মেইন ম্যেনু

দুর্নীতির করালগ্রাসে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে কেপিএম

কয়েক দশক ধরে দুর্নীতির করালগ্রাসে জর্জরিত রাষ্ট্রায়াত্ত প্রতিষ্ঠান ও এশিয়ার বিখ্যাত কর্ণফুলী কাগজ কল (কেপিএম) শেষ পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বন্ধের প্রক্রিয়ায় কারখানার শ্রমিকদের ইতোমধ্যে বিসিআইসির অন্য প্রতিষ্ঠানে বদলি শুরু করেছে। অভিযোগ আছে, কেপিএমের কারণে নতুন বছরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হাতে সব বই তুলে দিতে পারেনি সরকার।

চট্টগ্রাম ও রাঙামাটি জেলার সীমান্তবর্তী চন্দ্রঘোনায় অবস্থিত কর্ণফুলী কাগজ কলটি ১৯৫৬ সালে গড়ে তোলে পাকিস্তানের দাউদ শিল্পগ্রুপ। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকায় প্রাকৃতিকভাবে গজে উঠা নরম বাঁশ ও কাঠই এই কলে কাগজ তৈরির একমাত্র কাঁচামাল।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর দাউদ শিল্পগ্রুপ কারখানাটি রেখে চলে যায়। এরপর থেকে বাংলাদেশ রসায়ন শিল্প সংস্থা (বিসিআইসির) আওতায় পরিচালিত হয়ে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে প্রতিষ্ঠানটি লাভজনক হলেও ৭৫ পরবর্তী সময় থেকে ধারাবাহিক লোকসানে জর্জরিত হতে থাকে প্রতিষ্ঠানটি।

তৎকালীন সময়ে প্রায় ৪ হাজার স্থায়ী ও অস্থায়ী শ্রমিক-কর্মচারীর ভাতঘর হিসেবে পরিচিত এই প্রতিষ্ঠানটির লোকসানের মূলে ছিলেন ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তারা। সেই থেকে এ পর্যন্ত যে কয়জন ব্যবস্থাপনা পরিচালক কারখানাটি পরিচালনা করেছেন তাদের বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ রয়েছে।

শুধু তাই নয়, এ কারখানায় কাঁচামালের উৎস তদারকির দায়িত্বে থাকা পাল্পউড বনবিভাগের কর্মকর্তারাও শত শত কোটি টাকার মালিক হয়ে আরাম-আয়েশে দিনযাপন করছেন। এই মিলের সম্পদ ঘিরে যখন যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে তখন সে সরকারের মন্ত্রী, এমপি ও দলীয় নেতাকর্মীরাও নানা কায়দায় অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন।

সাধারণ শ্রমিকরা নিয়মানুযায়ী শ্রম দিয়ে মাস শেষে বেতন নিলেও রাজনৈতিক দলের পরিচয়ে সিবিএ বা শ্রমিক সংগঠনের কতিপয় অসাধু নেতাকর্মীরাও বিনাশ্রমে বেতন তুলে নেয়। এরপরও সুযোগ বুঝে নানা কায়দায় ভোগ করেছে আর্থিক সুবিধা।

শ্রমিকদের মতে, ২০০০ সালের শুরুর দিকে কেপিএম বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। এ সময় লোকসানের ভারে জর্জরিত হয়ে পড়ে প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু কলটির পরিচালনায় থাকা সুচতুর ব্যবস্থাপকদের চাতুরতায় সরকারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের বাজেট নিয়ে সচল রাখে কারখানাটি।

চাপের মুখে পড়ে ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে কাজীর গরু খাতায় আছে গোয়ালে নেই- এমন হিসেব করে লাভ দেখান ব্যবস্থাপনা পরিচালক। কিন্তু ২০০৯ সালে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর এ পর্যন্ত প্রতি অর্থবছরে মোটা অঙ্কের বাজেট নিলেও লাভ দিতে পারেনি কোন বছর।

সর্বশেষ গত অর্থবছরে সরকারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ নিয়েও প্রতিষ্ঠানটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য বই তৈরির প্রয়োজনীয় কাগজ পর্যন্ত সরবরাহ করতে পারেনি। ফলে এখন পর্যন্ত দেশের সবকটি প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের হাতে সব বই তুলে দিতে পারেনি সরকার। কেপিএমের অজুহাত একটাই অর্থ সংকট।

কেপিএমের ব্যবস্থাপনা সূত্র জানায়, অর্থাভাবে এবার লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেক কাগজও উৎপাদন করতে পারেনি কেপিএম। এমনকি কারখানার শ্রমিকদের বেতন-ভাতাও বন্ধ হয়ে গেছে। এ অবস্থায় নীরবেই কারখানার ৩০২ শ্রমিককে বিসিআইসির অন্য কারখানায় বদলি করা হয়েছে। যাকে কারখানা বন্ধের প্রক্রিয়া বলে মনে করছেন শ্রমিকরা। কিন্তু মিল কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে কোন রকম মুখ খুলছে না।

শ্রমিকরা জানান, কেপিএম কর্তৃপক্ষ গত বৃহ¯পতিবার সকালে আর্থিক সঙ্কটের কারণে ৩০২ শ্রমিকের গণবদলির তালিকা প্রকাশ করে। এরমধ্যে ১৫২ জনকে চট্টগ্রামের টিএসপি সার কারখানা এবং অন্যান্যদের চট্টগ্রামের ডিএপি সার কারখানা ও সিইউএফএল কারখানায় বদলি করা হয়েছে। বদলির আদেশ দেখে শ্রমিক-কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

