মেইন ম্যেনু

বিচার ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রে লবিস্ট নিয়োগ দেন মীর কাসেম

দু’শ কোটি টাকা খরচেও ঠেকানো গেল না ফাঁসি

ফাঁসি ঠেকাতে ২০০ কোটি টাকারও বেশি অর্থ খরচ করেছিলেন যুদ্ধাপরাধী মীর কাসেম আলী। বিচার ঠেকানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের প্রভাবিত করতে নিয়োগ দেন লবিস্ট ফার্ম। যুক্তরাষ্ট্রের ওই ফার্মটির নাম কেসিডি অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস। এছাড়া মামলা চালাতে ব্রিটিশ আইনজীবী টবি ক্যাডম্যানকে নিয়োগ দেন জামায়াতের এই ধনকুবের। হাত করেন কয়েকজন মার্কিন সিনেটর ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালকেও। তারা ঢাকায় এসে ও বিবৃতি দিয়ে বিচার নিয়ে প্রশ্ন তোলে। কিন্তু সব প্রচেষ্টাই আজ ব্যর্থ।

নামে-বেনামে হাজার কোটি টাকার বেশি সম্পদের মালিক মীর কাসেম। ব্যাংক, হাসপাতাল, কৃষি ব্যবসা, গণমাধ্যম, বিশ্ববিদ্যালয়, ওষুধ শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে রয়েছে তার ব্যবসা। তবে সূত্র বলছে, মীর কাসেমের অনুপস্থিতিতে এসব প্রতিষ্ঠানে খুব বেশি প্রভাব পড়বে না। তাকে ছাড়াই টানা ৫ বছর ধরে চলছে এসব প্রতিষ্ঠান। এদিকে যুদ্ধাপরাধীদের সম্পদ বাজেয়াপ্তের দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।

যুদ্ধাপরাধের বিচার ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে প্রচারণা চালানোর জন্য ২০১০ সালের ১০ মে যুক্তরাষ্ট্রের কনসালটেন্সি ফার্ম কেসিডি অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটের সঙ্গে চুক্তি করেন মীর কাসেম আলী। পরে সিটি ব্যাংক এনএর মাধ্যমে ইলেক্ট্রনিক মানি ট্রান্সফার করে চুক্তির আড়াই কোটি ডলার অর্থ ফার্মটির হিসাবে পাঠানো হয়। যার অ্যাকাউন্ট নম্বর সিএমজিআরপি আইএনসি ৩০৭১৭২৪৮, সুইফ্ট কোড : সিটি ইউএস ৩৩। এই প্রতিষ্ঠানের অন্যতম উদ্যোক্তা এবং প্রধান নির্বাহী সাবেক মার্কিন কংগ্রেসম্যান মার্টি রুশো। প্রতি ডলার ৮০ টাকা হিসাবে স্থানীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ ২শ’ কোটি টাকা। মার্কিন এই প্রতিষ্ঠানটির ঠিকানা ৭০০/১৩ স্ট্রিট, ১১ ডব্লিউ, সুইট-৪০০ ওয়াশিংটন ডিসি। চুক্তিপত্রেই উল্লেখ করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশ সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ ও লবিং করতে এ উদ্যোগ। চুক্তিপত্রে জামায়াতের পক্ষে মীর কাসেম আলী নিজে এবং লবিস্ট ফার্মের পক্ষে জেনারেল কাউন্সেল জে ক্যামেরুজ স্বাক্ষর করেন। চুক্তি অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটি ২০১০ সালের ৬ অক্টোবর থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ৫ এপ্রিল পর্যন্ত টানা ৬ মাস প্রচারণা চালাবে। প্রয়োজনে চুক্তির মেয়াদ আরও ৬ মাস বাড়ানো যাবে। এক মাসের মধ্যেই ২০১০ সালের ১৭ জুন মতিঝিল থেকে গ্রেফতার করা হয় মীর কাসেম আলীকে।

