মেইন ম্যেনু

দুই চাকার দারুণ গাড়ি ‘সাইকেল’ সম্পর্কে কিছু অজানা তথ্য

প্রশ্ন জাগাটা স্বাভাবিক, এতো জনপ্রিয় বাহনটির আবিষ্কার কবে, কোথায়? কেইবা এটা বানালো? নানা জনের নানা মত। ফরাসিদের দাবি বাইসাইকেল তাদের আবিষ্কার। একই দাবি জার্মান, স্কটিশ ও ইংরেজদেরও। কেউ একচুল দাবি ছাড়তে চায় না বাইসাইকেল আবিষ্কার নিয়ে। এমনকি অনেক সময় আমেরিকানরাও হাঁক ছাড়ে সাইকেল তাদেরই উদ্ভাবনী ক্ষমতার ফসল।

আবার আজকের দু’চাকার সাইকেল দেখলে কে বলবে আগের দিনে সাইকেল এরকম ছিলো না!

প্রথম যুগের সাইকেল দেখলে আবাক হতে হয়। আসলে অনেকগুলো বিবর্তনের মধ্য বাইসাইকেলকে আজকের রূপ পেয়েছে। সেই গল্পই বলবো আপনাদের-

ব্যারনের হাঁটার মেশিন (ড্রেইজিন) : কিছু তথ্যে দেখা যায় ঘোড়ার গাড়ি নির্মাতা ফরাসি দুই পিতা-পুত্র পিয়েরে ও আর্নস্ত মাইকক্স প্রথম বাইসাইকেল আবিষ্কার করেন ১৮৬০ সালে। কিন্তু আধুনিক ইতিহাসবিদরা দেখাচ্ছেন, সাইকেলের ইতিহাসটি তারও আগের। যদিও তারা এটা স্বীকার করেন যে, সাইকেলের প্যাডেল ও ক্রাঙ্ক- এই দুটি আর্নস্ত মাইকক্সেরই উদ্ভাবণ, ১৮৬১ সালে।

১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে জার্মানির ব্যারন ভন ড্রাইস (Baron Von Drais) নামক এক ব্যক্তি সর্বপ্রথম দুই চাকার সাইকলে তৈরি করেন। নিজের নাম অনুসারে এর নাম রাখেন ড্রাইসাইন (Draisine) । এতে দুটো চাকাকে কাঠের তৈরি একটা দণ্ড দিয়ে জুড়ে দেওয়া হয়। সাইকেল চালক এর ওপর বসে পা দিয়ে মাটিতে ঠেলা মেরে মেরে সামনের দিকে এগিয়ে যেতো। সামনের চাকার সাথে থাকতো একটা হাতল যা দিয়ে ডানে, বামে মোড়ে নেওয়ার ব্যাপারটা সম্পন্ন হতো। এর দাম এতো বেশি ছিলো যে, লোকে বলত ডানডি ঘোড়া (Dandy Horse)।

ড্রাইসাইন সাইকেল (Draisine Cycle) : ১৮৪০ খ্রিষ্টাব্দে এর যথেষ্ট উন্নতি সাধন করেন ম্যাকমিলন নামের এক ব্যক্তি। তিনি পেছনের চাকার সাথে প্যাডেল জুড়ে দেন। ১৮৬৫ খ্রিষ্টাব্দে ফ্রান্সের লালেমেন্ত (Lallement) নামক এক ব্যক্তি আরেক রকমের সাইকেল উদ্ভাবন করেন। এর সামনের চাকাতেই প্যাডেল থাকত। এই সাইকেলে চড়ে চালকেরা ভিষণ জোরে ঝাঁকুনি খেতো বলে লোকে এই সাইকেলকে হাড় ঝাঁকুনির যন্ত্র (Bone Shaker) বলা শুরু করলো। এর চাকা ছিল স্টিলের তৈরি। এ ভাবেই লোকে বুঝতে পেরেছিল যে, যদি চাকার আকার বড় হয়, তাহলে সাইকেলের গতি বেড়ে যাবে।

হাড় ঝাঁকুনির সাইকেল (Bone Shaker Cycle) : পরীক্ষামূলকভাবে তৈরি হলো এমন একটি সাইকেল যার সামনের চাকাকে খুব বড় আর পেছনের চাকাকে করা হলো খুব ছোট। সামনের চাকার ব্যাস হলো ১ দশমিক ৫ মিটার আর পেছনের চাকার ব্যাস হলো শূন্য দশমিক ৩ মিটার। এরকম সাইকেলে চড়তে গিয়ে চালকের সবসময় পড়ে যাওয়ার ভয় থাকত।

