মেইন ম্যেনু

দেশের প্রথম অত্যাধুনিক ‘ই-লাইব্রেরী’

সাফাত জামিল শুভ, চবি প্রতিনিধি: সৃষ্টির সেই আদিকাল থেকে আজ পর্যন্ত সভ্যতার এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় একের পর এক কীর্তিস্তম্ভ গড়ে তুলেছে মানুষ, সমৃদ্ধ হয়েছে নানা অর্জনে। মানুষের চিরন্তন কীর্তির তালিকায় এমনই একটি অসাধারণ অর্জন- ‘গ্রন্থাগার’। জ্ঞানের কাঠামোবদ্ধ সংরক্ষণ এবং এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে জ্ঞানের নিরবিচ্ছিন্ন প্রবাহ নিশ্চিত করেছে গ্রন্থাগার।

ডিজিটাল বাংলাদেশের গড়ার অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারকে “ই-লাইব্রেরী”তে রুপান্তর করা হচ্ছে শীঘ্রই।অপরদিকে “ইনোভেশন আইসিটি সেন্টারে”র উদ্যোগে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রায় পাঁচ একর জায়গা জুড়ে একশত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হচ্ছে অত্যাধুনিক আইসিটি পার্ক।

দেশের সর্বমোট ১২৯ টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সর্বপ্রথম প্রতিষ্ঠান হিসেবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে “ই-লাইব্রেরী” স্থাপন করার ঘোষণা দিয়েছেন- তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক।সম্প্রতি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শনকালে “দক্ষ মানবসম্পদ তৈরী ও কর্মসংস্থানের সুযোগ” শীর্ষক এক সেমিনারে এসব তথ্য জানান তিনি। “ই-লাইব্রেরী” দ্রুত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় কাজ শুরু করেছে বলে জানা যায়।

গবেষণাধর্মী জ্ঞান আহরণের উর্বর ক্ষেত্র চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সুনাম-খ্যাতি অতীত থেকেই দেশে বিদেশে ছড়িয়ে আছে। ফলে এ গ্রন্থাগারটি অর্জন করেছে দেশের অন্যতম সমৃদ্ধ একটি গ্রন্থাগারের মর্যাদা। জানা যায়,ই-লাইব্রেরির প্রথম ধাপেই থাকবে ডিজিটাল ক্যাটালগ। যারা লাইব্রেরিতে বই খুঁজতে যান, তারা নিশ্চয় ক্যাটালগ কার্ড দিয়ে বই খোঁজার চেষ্টা করেছেন। সনাতন কাগজের কার্ডগুলো রূপান্তরিত হচ্ছে ডিজিটাল কার্ডে, অর্থাৎ বইয়ের তথ্যগুলো,যেমনঃ- বইয়ের নাম, লেখক, প্রকাশক, বছর ও অন্যান্য তথ্য থাকবে ডিজিটালে। এর ফলে খুব সহজেই কাঙ্খিত বইটি খুঁজে পাওয়া যাবে ক্যাটালগ কার্ডে।

বাংলাদেশের সমৃদ্ধ এবং দৃষ্টিনন্দন গ্রন্থাগারগুলোর মধ্যে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার শীর্ষস্থানীয়। দক্ষিণাঞ্চলে পুস্তকের সর্ববৃহৎ সংগ্রহশালা হিসেবে এটি জ্ঞান বিতরণে রেখে যাচ্ছে অনন্য ভূমিকা। বর্তমান এ গ্রন্থাগারের সংগ্রহ সংখ্যা প্রায় ৪ লক্ষ, যার মধ্যে রয়েছে দুর্লভ বই,দেশ-বিদেশি জার্নাল, অডিও-ভিজ্যুয়াল উপাদান, পান্ডুলিপি এবং অন্ধদের জন্য বিশেষ ব্রেইল বইয়ের সংগ্রহ।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সূচনাকাল ১৯৬৬ সালের ১৮ই নভেম্বর ১২০০ বর্গফু্টের একটি কক্ষে মাত্র ৩০০টি বই নিয়ে এ গ্রন্থাগারের যাত্রা শুরু হয়। এরপর ১৯৬৮ সালে বর্তমান প্রশাসনিক ভবনের দক্ষিণ পাশে, মানবিক ও সমাজ বিজ্ঞান অনুষদের ওপর প্রায় ১৪ হাজার বই নিয়ে অত্যন্ত ক্ষুদ্র পরিসরে চালু হয়েছিল এটি।পরবর্তীতে চাকসু ও আইটি ভবনের মধ্যবর্তী স্থানে এটি স্থায়ীভাবে স্থানান্তরিত হয় ১৯৯০ সালে।এটি প্রায় ৫৭ হাজার বর্গফুট আয়তনের মোজাইক ফ্লোর বিশিষ্ট সুবিশাল আধুনিক ভবন।

বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারের মনোরম স্থাপত্যশৈলী সহজেই নজর কাড়বে সবার, যেখানে রয়েছে অনুষদভিত্তিক পাঠকক্ষ এবং প্রতিটি কক্ষের সাথে শিক্ষকদের জন্য পৃথক পাঠকক্ষ। তাছাড়া এমফিল এবং পিএইচডি গবেষকদের জন্য রয়েছে ২৪টি গবেষণাকক্ষ ও সেমিনারের জন্য রয়েছে একটি সুপরিসর অডিটোরিয়াম।

পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন প্রশাসনিক ধাপে ঐতিহ্যবাহী এ গ্রন্থাগারটি পরিচালিত হয়, যথা- #সংস্থাপন শাখা (যাবতীয় প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম এই শাখার থেকে সম্পাদন করা হয়), #সংগ্রহ শাখা (স্থানীয় এবং বিদেশি বই ও সাময়িকি, পত্রিকা ইত্যাদি সংগ্রহ এই শাখা পরিচালনা করে।#বাঁধাই শাখা(বই, সাময়িকি পত্র, গবেষণা পত্র ইত্যাদি বাঁধাইয়ের কাজ এই শাখায় করা হয়), #প্রক্রিয়াকরণ শাখা (বাঁধাই কার্যক্রম সমাপ্তির পর সংযোজন প্রক্রিয়া শুরু হয়,এরপর সূচীকরণ, শ্রেণীকরণ, টাইপ এবং স্পাইন ইত্যাদি) #বই ইস্যু শাখা (এই শাখা থেকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মচারী এবং গবেষকদের বই ইস্যু এবং ফেরত নেয়া হয়)।

এ গ্রন্থাগারে সংগৃহীত মূল্যবান উপকরণাদিকে পাঁচটি ভিন্ন আঙ্গিকে সাজানো হয়েছে, যেমনঃ প্রধান সংগ্রহ, জার্নাল সংগ্রহ, রেফারেন্স সংগ্রহ, প্রশাসনিক থিসিস সংগ্রহ, দূষ্প্রাপ্য এবং পাণ্ডুলিপি শাখা। জার্নাল শাখায় দেশী-বিদেশী সম্প্রতিককালে প্রকাশিত সাময়িকী ছাড়াও পুরাতন সংখ্যাগুলো বাঁধাই করে ডিডিপি পদ্ধতিতে সাজিয়ে রাখা হয়েছে, যেখানে স্থান পেয়েছে প্রায় ৩২ হাজার বাঁধাইকৃত সাময়িকী। রেফারেন্স শাখায় রয়েছে গবেষণা রিপোর্ট, বিশ্বকোষ অভিধান, হ্যান্ডবুক, ম্যানুয়েল, পঞ্জিকা, গ্লোব, এনজিও প্রকাশনা,ইউনেস্কো, বিশ্বব্যাংক আইএমএফ, ইউনিসেফ প্রকাশনা। উল্লেখ্য বৃহৎ এ পুঁথিশালায় দেশী-বিদেশী বই-পত্রিকা সংখ্যায় প্রায় দুই লাখেরও বেশি, যার মধ্যে পনের হাজার জার্নাল এবং দুই হাজার গবেষণাপত্র রয়েছে।

