মেইন ম্যেনু

দুই প্রহর বিচরণে আমরা নুহাশ পল্লীতে

সেমিস্টার ফাইনাল শেষ হলো এবার পরীক্ষার জটপাকানো তিক্ততা কাটিয়ে উঠতে হবে। কোথাও বেড়িয়ে আসা দরকার। ভাবছি শেষ পরীক্ষার আগের রাত্রীতে। না আর ভাবনা না বন্ধু-বান্ধব সবাই কে ফোন দিলাম রাতে রাতে।পরদিন পরীক্ষার হল থেকে বের হয়ে সবাই একে একে জড়ো হলাম মুক্তমঞ্চের কাছে শুরু হলো ভাবনা কোথায় যাওয়া যায়? অবশেষে খোঁজে পেলাম গন্তব্য।

সময় তারিখ ঠিক হলো বুধবার সকাল ৮বেজে ৩০মিনিট বাসে উঠলাম এক বুক শান্তির খোঁজে সবাই ।গাড়ি চললো হইহুল্লোর আর আনন্দঘন মুহূর্তের মধ্যে দিয়ে আমাদের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে…।

 

রাস্তার দু’পাশে অনেকগুলো কারখানা। মনে হবে যানজট, শব্দ আর বায়ুদূষণের এ আবাসিক-বাণিজ্যিক জগাখিচুড়ির ভেতরেই আবর্তিত হচ্ছি। তাহলে এত দূর ছুটলাম কেন? এখানে শান্তি কোথায়?ধানের ক্ষেতে মিলেছে কারখানার গাঢ় নীল বর্জ্য-পানি। সবুজ আর নীলের ভালোই খেলা। কিছু দূর এগোলেই গ্রাম। সেই গ্রামের গহিনে মেঠোপথ গিয়ে মিলেছে নুহাশ পল্লীতে। হুমায়ূন আহমেদের সাধের নিবাস। আমরা এসেছি নুহাশ পল্লী এখন কেমন আছে দেখতে।

গেটের বাইরে বিভিন্ন দেশী ফল নিয়ে বিক্রেতারা বসে আছে। পাশেই চায়ের দোকান। গরুর দুধের চা। গরুগুলো থাকে নুহাশ পল্লীর ভেতর। দেখা যাক আর কী কী আছে।

SAM_1

মাটির দেয়ালে বাঁধা এক মায়াপুরী যেন। গেটের বাইরে থেকেই মনে হয় যেন সবুজের স্বর্গরাজ্য। নুহাশ পল্লীর গেট পেরুলেই টের পাওয়া যায়, সৃষ্টিশীল আবেগী মানুষটির সাধের এ শান্তি নিবাস এখন পিকনিক স্পট।
নুহাশ পল্লীর কর্মীরা জানালেন,প্রতিদিন গড়ে ৩০০ দর্শনার্থী আসেন। পরিবার নিয়ে বেড়ানো অথবা অফিস ও প্রতিষ্ঠানের বনভোজন, শিক্ষাসফরের জায়গা এখন নুহাশ পল্লী।জনপ্রতি ২৫০ টাকার টিকিট কিনলে নুহাশ পল্লীর দরজা খোলা। শিক্ষার্থীদের জন্য অবশ্য টিকিটের মূল্য ১০০ টাকাক্ষেত্রবিশেষে সেটাতেও ছাড়। অবশ্য হুমায়ূন আহমেদের জীবদ্দশায় সপ্তাহে একটির বেশি দলকে পিকনিকের সুযোগ দেয়া হতো না।

