মেইন ম্যেনু

দিল্লির পানি মাফিয়ার হাতে

কথায় আছে বিশুদ্ধ পানির অপর নাম জীবন। আর এই পানির জন্যই আবার জীবন দিতে হচ্ছে ভারতের রাজধানী দিল্লীর বাসিন্দাদের। নামে রাজধানী হলেও এর শহরতলী এলাকাগুলোতে ভালো পানির ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মুঘল আমলে শাহ সুজার সময়ে এই দিল্লিতেই ভয়াবহ পানি সঙ্কটে শহরের বাসিন্দাদের নর্দমার পানিও খেতে হয়েছিল। সেসময় পানির এই সঙ্কট থেকে সৈন্যদলকে বাঁচানোর জন্য শাহ সুজা তার দলবল নিয়ে চলে গিয়েছিলেন উত্তর প্রদেশে। বর্তমান দিল্লিবাসীর অবস্থা অতটা করুণ না হলেও, পানি মাফিয়াদের কল্যাণে শহরের বাসিন্দাদের পানিগত প্রাণ আজ ওষ্ঠাগত।

শহরতলী অঞ্চলে যে কয়টি গভীর নলকূপ আছে তাও প্রয়োজনের তুলনায় এতই সামান্য যে, খাবার পানি পেতেই হিমসিম খেতে হয় এই এলাকার বাসিন্দাদের। আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ব্যবসা শুরু করে দিয়েছে একদল ব্যবসায়ি। পানি নিয়ে তাদের এই কার্যকলাপ কোন মাফিয়াচক্রের থেকেও কম নয়। ২০১৫ সালে দিল্লিতে বন্যা পরিস্থিতি ব্যপকভাবে অবনতি হওয়ার পর সুষ্ঠু পানি সরবরাহ ব্যবস্থার কোন উদ্যোগই নেয়নি রাজ্য সরকার। আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে গড়ে ওঠেছে কিছু পানির দালাল বা মাফিয়া দল।

দিল্লির একটি ব্যস্ততম এলাকা সঙ্গম বিহার। এখানে হাজার লোকের বসবাস। প্রতিদিন সকাল থেকে শুরু করে গোটা দিনের সম্পূর্ণ কাজ সারতে প্রচুর পানির প্রয়োজন হয়। আর সরকারি ট্যাঙ্কগুলোর এই পানির জন্য তাদের সকাল থেকে রাত্রি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। অবশেষে বেলা গড়িয়ে ট্যাঙ্কগুলো ঠিকই আসে। কিন্তু এর মাঝে কতজন পানি পেল আর কত জন পানি পেল না এর হিসাব থাকে না কোন সরকারি খাতায়।

তাই সরকারের চোখের সামনেই গড়ে ওঠেছে কিছু মাফিয়া দল। যারা শুধুমাত্র সঙ্গম বিহারে নয়, এই এলাকার বাইরেও বিভিন্ন জায়গায় পানি সরবরাহ করে থাকে। তবে এই পানি সরবরাহ যে তারা বিনা পয়সায় করছে তা কিন্তু নয়। তাহলে কিভাবে তারা পানি দিচ্ছে সে ব্যাপারে একটু জানা যাক।

সঙ্গম বিহারের এক বাসিন্দার ভাষ্যমতে, ‘আমাকে প্রতিদিন পানির জন্য লম্বা লাইনে দাড়িয়ে থাকতে হয়। এমনও দিন গেছে যখন আমার ঘরে খাওয়ার জন্য এক ফোটা পানিও ছিল না। তাই আমি বাধ্য হয়ে টাকা দিয়ে পানি কিনে নেই। তারা আমার ঘরের কলের সঙ্গে ট্যাঙ্কের একটি পাইপ লাগিয়ে দেয় এবং এভাবে আমরা পানি পাই’। তবে এইভাবে পানি কিনেও যে তারা খুব একটা শান্তিতে আছেন তা কিন্তু নয়। পানির জন্য তাদের গুনতে হয় বেশ চড়া মূল্য।

আর একমাসের টাকা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দিতে ব্যর্থ হলে সঙ্গে সঙ্গে পানির লাইন কেটে দেয়া হয়, কোনো বাধা নিষেধের তোয়াক্কা না করেই। এছাড়াও রয়েছে কিছু ব্যাক্তিগত কুয়া যেখানে থেকেও পানি সংগ্রহ করা যাবে কিন্তু এই পানির জন্য স্থানীয় বাসিন্দাদের ব্যয় করতে হবে প্রতি মাসে দুহাজারেরও বেশি রুপি। যেই এলাকার বাসিন্দারা টাকার জন্য সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে পারে না বা যে এলাকার বাসিন্দাদের মাসিক আয় নয় হাজার টাকা তাদের পক্ষে এত টাকা দিয়ে পানি কেনা কিভাবে সম্ভব।

এমন অবস্থায় দেশটির সরকারের দিকে একটু তাকিয়ে দেখা যাক। এই সব মানুষদের জন্য সরকারের লোকজন যেন নিরব দর্শক। দৃশ্য উপভোগ করা ছাড়া তাদের যেন আর কিছুই করার নেই। গত বছর নির্বাচনের সময় দিল্লির আম জনতা পার্টি নানারকম প্রতিশ্রুতি দিলেও নির্বাচন শেষে সব প্রতিশ্রুতিই হারিয়ে যেতে থাকে।

সঙ্গম বিহারের প্রতিনিধিত্বকারী দিনেশ মোহানিয়া দিল্লির একটি বৈঠকে বলেছেন, ‘পানির সমস্যা এবং পানি মাফিয়া চক্রের এসব কার্যকলাপ এখনতো একটি সাধারণ ব্যপার। তবে স্বাধীনতার ৬৫ বছর পরেও আমরা আমাদের জনগণকে পানি দিতে পারি না এটা সত্যিই লজ্জাজনক’।

উল্লেখ্য যে, দিল্লির পানি সরবরাহ ব্যবস্থা নির্ভর করে যথাক্রমে যমুনা, গঙ্গা এবং সুতলেজ নদীর ওপর। কিন্তু উত্তর ভারতের অপরিকল্পিত ব্যবস্থার কারণে এবং অধিক জনসংখ্যার কারণে পানির সুষম বন্টন সম্ভব হচ্ছে না। আর পাইপ দিয়ে যতটুকু সরবরাহ করা যায় তাও প্রতিদিন কয়েক ঘন্টা করে চালানো সম্ভব হয় কিন্তু তাতে প্রয়োজনের তুলনায় কিছুই মেলে না।

এ বিষয়ে দিনেশ মোহানিয়া আরো বলেন, ‘দিল্লির পানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের এ ব্যাপারে কোন নজর নেই বললেই চলে। আমরা নিজেরা নিজেদের উদ্যোগে পাইপলাইন তৈরি করতে পারবো, আমরা নেটওয়ার্ক তৈরি করতে পারবো, কিন্তু আমরা পানি কীভাবে তৈরি করবো’।

বামে






মন্তব্য চালু নেই