মেইন ম্যেনু

‘ধর্ষকদের’ নিয়ে যা বললেন সেই তরুণী

ঘটনার সময় ওরা মদ্যপ ছিল, ওদের কথায় রাজি না হওয়ায় আমাদের চড়-থাপ্পড় মারতে থাকে। ওদের অনেক অনুরোধ করছিলাম আমাদের ছেড়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু ছাড়া পাইনি। বনানীর রেইনট্রি রেস্টুরেন্টে ধর্ষণের শিকার দুই তরুণীর একজন এভাবেই সেদিনের ‘ভয়াবহ ঘটনা’ নিয়ে কথা বলেছেন।

রবিবার (৭ মে) রাতে ওই তরুণী এ প্রতিবেদকের কাছে সেই ভয়াল রাতের কথা বলেন। নির্যাতনের শিকার ওই তরুণী বলেন, ‘কেবল ধর্ষকদের শাস্তি চাই আমরা। নিজেদের পরিবারকে সমাজের কাছে বিব্রত করতে চাইনি বলেই এতদিন আইনের আশ্রয় নেইনি।’

সেদিনের ঘটনা সম্পর্কে তিনি আরও বলেন, ‘ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের কাজ করতে গিয়ে আমাদের এক বন্ধু সাদমান সাকিফের মাধ্যমে ওদের সঙ্গে পরিচয়। ওদের অনেক অনুরোধের পর আরও দুই বন্ধুকে নিয়ে সেখানে গিয়েছিলাম। যেখানে আমাদের সঙ্গে একটা ছেলে বন্ধু রয়েছে সেখানে এমন কিছু হতে পারে আমরা ভাবতেই পারিনি। ওরা আমাদের বলেছিল, রেইনট্রি রেস্টুরেন্টের ছাদে সাদাফের জন্মদিনের অনুষ্ঠান হবে। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পরে আমাদের ভালো লাগেনি। আমরা চলে আসতে চাই। তখন ওরা আমাদের ছেলে বন্ধুটিকে অনেক মারধর করে, আমাদের রুমে নিয়ে যায়। ওরা সাইকো ছিল।’

তিনি বলেন, ‘অনেক অনুরোধ করি আমাদেরকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য, তখন নাঈম আমাদের একজনকে থাপ্পড় মারে, অনেক মারে। আমাদের ফোন আর ঘড়িও ওরা নিয়ে নেয়, কারও সঙ্গে যোগাযোগ করার উপায় ছিল না। ঘটনাগুলো এমনভাবে হয়েছে যে কিছুই বুঝতে পারিনি। আমাদের পূর্ব পরিচিত সাদমান সাকিফ ওদের সঙ্গে পরিকল্পনা করেই আমাদেরকে ওখানে নিয়ে যায়, সে একবার রুমে এসে আমাদের অবস্থাও দেখে যায়। কিন্তু আমাদের জন্য কিছু করেনি। পারতো পুলিশকে জানাতে। এমনকি পরে সেসব অস্বীকার করেছে। সাফাত, নাঈম আর আমরা দু’জন একসঙ্গে বসেছিলাম, ওদেরকে কতভাবে অনুরোধ করেছি, কিন্তু ওরা কথা শোনেনি। অনেক ড্রাংক ছিল।’

সাফাতের ড্রাইভার বিল্লাল সব ভিডিও করেছে। তবে সেই রাতে নাঈম সবকিছু করেছে, সেই সবচেয়ে বেশি নোংরামি করেছে। আর নাঈমের দেখাদেখি সাফাতও তাই করেছে। তবে ওদের বিরুদ্ধে কথা না বললে, এমন ঘটনা আরও ঘটতে থাকবে, ওদের অনেক ক্ষমতা সেই ক্ষমতার কারণেই তারা সবকিছু করে। এমনও শুনেছি, তারা বনানী থানাকে কয়েক লাখ টাকা দিয়েছে, যার কারণে থানা আমাদের থেকে মামলা নিতে চায়নি।

তিনি বলেন, ‘আমরা তো অভিযোগ করেছি, এখন তারাই বলুক তারা সেদিন রাতে কী করেছে।’