গেট পেরিয়ে এগোতেই যেন স্বাগত জানাল “মায়ের হাত ধরে শিশু দাঁড়িয়ে” নামের ভাস্কর্যটি। হুমায়ূন কি প্রকৃতি মায়ের কোলে আবাহনের ইঙ্গিত বোঝাতে এখানে এ ভাস্কর্য স্থাপন করেছিলেন? এ প্রশ্নের উত্তর আর জানা যাবে না। সামনে এগোই। দুই কদম হাঁটলেই অর্গানিক ফর্মে এবড়ো-খেবড়োভাবে তৈরি করা ছোট্ট সুইমিং পুল। মজার মানুষটি তার এ খেয়ালের নামও দিয়েছেন বেশ মজার “খুলি পল্লল” । পুলে পানি দেয়ার ব্যবস্থা কঙ্কালের খুলির মতো একটি অবয়বের মুখ দিয়ে। সুইমিং পুলটি এখন শুকনো। মনে হলো অনেকদিন এর তৃষ্ণা মেটায় না কেউ।

 

শুকনো সুইমিং পুলের পাশেই রয়েছে হুমায়ূন আহমেদের শোবার ঘর “হোয়াইট হাউস” মাটি দিয়ে লেপা ঘরটিকে চারপাশ থেকে ঘিরে আছে লতানো গাছপালা। সাধ আর সাধ্যের সবটুকু রঙ দিয়ে নুহাশ পল্লীকে সাজিয়েছেন হুমায়ূন। যেমন মানুষ, তেমন তার সাধ।কাছাকাছি নীরব দাঁড়িয়ে আরেক নারী। রাতের নুহাশ পল্লীকে আলোকিত করতে ল্যাম্প হাতে সতত দণ্ডায়মান, প্রস্তুত। নুহাশ পল্লীতে এরকম অনেক ভাস্কর্য রয়েছে বিভিন্ন জায়গায়।

নুহাশ পল্লীর মাঝখানে ঘাসের বিশাল চত্বর। সবুজের কার্পেটে দাঁড়িয়ে নুহাশ পল্লীর দিনযাপনের সাক্ষী জাপানি বট গাছটি। আরো রয়েছে দাবার ঘরসহ বড় বড় গুটি। শিশুদের খেলার জন্য ঘরটি তৈরি করা হয়। মাঠ ধরে এগিয়ে গেলে শেফালি গাছের ছায়ায় নামাজের স্থান। মায়ের জন্য নামাজের জায়গা তৈরি করেছিলেন হুমায়ূন।
সামনে খোলা বারান্দা নিয়ে “বৃষ্টিবিলাস”। হুমায়ূনের আমার আছে জল বা নয় নম্বর বিপদ সংকেতসিনেমার অনেক দৃশ্যে ‘বৃষ্টিবিলাস’ কে দেখা যায়।

SAM_3

প্রিয়জনের খোঁপায় কদম গুঁজে সবুজ মাঠে বৃষ্টি পড়ার দৃশ্য প্রাণভরে দেখতেই হুমায়ূন তৈরি করেছেন বৃষ্টিবিলাস। এখানে কখনো রাত্রিযাপন করেননি তিনি। বৃষ্টি এলে এখন আর কেউ আয়োজন করে বৃষ্টিবিলাসের বারান্দায় বসেন না। হুমায়ূন চলে যাওয়ার পর সিনেমা জগতের বন্ধুদের আড্ডাও বসে না বৃষ্টিবিলাসে।
নুহাশ পল্লীতে ছোট করে তৈরি আছে পদ্মপুকুর। হয়তো অনেক বছর পর যখন পদ্মফুল বিরল হবে, তখন সন্তানদের দেখাতেই এ পদ্মপুকুর তৈরির প্রয়াস। পদ্মপুকুরের মাঝখানে ‘জলপরী’অবনত মুখে নীরব দাঁড়িয়ে রয়েছে। যেন রূপকথার জলপরী সত্যি হয়ে ধরা দেয় পদ্মপুকুরে। তারই সামনে বিশাল ‘দানবীয় দৈত্য’। সব অপকে বিনাশ করতে সে রাক্ষস সদা বিরাজমান।

