মেইন ম্যেনু

ধর্ষিতাকে বিয়ে করলে ধর্ষক খালাস; আদালতের রায়

ধর্ষণ করলে তার শাস্তি অনিবার্য। প্রত্যেকটি দেশেই এর শাস্তি নিযে ভিন্ন ভিন্ন আইন আছে। কিন্তু সম্প্রতি ভারতের দুটি উচ্চ আদালত ধর্ষণ নিয়ে যে রায় দিয়েছে তা নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়েছে। তবে বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টে গেলে দেশের সর্বোচ্চ আদালত হাইকোর্টের রায়কে সরাসরি খারিজ করে দেয়৷

ধর্ষণ মামলায় ভারতের মধ্যপ্রদেশ এবং তামিলনাড়ু রাজ্যের হাইকোর্ট নিজেদের রায়ে সালিশির ওপর জোর দিয়ে ধর্ষক ও ধর্ষণের শিকার নারীর মধ্যে মিটমাট করে নেবার কথা বলেছেন৷ যেমন ধর্ষিতাকে যদি ধর্ষক বিয়ে করে বা উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেয়, তাহলে ধর্ষকের শাস্তি অনেক লঘু করে দেয়া অন্যায় নয়!

ধর্ষণের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় এক ব্যক্তিকে সাত বছরের কারাদণ্ড এবং জরিমানার আদেশ দিয়েছেল তামিলনাড়ু রাজ্যের মহিলা আদালত৷ কিন্তু সম্প্রতি মাদ্রাজ হাইকোর্টের বিচারপতি ডি. দেবদাস সেই ধর্ষককে জামিনে মুক্তি দিয়েছেন, যাতে ধর্ষক এবং ধর্ষিতা স্বামী-স্ত্রী হিসেবে একসঙ্গে থাকতে পারে৷ বিচারপতি জানান, সাত বছর আগে ঐ ব্যক্তি ১৫ বছরের একটি কিশোরীকে ধর্ষণ করে৷ আর সেই বলাত্কারের ফলেই মেয়েটি গর্ভবতী হন এবং একটি কন্যা সন্তানের জন্ম দেন৷

বর্তমানে ২২ বছরের ঐ ধর্ষিতা তাঁর কন্যাসন্তানকে নিয়ে মায়ের কাছে থাকেন৷ কয়েক মাস আগে, অপরাধী মাদ্রাজ হাইকোর্টে আপিল করলে হাইকোর্ট তাকে জামিনে মুক্তি দেয়৷ উদ্দেশ্য, ধর্ষিতা মেয়েটিকে বিয়ে করে অপরাধীকে তার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করার সুযোগ দেয়া৷ জেলে থাকলে অপরাধী সেই সুযোগ পাবে না৷ বিচারপতির মতে, বহু বড় বড় মামলা বা বিতর্কের সমাধান করা সম্ভব হয়েছে মিটমাট করে বা সমঝোতার মাধ্যমে৷

ভারতের জাতীয় ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের অর্ধেকেরও বেশি বাচ্চা যৌন নিগ্রহের শিকার৷ তবে সবচেয়ে ভয়ংকর সত্য হলো, নাবালিকা বা শিশুর ওপর যৌন হেনস্থার ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটছে পরিবারের মধ্যে, পরিবারেরই কোনো মানসিক বিকারগ্রস্ত সদস্যের হাতে৷ তাই সে সব ঘটনা পুলিশের কাছে পৌঁছাচ্ছে না, হচ্ছে না কোনো ডাইরি অথবা মামলা৷

এক্ষেত্রে কুমারী মায়ের জারজ সন্তান তাঁর পিতৃত্বের পরিচয় পাবে৷ বিচারপতির কথায়, ‘‘নিষ্পাপ শিশুটির তো কোনো দোষ নেই৷” উল্লেখ্য, এর আগে অনুরূপ একটি ধর্ষণের মামলায় একই রায় দিয়েছিলেন মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের হাইকোর্ট৷

এ ধরণের রায়ে নারী সংগঠনগুলি তথা গোটা সমাজ স্তম্ভিত, বিস্মিত সুপ্রিম কোর্টও৷ বিতর্কিত এই রায় উল্টে দিয়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালত হাইকোর্টগুলোর মধ্যে যেভাবে ধর্ষণের মামলাকে লঘু করে দেয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তার কঠোর সমালোচনা করে৷ সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি দীপক মিশ্রের নেতৃত্বাধীন ডিভিশন বেঞ্চ মনে করে, বিয়ে করে নেয়া বা মিটমাট করে নেয়া সাজা কমানোর ভিত্তি হতে পারে না৷ এক্ষেত্রে নরম মনোভাব নিলে সেটা হবে ধর্ষিতা, তথা সমাজের প্রতি চরম অবিচার৷