পরবর্তী সময়ে সাইকেলের অনেক উন্নতি সাধন হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দে আজকের দিনের এই নিরাপদ সাইকেল উদ্ভাবন হয় যার দুটি চাকাই সমান মাপের। চালকের বসার জন্য সিটও (আসন) থাকে। সময়ের সাথে সাথে এর আরো উন্নতি হয়েছে। আজকাল কত সুন্দর সুন্দর সাইকেল তৈরি হচ্ছে।

হাইহুইল বাইসাইকেল থেকে কিডস বাইসাইকেল : পুরোপুরি মেটালিক বাইসাইকেল এলো ১৮৭০ সালে। প্যাডেল দুটো সামনের চাকার সঙ্গে কোন রকম ফ্রি হুইলিং মেকানিজম ছাড়াই সংযুক্ত ছিল। টায়ারে এলো রাবারের আস্তরণ এবং অভ্যন্তর ভাগ লম্বা স্পোক দিয়ে জোড়ালো কাঠামো।

বাইসাইকেল মানে হলো দুই চাকা। আর প্রকৃত অর্থে হাইহুইলের প্রথম এই সাইকেলটির নামই হলো বাইসাইকেল। তখনকার তরুণদের মধ্যে সাইকেলের জনপ্রিয়তা ছিল বহুদিন, প্রায় ১৮৮০ পর্যন্ত। সে সময় তরুণদের গড়পড়তা ছয় মাসের আয়ের সমান ছিল এই সাইকেলটির দাম।

ধীরে ধীরে শুরু হলো আধুনিক বাইসাইকেলের বিবর্তন। এলো দি ভেলোস্পিড বা বোনশেকার, উঁচু চাকার হাইহুইল বাইসাইকেল এবং তারপর একই মডেলের ট্রাইসাকেল।

তবে সাইকেলে কেবল বড়রাই চড়বে, ছোটরা চড়বে না তাই কি হয়? তাই একটু দেরিতে হলেও ছোটদের সাইকেল এলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর অর্থাৎ প্রায় ঊনিশশো আঠারোর শেষ দিকে। মিড (Mead), সিয়ার্স রয়বাক (Sears Roebuck) এবং মন্টগমেরি ওয়ার্ড (Montgomery Ward)- এমন বেশ কিছু সাইকেল প্রস্তুতকারক সাইকেল ইন্ডাস্ট্রিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার ঘটালো নতুন ডিজাইন দিয়ে যেটাকে আজকের দিনে আমরা চিনি ‘ক্লাসিক’ বাইসাইকেল নামে।

ক্লাসিক সাইকেলের বৈশিষ্ট্য ছিল এই যে, এটি তৈরি হতো অটোমোবাইল ও মোটরসাইকেলের যন্ত্রাংশ দিয়ে। স্বাভাবিকভাবেই এ ধরনের সাইকেলগুলো ছিল অত্যন্ত আকর্ষণীয়, চমৎকার, জাঁকালো এবং সেকালের ভারিক্কি ডিজাইনের সাইকেলগুলোর মধ্যে অন্যতম।

আজকের দিনে এটা অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে যে, এখনকার ১৪ বছরের কোন ছেলে সাইকেলে যেসব কসরত দেখায়, প্রায় একই রকম কসরৎ দেখিয়েছে সেকালের ছেলেরাও!

১৯৫০ দশকের মাঝামাঝি সময়ে ক্লাসিকের ডিজাইনে জেট এয়ারক্রাফট, এমনকি রকেটের সরঞ্জামও ব্যবহার করা হয়েছিল। ষাটের দশকে এসে নতুন ডিজাইনে সাইকেলকে অনেকখানি পাতলা ও সরল করা হয়।

নানা ধরনের বাইসাইকেল : সাইকেল মোটামুটি ছয় ধরনের হতে পারে। ট্যুরিং, মাউন্টেইন, হাইব্রিড বা ক্রস, ইউটিলিটি, রেসিং বা স্পেশিয়ালিটি- এই ছয়টি টাইপ দিয়েই সাইকেল চেনা যায় এ যুগে। সহজ সরল বাধানো রাস্তায় চলার জন্য ব্যবহার করা হয় ট্যুরিং বাইসাইকেল। পাহাড়ি ঢালু এবং এবড়ো খেবড়ো পথে চলতে চাই মাউন্টেইন বাইসাইকেল।