এতদিন পর কেন ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য গেলেন-জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ঘটনার পর আমরা ভয়ে ছিলাম। সাহস করে যেতে পারছিলাম না। আমি যেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তখন কারও কাছে সহযোগিতা পাইনি। সবাই যদি এক না হয় তাহলে অভিযোগ করতে পারি না। এত ধনী মানুষের বিপক্ষে মামলা করে জেতার মতো পরিবারও আমাদের না। তাই চাইনি আমার পরিবার এতে জড়িয়ে পড়ুক। আমাদের যা হওয়ার হয়েছে। কিন্তু পরিবারকে বিব্রত করতে চাইনি। এ কারণেই এতদিন চুপ করেছিলাম। যখনই অনেকের কাছে শুনতে পেলাম তারা সেদিনের ঘটনার কথা জেনেছে, তখনই আইনের আশ্রয় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘ঘটনার পর থেকেই তারা ফোন করে হুমকি দিয়েছে, মেসেজ দিয়েছে। ঘটনার কথা আমরা কাউকে বললে তারা আমাদের খুন করে ফেলবে- এমন হুমকিও দিয়েছে। বলেছে, তারা অনেক অপরাধ করেছে যেগুলোর কোনও বিচার হয়নি। যখনই তারা চাইবে তাদের সঙ্গে মিট করতে হবে। তাতে আমরা রাজি হইনি। তারপর থেকেই তাদের অত্যাচার শুরু হয়।’

নির্যাতনের শিকার ওই তরুণী বলেন, ‘সেদিনের রাতের ভিডিও আমাদের বন্ধুদের কাছে ছড়িয়ে পড়েছে বলেও জানতে পারি। এছাড়া তারা বলতে থাকে, তোমাদের ভিডিও রয়েছে, সেগুলো ভাইরাল করে দিলে পরিবার আর সমাজে মুখ দেখাতে পারবে না। আমি বলেছিলাম, ভিডিও আছে তো কী হয়েছে, সেখানে তোমাদের ছবিও রয়েছে। কিন্তু ওরা বলে, নিজেদের ছবি তারা এমনভাবে এডিট করে দেবে যেন বোঝা না যায়। শুধু আমাদের ছবি-ই থাকবে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা ভিকটিম অথচ ওরা আমাদেরই অপরাধী বানাচ্ছে। তাই শেষ পর্যন্ত আইনের কাছে গিয়েছি। আমি জানি, ফরেনসিক প্রতিবেদনের জন্য অনেক দেরি হয়ে গেছে। আগে ভয়ে চুপ করেছিলাম। তবে আর চুপ করে থাকতে চাই না। সেটা আর সম্ভব না। ওদের মতো জানোয়ারের কাছ থেকে কোনও আমন্ত্রণ পাওয়া যে কতটা যন্ত্রণাদায়ক, সেটা কেবল আমরাই বুঝতে পারছি। এটা অন্য কারও পক্ষে বোঝা সম্ভব না।’

তিনি বলেন, ‘গণমাধ্যমগুলো আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম, বাসার ঠিকানা প্রকাশ করেছে। তারা কি জানে এর ফলে দুটি পরিবারকে কিসের ভেতর দিয়ে যেতে হবে? আমরা কিভাবে বাঁচবো? আমাদের সমাজ ধর্ষণের ঘটনা ঘটলে মেয়েদের দোষই খোঁজে। আমাদের ক্ষেত্রেও সেটাই করা হচ্ছে। মানছি, আমাদেরও দোষ ছিল, কিন্তু আমি তো ধর্ষণের শিকার হতে চাইনি। একটি মেয়ে ‘না’ বলেছে, মানে ‘না’। কিন্তু সমাজ এটা বুঝছে না।’

প্রসঙ্গত, গত ২৮ মার্চ পূর্বপরিচিত সাদাত আহমেদ ও নাইম আশরাফ ওই শিক্ষার্থীদের জন্মদিনের দাওয়াত দেয়। ওইদিনই তারা ওই ছাত্রীদের বনানীর কে ব্লকের ২৭ নম্বর সড়কের ৪৯ নম্বর ‘দ্য রেইনট্রি’ নামের একটি হোটেলে নিয়ে যায়। সেখানে জন্মদিনের অনুষ্ঠান চলার সময় দুই তরুণীকে হোটেলের একটি কক্ষে আটকে রেখে মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে পালাক্রমে ধর্ষণ করে বলে মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়। পরদিন বিষয়টি জানাজানি হলে হত্যার পর লাশ গুম করার ভয় দেখিয়ে তাদের বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পরে দুই তরুণী তাদের বাসায় ফিরে আসেন। প্রথমে ভয়ে বিষয়টি কাউকে না জানালেও পরে পরিবারের সঙ্গে কথা বলে তারা মামলা করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু আসামিরা প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান হওয়ায় বনানী থানা পুলিশ প্রথমে তাদের মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানায়।






মন্তব্য চালু নেই