মেইন ম্যেনু

‘দুটি সন্তান নিয়ে টিকিট কেটে লন্ডনে যাওয়ার মতো টাকা ছিল না আমার কাছে’

বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানাকে লন্ডনে একাই বিয়ে করতে হয়েছে বলে জানালেন তার বড় বোন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘দুটি সন্তান নিয়ে টিকিট কেটে লন্ডনে যাওয়ার মতো টাকা তখন আমার ছিল না। ছেলে-মেয়ে নিয়ে সেখানে কোথায় থাকবো, কি খাবো— এটিই ছিল বড় প্রশ্ন।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমার এখনও মনে আছে-জন্মের সময় টিউলিপ ছিল ছোট্ট ফুলের কুড়ির মতো। সেই ছোট্ট টিউলিপ এখন ব্রিটিশ পার্লামেন্টে। এমপি হওয়ার পর হাউস অব কমন্সে তার বক্তব্য শোনার জন্য লন্ডন গিয়েছিলাম। অল্প সময়ে এত চমত্কার ও সাবলিলভাবে সে বক্তব্য রেখেছিল, দেখে গর্বে আমার বুক ভরে গিয়েছিল। আসলে রক্ত কথা বলে। টিউলিপের বক্তব্যের মধ্যদিয়ে সেটি আবারও প্রমাণ হলো।’

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তিনজন নারী- রুশনারা আলী, রূপা হক ও টিউলিপ রেজওয়ানা সিদ্দীক ব্রিটিশ পার্লামেন্টের হাউজ অব কমন্সের সদস্য নির্বাচিত হওয়ায় বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের পক্ষ থেকে তাদেরকে ধন্যবাদ জানানোর জন্য আনীত প্রস্তাবের ওপর বক্তব্য রাখতে গিয়ে এই তথ্য দেন শেখ হাসিনা। এ কথা বলার সময় তার কণ্ঠ ভারি হয়ে আসে। তার ২০ মিনিটের বক্তব্যের পুরোটাই ছিল আবেগঘন। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে চলা অধিবেশনে এসময় ছিল পিন-পতন নীরবতা।

তিনি বলেন, ‘১৯৭৫-এর ৩০ জুলাই রেহানাকে নিয়ে আমি জার্মানিতে যাই। কথা ছিল বাবা জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর তিনি আসবেন। তার সঙ্গে আমরাও দেশে ফিরবো। আমি বদরুন্নেসা কলেজের ছাত্রী ছিলাম। চেয়েছিলাম রেহানাও সেখানেই পড়বে। সেজন্য জার্মানি যাওয়ার আগে আমি নিজে কলেজে গিয়ে রেহানার ফরম পূরণ করে দিই। রেহেনা ফিরে সেখানে পড়ার কথা ছিল। কিন্তু সেটি আর হয়নি। মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে আমরা সব হারালাম। দেশে আসতে চেষ্টা করেছি। কিন্তু আসতে দেয়া হয়নি। বাংলাদেশে ক্যু হয়েছে। নানা ধরনের কথা আর গুজবের ছড়াছড়ি, কেউ কেউ বলল মা আর রাসেল বেঁচে আছে। সঠিক কোনো খবর পাচ্ছিলাম না। দেশে ফিরে আসার জন্য আমরা ব্যাকুল ছিলাম। ভাবলাম দেশে ফিরলে জানতে পারবো কী ঘটেছে। দিল্লীতে যখন নামলাম, সেখানে মিসেস গান্ধীর সঙ্গে দেখা হলো। জার্মানিতে আমরা সেখানে তখনকার রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলাম, তিনিই জানালেন কেউ বেঁচে নেই। সেই খবর সেদিন আমি রেহানাকে জানাতে পারিনি। মিসেস গান্ধী আমাদের দিল্লীতে থাকার ব্যবস্থা করেন।’