শ্রমিকদের অভিযোগ, স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে কারখানায় দৈনিক ১১০-১৩০ মে. টন কাগজ উৎপাদন হলেও দুর্নীতির করালগ্রাসের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কারখানার দৈনিক উৎপাদন ২০-৩০ মেট্রিক টনে নেমে আসে। এমনকি কারখানায় বর্তমানে কর্মরত স্থায়ী ও অস্থায়ী শ্রমিক কর্মচারী কর্মকর্তার মাসিক বেতন পরিশোধও করতে পারছে না।

মিলের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ সূত্র জানায়, গত ৫ বছর ধরে কারখানা থেকে অবসর নেওয়া ২ শতাধিক শ্রমিক কর্মচারীর প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকাসহ অন্যান্য পাওনাদি পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। মিলের সকল শ্রমিক কর্মচারীর প্রভিডেন্ট ফান্ড শূন্য করে কাঁচামাল কিনে কারখানার চালানের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে কর্তৃপক্ষ।

সূত্র আরও জানায়, কেপিএমের কাছে ২ কোটি টাকা পাওনা থাকায় বনবিভাগ কাঁচামাল সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। অবসরে যাওয়া শ্রমিক কর্মচারী এবং মিলে কাঁচামালসহ অন্যান্য মালামাল সরবরাহকারী ঠিকাদারদের কেপিএমের কাছে পাওনা রয়েছেন ১৫ কোটি টাকারও বেশি। এই অবস্থায় চরম আর্থিক সঙ্কট আর অব্যাহত লোকসানের মুখে বিসিআইসি কর্তৃপক্ষ কর্ণফুলী পেপার মিলটি বন্ধ করে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে।

কর্ণফুলী পেপার মিল সিবিএ সভাপতি তৌহিদ আল মাহবুব জানান, বেতন ভাতা না পেয়ে চরম দুর্দশার মধ্যে থাকা শ্রমিক কর্মচারীদের ৩০২ জনকে বৃহস্পতিবার বিসিআইসির চট্টগ্রামের বিভিন্ন কারখানায় গণবদলি করা হয়েছে। আরও কয়েকশ শ্রমিক কর্মচারীকে বদলির আদেশ অপেক্ষমান রয়েছে বলে আমরা জানতে পেরেছি।

কেপিএমের এই সিবিএ নেতা জানান, কারখানা বন্ধের প্রক্রিয়া হিসেবে মিলের শ্রমিক কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের গণবদলি করা হচ্ছে। এই গণবদলির প্রতিবাদে বৃহ¯পতিবার সকালে কেপিএমের মূল ফটক অবরুদ্ধ করে প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে কর্ণফুলী পেপার মিলের মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) আনোয়ার হোসেন  বলেন, মিলের আর্থিক সঙ্কটের কারণে বিসিআইসি কর্তৃপক্ষ কারখানা থেকে ৩০২ শ্রমিক কর্মচারী কর্মকর্তাকে বিসিআইসির অন্যান্য কারখানায় বদলি করেছে। এর মধ্যে মিলের কর্মকর্তা রয়েছেন ৩৬ জন।

কর্ণফুলী পেপার মিলের চরম আর্থিক সঙ্কটের কথা স্বীকার করে এই কর্মকর্তা জানান, মিলের তহবিলে প্রয়োজনীয় অর্থ না থাকায় শ্রমিক কর্মচারীদের ডিসেম্বর মাসের বেতন ভাতাদিও পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি। মিলের মাস্টার রোলে কর্মরত শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ করা যাচ্ছে না তিন মাস ধরে। এই আর্থিক সঙ্কট বিবেচনায় বিসিআইসি কর্তৃপক্ষ মিলের জনবল কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

প্রশ্নের জবাবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা বলেন, কেপিএমের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি গেড়ে বসেছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হাতে কর্তৃপক্ষ জিম্মি হয়ে গেছে। কেপিএমকে বাঁচাতে হলে এ মুহূর্তে চাকরির শুরু থেকে এখনো কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিকদের ছাঁটাই বা বদলি ছাড়া কোন উপায় নেই।

এদিকে গণবদলি ও কারখানা বন্ধ করার চক্রান্তের প্রতিবাদে গত ৭ জানুয়ারি সকালে কেপিএমের ১ নম্বর গেইটে বিশাল শ্রমিক সমাবেশের আয়োজন করা হয়। কেপিএম এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), কেপিএম শ্রমিক কর্মচারী পরিষদ এবং কেপিএম ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের যৌথ শ্রমিক সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন শ্রমিক নেতা তৌহিদ আল মাহবুব চৌধুরী।

বদলির আদেশ প্রত্যাহার ও কারখানা বন্ধের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন শ্রমিক নেতা হাজী আব্দুল ওহাব বাবুল, মো. ইসমাইল, মো. জসিম উদ্দীন, মো. লুৎফর রহমান, মো. হানিফ, আনিছুর রহমান ও রাঙামাটি জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক স¤পাদক মো. মফিজুল হক। সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন শ্রমিক নেতা মাকসুদুর রহমান ও চন্দ্রঘোনা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বিপ্লব মারমা।






মন্তব্য চালু নেই