স্বাধীনতার পর তিন দশকে সম্পদের পাহাড় গড়েন মীর কাসেম। ১৬টি প্রতিষ্ঠানের ৩০ হাজারের বেশি শেয়ার রয়েছে তার নিজ ও তার পরিবারের নামে। ঢাকার মিরপুরের রয়েছে তার বহুতল বাড়ি। তার তত্ত্বাবধানে থাকা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক ঋণের পরিমাণ ২০৫ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। এসব ব্যবসা থেকে বিপুল আয়ের বড় একটি অংশ তিনি ব্যয় করতেন জামায়াতের রাজনীতির পেছনে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগ সম্পদই বিভিন্ন কোম্পানি, ট্রাস্ট ও বেসরকারি সংস্থার নামে রয়েছে। বৈধভাবে আয়কর রিটার্নে তার সম্পদের পরিমাণ দেখানো হয়েছে ৩ কোটি ৩৪ লাখ টাকা।

সূত্র জানায়, যুদ্ধাপরাধী মীর কাসেম আলীর করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) ০৭৬-১০৩-৯৬৬৩। তিনি ঢাকা কর অঞ্চল-৫-এর সার্কেল ৫০-এর করদাতা। ঢাকার মিরপুরের দক্ষিণ মনিপুরে ২৮৭ নম্বর প্লটের বহুতল ভবন তার নামে। মোহাম্মদপুরে একতা সোসাইটির ৫ কাঠা জমি ও মানিকগঞ্জের হরিরামপুরে সাড়ে ১২ শতক জমি রয়েছে। তিনি ধানমণ্ডির বহুতল ভবন কেয়ারী প্লাজার ১৭৮ দশমিক ৬৯ বর্গমিটারের মালিক। এছাড়া বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে মোট ৩০ হাজার শেয়ার রয়েছে তার নিজ ও পরিবারের নামে। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংকের ২ হাজার ১১৩টি শেয়ার, কেয়ারী লিমিটেডের ১৪ হাজার শেয়ার, কেয়ারী টেলিকমের ১০ হাজার, কেয়ারী ট্যুরস অ্যান্ড সার্ভিসেসের ১ হাজার শেয়ার, কেয়ারী ঝর্নার ২০টি, কেয়ারী তাজের ৫টি, কেয়ারী সানের ৫টি, কেয়ারী স্প্রিংয়ের ২০টি, সেভেল স্কাইয়ের ১০০, মীর আলী লিমিটেডের ২৫টি এবং দিগন্ত মাল্টিমিডিয়া লিমিটেডের ১০০টি শেয়ার রয়েছে মীর কাসেম আলীর নামে। তিনি কেয়ারী লিমিটেডের চেয়ারম্যান, ইবনে সিনা ট্রাস্টের সদস্য (প্রশাসন), ইবনে সিনা হাসপাতালের পরিচালক, ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যালস ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক, এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রাস্টের সদস্য ও ফুয়াদ আল খতিব চ্যারিটি ফাউন্ডেশনের সদস্য।

তার তত্ত্বাবধানে থাকা কেয়ারী লিমিটেডের নামে ব্যাংক ঋণ ৬০ কোটি ৯৩ লাখ, ইবনে সিনা ট্রাস্টের নামে ৫০ কোটি, ইবনে সিনা হাসপাতালের ৬ কোটি ৩৪ লাখ, ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যালসের ২০ কোটি, দিগন্ত মিডিয়া কর্পোরেশনের নামে ৪১ কোটি ৩৫ লাখ, এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিয়ালের ২৩ কোটি ৭৫ লাখ এবং ফুয়াদ আল খতিবের নামে ২ কোটি ৯৬ লাখ টাকার ঋণ রয়েছে।

যেভাবে অর্জন করেন সম্পদ : ১৯৭৬ সাল থেকে শুরু হয় তার ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড। দেশ স্বাধীনের পর স্থায়ীভাবে ঢাকায় আসেন জামায়াতের এই ধনকুব। পরে মুক্তিযোদ্ধাদের ভয়ে পালিয়ে যান লন্ডনে। সেখান থেকে সৌদি আরবে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে মুসলমানদের ক্ষয়ক্ষতি, মসজিদ-মাদ্রাসা ভাঙার বর্ণনা আর পাকিস্তানে আটকে পড়া বাংলাদেশী মুসলমানদের মানবেতর জীবনের কথা বলে তাদের জীবনমানের উন্নয়নের জন্য বিপুল অর্থ জোগাড় করেন তিনি।

