনে ব্যাঙের বিয়ে, আমন্ত্রিত অতিথি ৫০০

শাহ্ আলম শাহী, দিনাজপুর থেকেঃ পাচঁ শতাধিক অতিথি’র আপ্যায়ন, দম্পতিকে অর্থসহ বিভিন্ন ধরনের উপহারসামগ্রী প্রদান, ছায়ামন্ডপ, পুষ্পমাল্য, গায়েহলুদ, আশীর্বাদ, ধান-দূর্বা, নাচ-গান,মাইকের বাজনা আর ধুমধাম আয়োজনের মধ্যদিয়ে দিনাজপুরে অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো ব্যাঙের বিয়ে। এ বিয়েকে ঘিরে যেমন ছিলো উৎসবের আমেজ তেমনি ছিলো বেদনার নীল। অনাবৃষ্টির কারণেই এই বিয়ের আয়োজন। একটু বৃষ্টি’র আশায় পৌরানিক গল্পে অবতীর্ন। কেউ কেউ বলছে,আবহমান গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্য।

এ ব্যতিক্রম ব্যাঙের বিয়ের আয়োজন ছিলো দিনাজপুরের বিরল উপজেলার ৬ নম্বর ভান্ডারা ইউনিয়নের ভারাডাঙ্গী বেতুরা পশ্চিমপাড়া গ্রামে। শনিবার সকাল থেকে দিনব্যাপী চলে এ বিয়ের আয়োজন। বিয়ের উৎসবে গ্রাামের মানুষ।

সবার বিশ্বাস, ব্যাঙের বিয়ে দিলেই অনাবৃষ্টি কেটে যাবে। পর্যাপ্ত বৃষ্টি হবে।

বিয়েকে গ্রামবাসীসহ ৫ শতাধিক আমন্ত্রিত অতিথি উপস্থিত ছিলেন। রং মেখে নেচে-গেয়ে আনন্দ-ফুর্তি’র মাধ্যমে ব্যাঙের বিয়ে দেয়া হয়।

7654

এলাকার কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, যে বছর তাঁদের এলাকা অনাবৃষ্টির কবলে পড়ে, সেই বছরই তাঁরা বৃষ্টির জন্য ব্যাঙের এই ধরনের বিয়ের আয়োজন করে থাকেন। স্থানীয়ভাবে এটিকে ‘ব্যাঙ্গা-ব্যাঙ্গির বিয়ে’ বলা হয়। এক’শ বছরেরও বেশি সময় ধরে বংশপরম্পরায় তাঁরা এই রীতি পালন করে আসছেন বলে দাবি করলেন তাঁরা। তাঁদের বিশ্বাস, ব্যাঙের বিয়ে দিলে বৃষ্টি হয়।

দুপুরে গিয়ে দেখা গেল, গ্রামের শতাধিক নারী-পুরুষ জড়ো হয়ে দ’ুটি ব্যাঙকে বিয়ে দিতে গায়েহলুদের আয়োজন করেছে। পাশেই চলছে খাওয়াদাওয়ার জন্য রান্নার আয়োজন। বিয়ের অনুষ্ঠান ঘিরে ঢাকঢোলের বাজনার সঙ্গে চলছে কিশোর-তরুণদের দল বেঁধে নাচ।

4567

শেফালি রানি রায় (৬০) জানান, ব্যাঙের বিয়ে উপলক্ষে গ্রামবাসী বর ও কনে দুই পক্ষে বিভক্ত হয়েছে। তিনি নিজে সেজেছেন বরের মা। আরেক গৃহবধূ ডালো রানি রায় (৪০) হয়েছেন কনের মা। উভয় পক্ষ নিজ নিজ পক্ষে গায়েহলুদের আয়োজন করেন। বর ও কনে পক্ষের অতিথিরা একে অন্যের আয়োজনে অংশ নেয়। এরপর শুরু হয় মূল বিয়ের কার্যক্রম।