এরসঙ্গে নারীর মান-সম্মানের প্রশ্ন জড়িত৷ তাঁর কথায়, ‘‘নারীর দেহ ও মনের শুচিতা বিনিময়যোগ্য পণ্য হতে পারে না৷” তাই অন্য ক্ষেত্রে মিটমাটের সুযোগ থাকলেও, খুন বা ধর্ষণের মতো অপরাধের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয়৷ কাজেই সুপ্রিম কোর্টের মতে, ধর্ষণের মামলার সালিশি বা মিটমাট করার আইনি বৈধতা নেই৷ এ কারণেই ২০১৩ সালে ভারতীয় ফৌজদারি দণ্ডবিধির ৩৭৬ ধারা সংশোধন করা হয়৷

আনন্দের কথা, সুপ্রিম কোর্টের ঐ রায়ের পর মাদ্রাজ হাইকোর্টও তার বিতর্কিত সিদ্ধান্তটি ফিরিয়ে নিয়েছে৷ মাদ্রাজ হাইকোর্টের মনোভাব আপাত সদিচ্ছামূলক হলেও এই রায়ের সামাজিক অভিঘাত গভীর এবং সুদূরপ্রসারী৷ দেশের অন্যান্য আদালতে চলতে থাকা ধর্ষণ মামলায় তা প্রভাব ফেলতে পারে৷ এ বিষয়ে মৌলিক প্রশ্ন তুলেছে নারী সংগঠনগুলি৷

নারী নির্যাতন সম্পর্কে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নতুন রিপোর্ট বলছে, বিশ্বের প্রায় এক তৃতীয়াংশ নারী যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন অহরহ৷ তার ওপর পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধের যেসব পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে, সেটাও যথার্থ নয়৷ এছাড়া বিশ্বের মোট নারীর ৭ শতাংশ নাকি জীবনের যে কোনো সময় ধর্ষণের শিকার হয়েছেন৷

তাদের মতে, নারীর আত্মমর্যাদা বা তাঁর শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা অথবা ইচ্ছা-অনিচ্ছা বিকিয়ে দেয়া ছাড়াও, এতে ধর্ষকদের কি আশকারা দেয়া হচ্ছে না? অর্থাৎ এক কথায়, বলাত্কারের পর ধর্ষিতা মেয়েটিকে বিয়ে করে নিলেই সব ঝামেলা কি চুকে যায়? এর থেকে নারীসত্তার অপমান আর কী হতে পারে? বলাত্কারের পর মেয়েটিকে বিয়ে করার ইচ্ছার মধ্যেই যে একটা বদমায়েশি লুকিয়ে নেই, কে বলতে পারে?

মেয়েটির পরিবারকে টাকা-পয়সা দিয়ে রাজি করানোর জন্য চাপ সৃষ্টি করার মতো একটা ধান্দাবাজি যে কাজ করবে না, কে বলতে পারে? সবথেকে বড় কথা, যে ব্যক্তির দ্বারা একটি নাবালিকা বা সাবালিকা মেয়ে দৈহিক বা মানসিকভাবে ক্ষত-বিক্ষত হয়েছেন, তাঁর ধ্বস্ত দেহমনে যে ভয় বা ঘৃণা বাসা বেধেঁছে, স্বামী হবার পর তার প্রতি ভক্তি, শ্রদ্ধা, ভালবাসার বদলে সেই ঘৃণা ও ভয় সারাজীবন কি তাঁকে কুরে কুরে খাবে না?

পাশাপাশি সমাজের একাংশ আবার এটাও মনে করে যে, মেয়েটি যদি খুব গরিব ঘরের অশিক্ষিত মেয়ে হন, তাহলে ধর্ষণের ফলে যে সামাজিক কলঙ্কের কাদা তাঁর গায়ে লেপ্টে গেল, তার জন্য ভবিষ্যতে অন্য কেউ তাঁকে বিয়ে করবে না৷ নিজের এবং অবৈধ সন্তানের জীবন আর্থ-সামাজিক দিক থেকে যে আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠবে না, কে বলতে পারে?

আত্মহত্যাই হয়ত হবে তার শেষ পরিণতি৷ যুক্তির দিক থেকে হয়ত এটা গ্রাহ্য নাও হতে পারে, কিন্তু জীবনের বাস্তবতা অনেক সময় তা মেনে চলে না৷ কাজেই ধর্ষক যদি প্রকৃতই তার কাজের জন্য অনুতপ্ত হয় এবং স্বীকার করে যে মুহূর্তের দুর্বলতায় সে ঐ কাজ করে ফেলেছে এবং ধর্ষিতা যদি ব্যক্তিগতভাবে সেটা বিশ্বাস করে, তাহলে মেয়েটি ধর্ষককে ক্ষমা করলেও করতে পারে।






মন্তব্য চালু নেই