এই দুই ধরণের সাইকেল অর্থাৎ ট্যুরিং ও মাউন্টেইন সাইকেলের ডিজাইন, প্রযুক্তি ও সুবিধা নিয়ে তৈরি হেয়েছে যে সাইকেল সেগুলো হাইব্রিড বা ক্রস বাইসাইকেল। বাজারে এখন এগুলো পাওয়া যায়।

দামেও সস্তা বাইসাইকেল ব্যবহৃত হয় মূলত মালামাল পরিবহনের জন্য, ছোটরাও এগুলো চালায়। সবচেয়ে হালকা সাইকেল হিসেবে সুনাম আছে রেসিং বাইসাইকেলের। বাতাস কেটে দ্রুত গতিতে চালানোর জন্য এগুলোকে হালকা করে তৈরি করা হয়।

বিশেষ প্রয়োজন মেটানোর জন্য অন্য কোন ডিজাইনে তৈরি সাইকেলকেই স্পেশালিটি বাইসাইকেল বলে। এর একটি উদাহরণ হতে পারে, ইলেকট্রিক বাইসাইকেল। এতে থাকে ব্যাটারি আর পেছনের চাকায় ছোট ইলেকট্র্রিক মোটর। এই মোটরের সাহায্যে সাইকেল চলে। কিন্তু উঁচুনিচু রাস্তায় চালকের প্যাডেল করারও দরকার পড়ে।

দুই চাকার দারুণ গাড়ি : দুই চাকার দারুণ একটা গাড়ি, চলে তেল পানি ছাড়াই বহুদূর, বহুদিন। মানুষের দুই পায়ের মতোই সাইকেলের চাকা দুটো। বাচ্চা যেমন হোঁচট খেয়ে হাঁটতে শেখে তেমনি সাইকেলে দুই চাকার উপর ভারসাম্য রেখে প্যাডেল করতে কতই না কসরৎ করতে হয় শুরুতে।

প্রথম দিকে সবাই ছোটখাটো আঘাত আঁচড় পেয়েই পোষ মানায় সাইকেলকে, তখন এটি হয়ে পড়ে শখের গাড়ি।

কিছুদিন আগ পর্যন্ত চীনকে বলা হতো ‘বাইসাইকেলের দেশ’। ছোট-বড় সবারই সাধারণ বাহন সাইকেল। এক বেজিংয়েই গড় পড়তায় প্রায় ৮০ লাখ সাইকেল রাস্তা দখল করে থাকতো।

সাইকেলে নেই কোন দুষণ, নেই রাস্তায় বাড়তি জায়গা দখল করে রাখার ঝক্কি। ভাঙা রাস্তা? তো কি হয়েছে? সাইকেলটা কাঁধে উঠিয়ে নিয়ে ভালো রাস্তার দিকে চলে যাওয়া যায়। মোটরগাড়ির মতো দামি নয় সাইকেল। এই বাহনটি দিয়ে দূর পথও পাড়ি দেওয়া যায়। তাই কেবল অ্যান্টার্কটিকা ছাড়া সব জায়গায় সব দেশেই কমবেশি জনপ্রিয় বাহন সাইকেল।

আমাদের বাংলাদেশের শহর অঞ্চলগুলোতে লোকজনের বেশি বেশি সাইকেল চালানোর প্রচলন হওয়া দরকার ছিল, বিশেষ করে ঢাকায়। কিন্তু তার বদলে এর প্রচলন বেশি দেখা যায় গ্রামে। অথচ ঢাকা নগরীর অধিকাংশ মানুষই যদি রিক্সা বা গাড়ির বদলে সাইকেল ব্যবহার করতো তবে ট্রাফিক জ্যাম কমে যেত রাস্তায়, পরিবেশ দুষণ কম হতো, দুর্ঘটনার ঝুঁকিও কমে যেতো অনেক। সেই সঙ্গে বেড়ে যেতো লোকজনের এনার্জি। কেননা, সাইকেল চালনা অনেক ভালো ব্যায়াম।

তথ্যসূত্র : উইকিপিডিয়া ও বাংলাপিডিয়া।

লেখক : রেজাউল হক সজল, প্রযুক্তিমনস্ক।






মন্তব্য চালু নেই