পরে ওই অর্থ মসজিদ-মাদ্রাসা পুনর্নির্মাণ কিংবা ক্ষতিগ্রস্তদের কল্যাণে ব্যয় না করে নিজেই ভোগ করতে থাকেন। গড়ে তোলেন এনজিও। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর দেশে ফিরে আসা মীর কাসেম মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর অর্থনৈতিক সাহায্যপুষ্ট রাবেতা আল-আলম আল-ইসলামী নামের এনজিওর কান্ট্রি ডিরেক্টর হন। সেই এনজিওর অর্থে তিনি একের পর এক গড়ে তোলেন ব্যবসায়িক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান।
সেই থেকে জামায়াতের সাংগঠনিক ব্যয় নির্বাহে সবচেয়ে বেশি অর্থের জোগানদাতা মীর কাসেম। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ঠেকাতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে লবিস্ট নিয়োগ ও আর্থিক লেনদেনের নেতৃত্বেও ছিলেন মীর কাসেম আলী। ট্রাইব্যুনালে মীর কাসেমের রায়ের কয়েক দিন আগেও ব্রিটিশ আইনজীবী টবি ক্যাডম্যান যুদ্ধাপরাধীদের বিচারপ্রক্রিয়া বন্ধ করতে লন্ডনে সংবাদ সম্মেলন করেন।

জানা গেছে, মানিকগঞ্জ জেলার হরিরামপুর উপজেলার চালা গ্রামের মরহুম তৈয়ব আলীর দ্বিতীয় ছেলে মীর কাসেম আলী ওরফে মিন্টু। তার জন্ম ১৯৫২ সালে। বাবা তৈয়ব আলী ছিলেন চট্টগ্রাম টেলিগ্রাফ অফিসের কর্মচারী। নগরীর রহমতগঞ্জ এলাকার সিঅ্যান্ডবি কলোনিতে ছিল তাদের বাসা। চট্টগ্রামের মানুষ তাকে মিন্টু নামেই জানে।

একাত্তরে মীর কাসেম আলী পরিচিত ছিলেন ‘বাঙালি খান নামে এবং বদর বাহিনীর অন্যতম অধিনায়ক ও চট্টগ্রাম গণহত্যার নেপথ্য নায়ক হিসেবে। পরে ১৯৭৮ সালে ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতির দায়িত্ব পান মীর কাসেম। পরিচিতি পান মূলত জামায়াতে ইসলামীর অর্থের জোগানদাতা হিসেবে। জামায়াতকে অর্থনীতির শক্তিশালীভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে তিনি ১৯৭৬ সাল থেকে কাজ করে আসছেন।

একাত্তরের ৬ নভেম্বর পর্যন্ত কাসেম চট্টগ্রাম শহর শাখা ছাত্রসংঘের সভাপতি ছিলেন এবং সেই সূত্রেই তিনি চট্টগ্রামে আলবদর বাহিনীর নেতার দায়িত্ব পান। ৭ নভেম্বর দলে পদোন্নতি পেয়ে তিনি পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের প্রাদেশিক কার্যকরী পরিষদের সদস্য এবং পূর্বপাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের সাধারণ সম্পাদক হন। ওই সময় ছাত্রসংঘের সভাপতি ছিলেন ফাঁসি কার্যকর হওয়া আরেক যুদ্ধাপরাধী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ। মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোয় রাজাকার, আলবদর ও আলশামস বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ডার হিসেবে মীর কাসেম চট্টগ্রাম অঞ্চলে সরাসরি মানবতাবিরোধী অপরাধে যুক্ত হন।

তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, মীর কাসেমের নির্দেশে চট্টগ্রামের টেলিগ্রাফ অফিস সংলগ্ন ডালিম হোটেলে রাজাকার বাহিনীর বন্দিশিবির খোলা হয়েছিল। বিজয়ের একদিন পর ১৭ ডিসেম্বর ডালিম হোটেল থেকে ৩৫০ জন বন্দির লাশ উদ্ধার করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, বুদ্ধিজীবী হত্যার তালিকা প্রণয়নকারীদের অন্যতম নায়ক ছিলেন মীর কাসেম।-যুগান্তর






মন্তব্য চালু নেই