পুঁথি সংগ্রাহক আবদুস সাত্তার চৌধুরীর সংগ্রহ করা দুর্লভ উপকরণের ভিত্তিতে গড়ে উঠা “দূষ্প্রাপ্য ও পাণ্ডুলিপি শাখা”য় উচ্চতর গবেষণার জন্য প্রাচীন লিপি,দূর্লভ দলিলসহ গুরত্বপূর্ণ উপাদান সংরক্ষিত রয়েছে। এ বিশেষ শাখাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারকে নিয়ে গেছে এক অনন্য উচ্চতায়।এদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অনেক দুর্লভ উপাদান এখানে লুকায়িত আছে। ঐতিহাসিক এবং শত বছরের পাণ্ডুলিপির বিশাল সমাহার দেখতে প্রতি বছর পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঐতিহাসিক ব্যক্তিরা আগ্রহভরে পরিদর্শন করতে আসেন এ গ্রন্থাগার।”নিম্ন বর্ণের ইতিহাস” নিয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী বইয়ের লেখক ও প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ- গৌতম ভদ্র বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন করতে এসে অভিভূত হয়ে এ প্রসঙ্গে বলেছিলেন, “চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে ‘দূষ্প্রাপ্য ও পাণ্ডুলিপি’ শাখায় এমন কিছু উপাত্ত আছে যা পৃথিবীর অন্য কোন লাইব্রেরিতে নেই।” বিরল উপকরণ সম্বলিত এ শাখায় রয়েছে প্রাচীন ভূজপত্র, তানপত্র, হাতে তৈরি তুলট কাগজ, তালপাতা ও বাঁশখণ্ডের উপর বাংলা, সংস্কৃত, পালি, আরবি, ফারসি এবং উর্দু ভাষায় রচিত ৫৬৫টি পাণ্ডুলিপি, যেগুলো আড়াইশ থেকে একশ বছরের মধ্যে অনুলিখিত। উল্লেখ্যযোগ্য- দৌলত উজির খানের “লাইলি মজনু”, দুর্লভ কোরান, হাদিস, ফেকাহ শাস্ত্র, সংস্কৃত ভাষায় কলহনের লেখা রাজতরঙ্গিনী, রাজা রামমোহন রায়ের ব্যাকরণ বই, আবুল ফজলের আকবরনামা,সফর আলি বিরচিত ‘‘গোলে হরমুজ খান’’, গয়াস বিরচিত ‘‘বিজয় হামজা’’, জিন্নত আলী রচিত ‘‘মনিউল বেদায়াত’’, হামিদুল্লাহ খাঁ রচিত ‘‘ধর্ম বিবাদ’’, পরাগল খাঁ রচিত ‘‘মহাভারত’’ ইত্যাদি।এছাড়াও এ-শাখায় প্রায় দুই শতাধিক পুরানো ছাপা পুঁথি রয়েছে।জ্ঞানতাপস আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, প্রফেসর ড.আবদুল করিম, ড.আবদুল গফুর, ইবনে গোলাম নবী, বাবু কাসেম চন্দ্র, রশীদ আল ফারুকী এবং ড.ভূঁইয়া ইকবালের প্রদত্ত সংগ্রহগুলো এ শাখাকে করেছে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ২০০৯ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস সংবলিত দুর্লভ বই ও জার্নালের সমন্বয়ে সঠিক ইতিহাস চর্চাকেন্দ্র হিসেবে “মুক্তিযুদ্ধ কর্নার” চালু করা হয় এ গ্রন্থাগারে।বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধ কর্নারে মোট বইয়ের সংখ্যা প্রায় ১১৩০টি।

যুগোপযোগী এ উদ্যোগের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বিশ্বখ্যাত বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের “ই-লাইব্রেরী”গুলোর বই পড়তে পারবে। ফলে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা সহজেই ই-লাইব্রেরি ব্যবহার করতে পারবেন এবং তাদের গবেষণা আরো সমৃদ্ধ এবং নির্ভুল হবে।

উল্লেখ্য, সর্বপ্রথম নাসা ১৯৯৪ সালে ই-লাইব্রেরি শব্দটি ব্যবহার করে এবং তাদের নিজস্ব তথ্যগুলো স্ক্যান করে কম্পিউটারে ঢুকিয়ে ডিজিটাল লাইব্রেরি চালুর সিদ্ধান্ত নেয়। তথ্যপ্রযুক্তি লাইব্রেরির মূল কাঠামোর সাথে সংযুক্ত হয়ে লাইব্রেরিগুলোতে একটি নতুন মাত্রা যোগ হচ্ছে, যার নাম ই-লাইব্রেরি (e-library) বা ই-পাঠাগার। সাধারণ পাঠাগারের সাথে তথ্যপ্রযুক্তির সুবিধাগুলোকে ব্যবহার করে লাইব্রেরির কাজগুলো আরো দ্রুত ও যেকোনো জায়গা থেকে লাইব্রেরির বই পড়ার সুবিধাগুলো ভোগ করাই এর উদ্দেশ্য।






মন্তব্য চালু নেই