সেখানে দেখা যায়, বড় বড় দুটি সোনা ব্যাঙকে গোসল করানোর পর বসানো হয় বিয়ের পিঁড়িতে। মালাবদলসহ বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতায় সম্পন্ন হয় বিয়ের পর্ব। বিয়ে শেষে বর-কনেকে বসানো হয় আরেকটি স্থানে। সেখানে বরপক্ষ ও কনেপক্ষ উভয়েই ধান-দূর্বা দিয়ে শুভকামনা জানায় এদের। অনেকেই এদের অর্থসহ বিভিন্ন উপহার দেন।

এলাকার অশীতিপর বৃদ্ধা তেনিয়া বর্মণের ভাষ্য, তাঁর জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই এই ধরনের বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা তিনি দেখে আসছেন। তাঁর বাবা যখন বেঁচে ছিলেন, তিনিও তাঁকে বলতে পারেননি কবে, কখন বা কত সাল থেকে গ্রামে ব্যাঙের বিয়ের প্রচলন হয়েছে। বংশপরম্পরায় এটা চলছে।

গ্রমের প্রবীন ব্যক্তি বজেন্দ্র বর্মণ জানান, বৃষ্টি নেই। জমিতে চাষ দেওয়া যাচ্ছে না। যে জমিগুলোতে চারা রোপণ করা হয়েছে, সে জমিগুলো পানির অভাবে ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। এ কারণে যাতে বৃষ্টি আসে সে জন্য ব্যাঙের বিয়ের আয়োজন। গ্রামের কিশোর ও যুবকরা এক সপ্তাহ ধরে গ্রামের বাড়ি বাড়ি গিয়ে নিচে-গেয়ে অর্থ, চাল, মরিচ, পিঁয়াজ, রসুন, আদা, তেল সংগ্রহ করেন। এ সময় প্রতিটি বাড়িতে ব্যাঙের বিয়ের আমন্ত্রণ ও নিমন্ত্রণ জানানো হয় ।

বেতুরা পশ্চিমপাড়া গ্রামের বাঁশতলায় সাজানো মাড়োয়ায় সকাল থেকে গ্রামবাসী আসতে শুরু করেন। বাজানো হয় মাইক। রং ও কাদা মেখে শুরু হয় নাচ-গান। দুপুর সাড়ে ১২টার সময় বর ব্যাংকুর মা শেফালি রানি রায় (৬০) ও কনে মেনকার আরেক গৃহবধূ ডালো রানি রায় (৪০) বর-কনেকে নিয়ে হাজির হন মাড়োয়ায়। এ সময় পাশেই চলছিল রান্না-বান্নার কাজ। শুরু হয় নাচ-গান। গ্রামের মানুষ বর-কনেকে দেখে টাকাসহ বিভিন্ন প্রকার উপহার দিয়ে খিচুড়ি খেয়ে যান।

3456789

মাড়োয়ার আশপাশে চলে লাঙল দিয়ে জমি চাষ। শুকনার মধ্যে লাগানো হয় ধানের চারা। এ যেন এক অন্যরকম উৎসব। মুসলমান-হিন্দু সকল সম্প্রদায়ের সব বয়সের মানুষের মিলনমেলা। বিকেলে গরু’র গাড়িতে করে কনের বাসায় যাওয়া হবে কনেকে শ্বশুরবাড়িতে আনার জন্য।’

এ ব্যাপারে তেলিয়া বর্মণ (৮২) বলেন, ‘আমরা গ্রামবাসী সবাই মিলে সৃষ্টিকর্তাকে খুশি করার জন্য ব্যাঙের বিয়ের আয়োজন করেছি। ভগবান অবশ্যই দেখছেন আমরা বৃষ্টির জন্য এ আয়োজন করেছি। অবশ্যই বৃষ্টি হবে।’

আদিবাসী নেতা কুদ্দুস সরকার জানায়, দিনাজপুরে এখন চলছে অনাবৃষ্টি। ক্ষেতে পানি না থাকায় কৃষকের মধ্যে শুরু হয়েছে হাহাকার। মানুষ বিকল্প ব্যবস্থায় আমন চারা রোপন করছে। জমি ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। বৃষ্টি না হওয়ায় জমিতে আমন চারা জ্বলে যেতে শুরু করেছে। এ কারণে এই ব্যাঙের বিয়ে। ব্যাঙের বিয়ে হলে বৃষ্টি হয়। এমন ধারণা অনেকের।






মন্তব্য চালু নেই