ঘটনার বর্ণনায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি দেশে ফিরতে চাই, আর রেহানা সিদ্ধান্ত নিল সে লন্ডনে যাবে। আমার বাবা সত্ রাজনীতি করেছেন। বিদেশে রেহানার লেখাপড়া করার মতো আর্থিক সংগতি আমাদের ছিল না। রেহানার বিয়ের বিষয়ে জিল্লুর রহমান (প্রয়াত রাষ্ট্রপতি) আগেই প্রস্তাব দিয়ে রেখেছিলেন আইভি চাচীর পরিবারের একজনের সঙ্গে। তখন আমাদের কেউ নেই, কিছু নেই, কোথায় যাবো! এই অবস্থা। এসময় জহুরুল ইসলাম চাচা আমাদেরকে খবর পাঠালেন। ১৯৭৬ সালের ডিসেম্বরে রেহানা লন্ডনে গিয়ে চাচার বাসায় উঠলো। বাবার একজন বন্ধু, যিনি নিজেও নির্বাসিত ছিলেন, তিনি রেহানাকে একটি চাকরির ব্যবস্থা করে দিলেন। এভাবে রেহানা সেখানে থাকলো, তার বিয়ে হলো। আমরা সম্পূর্ণ একা, মা-বাবা-ভাই হারা। সেসময় লন্ডনে অনেকেই রেহানার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। আবার অনেকে আমাদের খবর নেয়নি।’

শেখ রেহানার জীবন সংগ্রামের কথা বলতে গিয়ে বড় বোন বলেন, ‘নিজে চাকরি করে, কত কষ্ট করেছে রেহানা। ’৮২ সালে টিউলিপের জন্ম হয়। আমি তখন পাশে ছিলাম। ছোট্ট টিউলিপ, লেখাপড়া শিখেছে, চাকরিও করেছে। টিউলিপের বাবাও ভালো ছাত্র ছিলেন, রেহানার ছেলেরাও লেখাপড়ায় বেশ ভালো। লেখাপড়ার সাথে টিউলিপ লেবার পার্টির রাজনীতিতে যুক্ত হয়। একটা ছোট্ট মেয়ে, কী যে কষ্ট করতে পারে-দেখে সত্যিই বিস্মিত হয়ে যাই। সে তার নির্বাচনী এলাকার মানুষের জন্য নিবেদিতপ্রাণ। প্রতিটি ঘরে ঘরে সে যায়।

আমার বাবাও প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। রেহানাও প্রধানমন্ত্রীর মেয়ে ছিল। আমি তিনবার প্রধানমন্ত্রী। অথচ আমার বোন আগে যেমন ছিল, এখনও তেমনই। এখনও সে বাসে চড়ে, বাসে ঝুলে অফিসে যায়। শুধু নিজের ছেলে-মেয়েকে নয়, আমার ছেলে-মেয়েকেও রেহানাই দেখাশোনা করেছে। আমাদের পাঁচ বাচ্চার অভিভাবক রেহানাই ছিল। কত কষ্ট করে যে ওদের মানুষ করেছে!’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশবাসীর কাছে দোয়া চাই। জাতির পিতা আমাদের যে আদর্শ দিয়ে গেছেন, সেই আদর্শেই সন্তানদের মানুষ করেছি। টিউলিপের যে যাত্রা শুরু, জীবনে যেন আরও সাফল্য পায়। তার জীবন যেন সুখী হয়, সবার কাছে সেই দোয়া চাই।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘টিউলিপ যেই আসনে জিতেছে, সেটি লেবার পার্টির আসন নয়। সেখানে এবার ১১শর বেশি ভোটের ব্যবধানে টিউলিপ জিতেছে। তাকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। সেখানে রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়ে থাকা খালেদা জিয়ার ছেলে (তারেক রহমান) সব চেষ্টাই করেছে টিউলিপ যেন জিততে না পারে। বাংলাদেশের একটি মেয়ে নির্বাচন করছে, সেটিও তাদের সহ্য হয় না। কারণ তারা তো বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না। তারপরও আমি কৃতজ্ঞতা জানাই প্রবাসী বাঙালিদের প্রতি, তারা টিউলিপের পাশে দাঁড়িয়েছে। কৃতজ্ঞতা জানাই এই দেশের মানুষের প্রতি। আমরা তো সব হারিয়েছি। বাংলাদেশের মানুষের মধ্যেই পিতা-মাতা-ভাই-স্বজন হারানোর স্মৃতি ফিরে পেয়েছি।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, তিন বঙ্গকন্যার নির্বাচিত হওয়া দেশের জন্যই গৌরবের। এই ব্রিটিশরাই দুশ বছর আমাদের শাসন করেছিল। কাজেই এই তিন কন্যাই আমাদের গৌরব। তিন কন্যার জন্য দেয়া করি। বঙ্গবন্ধু আমাদের শিখিয়ে গেছেন, ত্যাগ ছাড়া মহত্ কিছু অর্জন সম্ভব নয়। বাংলাদেশের মানুষ উন্নত জীবন পাক, বিজয়ের মুকুট সব সময় বাঙালি জাতির মাথায় শোভিত হোক।

সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনির আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবটি সর্বসম্মতভাবে পাস করতে সবার কাছে অনুরোধ রাখেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী প্রস্তাবটি ভোটে দিলে তা সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।

এর আগে কান্নাজড়িত কণ্ঠে শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, ‘রূপা হক, রুশনারা আলী আর টিউলিপের রাজনীতি এক নয়। তাদের সঙ্গে টিউলিপের তুলনা করা ঠিক হবে না। কারণ অনেক ঘাত-প্রতিঘাত, বেদনার মধ্য দিয়ে টিউলিপকে এই পর্যায়ে আসতে হয়েছে। ’৭৫-এর ডিসেম্বরে ভারত সরকারের সহযোগিতায় আমি শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাকে দেখতে গিয়েছিলাম, তাদের কষ্ট, সেই করুণ দৃশ্য…। টিউলিপের নির্বাচনে অপপ্রচার কম হয়নি। প্রধানমন্ত্রী যখন রাশিয়া যান, তখন পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে টিউলিপও সাথে ছিল। জামায়াত-বিএনপি সেই ছবি ছাপিয়ে অপপ্রচার চালায় যে, টিউলিপ রাশিয়াপন্থি। কারণ ব্রিটেনের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক ভালো নয়। ওই যে একটা ক্রিমিনাল ওখানে বসে আছে, সেও টাকা খরচ করেছে টিউলিপের বিরুদ্ধে।’

প্রধানমন্ত্রীর আগে প্রস্তাবটির ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বলেন, ‘আল্লাহ সবার জন্য কোনো না কোনো প্রাপ্তি রাখেন। এটিও হয়তো শেখ রেহানার প্রাপ্তি।’ বক্তব্যের সময় তার কণ্ঠও ভারী হয়ে আসে।

আলোচনায় অংশ নিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েলও বাকরুদ্ধ হন। তিনি বলেন, ‘টিউলিপের নির্বাচনের সময় বাংলাদেশের কোনো কোনো পত্রিকা খবর ছেপেছিল যে, টিউলিপ তার পরিবারের তথ্য গোপন করেছে। খালেদা জিয়ার ছেলেও অনেক ষড়যন্ত্র করেছিলেন। কিন্তু চূড়ান্ত জয় হয় সত্যের।’ সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, ‘খালেদা জিয়ার এক ছেলে মাদকাসক্ত, আরেকটি রাজনৈতিক অর্বাচিন।’

এর আগে প্রস্তাবটি উত্থাপন করে ডা. দীপু মনি বলেন, ‘২০১৫ সালের ৭ মে ব্রিটেনের নির্বাচনে তারা তিনজন নির্বাচিত হন। বিশ্ব দরবারে তারা বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করেছে। বাংলাদেশের নারীদের অর্জন আজ দেশের সীমানা পেরিয়ে বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে।’ প্রস্তাবের ওপর অন্যদের মধ্যে আলোচনায় অংশ নেন— পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী ও প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, মাহবুব-উল আলম হানিফ, সানজিদা খানম, সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি, ডা. রুস্তম আলী ফরাজী, ফজিলাতুন্নেসা বাপ্পী, পীর ফজলুর রহমান, মনিরুল ইসলাম, মেহের আফরোজ চুমকি, আবদুল মান্নান, আবু জাহের, প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক প্রমুখ।



« (পূর্বের সংবাদ)



মন্তব্য চালু নেই