নুহাশ পল্লীর ভিতরে রয়েছে জুরাসিক পার্ক, সেখানে রয়েছে হাতি, ডাইনোসর বা বাঘের মাথা। এছাড়া কিছু দোলনা রয়েছে। নুহাশ পল্লীর আরেক দৃষ্টি-আকর্ষক লিচু গাছের ওপর ‘ট্রি হাউস’। ‘শ্রাবণ মেঘের দিনে’সিনেমার কয়েকটি দৃশ্যে এ ঘরটি দেখতে পাওয়া যায়।

‘নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে রয়েছে নয়নে নয়নে’
হুমায়ূন-শাওন দম্পতির প্রথম সন্তান লীলাবতী। পৃথিবীর আলো দেখার আগেই বিদায় নেয়। আট মাস বয়সে মায়ের গর্ভেই মারা যায়। লীলাবতীকে স্মরণে রাখতেই নুহাশ পল্লীর উত্তর প্রান্তে হুমায়ূন খনন করেন শানবাঁধা দিঘি ‘লীলাবতী’। দিঘির বুকে বসানো কাঠের সেতু। সেতু দিয়ে ‘দ্বীপ বিলাস’যাওয়া যায়। দ্বীপ বিলাস, কৃত্রিম দ্বীপ। লীলাবতীর পাড়েই ‘ভূতবিলাস’দাঁড়িয়ে।

হুমায়ূন বলতেন, নুহাশ পল্লীর গাছপালা ভূতদের জন্যই বিশেষভাবে সাজানো হয়েছে। বোধকরি সে জন্যই এখানে গাছের এক সমৃদ্ধ সমাহার গড়েছিলেন তিনি। ৩০০ প্রজাতির ফলদ, বনজ গাছের পাশাপাশি এখানে রয়েছে বিরল ঔষধি গাছ।

আমৃত্যু আড্ডাবাজ হুমায়ূন বড় ভয় পেতেন নিঃসঙ্গতাকে। হয়তো সেজন্যই আস্থা রেখেছিলেন মানুষের সবচেয়ে বড় বন্ধু গাছেদের ওপর। গাছে গাছে ভরিয়ে দিয়েছেন নুহাশ পল্লীকে। এভাবেই চেয়েছেন নিজেকেও ভরিয়ে দিতে।

SAM_2217

নুহাশ পল্লীর সবকিছু্ই আছে এখন, হুমায়ূন ছাড়া। হুমায়ূন বিহীন নুহাশ পল্লীর দিন কাটে প্রাণহীন, রাত কাটে আঁধারে। এখন আর কেউ প্রতিদিন নুহাশ পল্লীর খোঁজ নিয়ে দিন শুরু করে না। নুহাশ পল্লীকে আগের মতো পরিপাটি করে সাজানো হয় না। সকালবেলা সবুজ ঘাসে হেঁটে কেউ নুহাশ পল্লীর সব জায়গার তদারকি করেন না। কথা বলেন না, কুশল জিজ্ঞাসা করেন না গাছেরা কেমন আছে।

১৯৯৭ সালে গাজীপুর সদর থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরের পিরুজালী গ্রামে আলো-আঁধারের মেঠোপথে শান্তির সন্ধানে নামেন হুমায়ূন আহমেদ। ৪০ বিঘা জমির ওপর নিজের মতো করে সাজান একটি গ্রাম। কী নেই সেই গ্রামে! একেবারে যেন হুমায়ূনের খেয়ালের খেলাঘর।

এভাবেই সবাই বিচরণ করতে করতে দুই প্রহর কাটিয়ে দিলাম স্বপ্নের নুহাশ প্ললীতে । আনন্দঘন এই হইহুল্লোরের মাঝেই সবাই কে এবার নিতে হবে বিদায় । ক্যাম্পাসের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম বিকালের রূপ আমাদের গায়ে লাগতেই। আর নুহাশের তীব্র মায়াময় আকাংখ্যা যেন আমাদের সবার চোখ ছেপে যাচ্ছে । তবুও আসতে হবে ! নুহাশ পল্লীর অপূর্ব কিছু স্মৃতিপট মনের মাঝে ধারণ করে নিয়ে আসলাম আমরা ।






মন্তব্য চালু নেই