মেইন ম্যেনু

নার্সিসিজমে ভুগছেন না তো!

ইদানিং ‘নার্সিসিস্ট’ এবং ‘নার্সিজম’ শব্দ দুটি শুনেছেন অনেকেই। বিশেষত আধুনিক ট্রেন্ড ‘সেলফি’য়ের সঙ্গে এই শব্দ দুটি জড়িয়ে গেছে।

মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক একটি ওয়েবসাইটে জানানো হয় ‘নার্সিসিজম’ এক ধরনের মানসিক সমস্যা। এক্ষেত্রে নিজেকে বড় মনে করা বা আত্ম-অহংকার থেকেই এই সমস্যার সূত্রপাত। ২০০৯ সালে এই সমস্যা নিয়ে গবেষণা করেন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষজ্ঞরা।

‘নার্সিসিজম’ শব্দ এবং ধারণার উৎপত্তি গ্রিক পুরাণের দেব-দেবীর কাহিনি থেকে।

স্বর্গরানি হেরাকে গল্প শুনাতো তার আজ্ঞাবহ প্রকৃতি দেবী একো। গল্প শুনে হেরা এতটাই মুগ্ধ হতেন যে তার সময় কেটে যেত। এই ফাঁকে তার ভাই ও স্বামী দেবরাজ জিউস প্রমোদে মত্ত হতেন পাহাড়ে, জঙ্গলে থাকা অন্য দেবীদের সঙ্গে। এক সময় স্বামীর এসব কীর্তি সম্পর্কে হেরা আঁচ করতে পারলেন এবং ক্ষুব্ধ হলেন একোর উপর। কারণ একো তাকে গল্প শোনায় ব্যস্ত রেখে জিউসকে সুযোগ করে দিত।

তাই শাস্তি স্বরূপ হেরা একো’র কথা বলার শক্তি কেড়ে নিলেন। এরপর শুধু অন্যের কথার শেষটুকু প্রতিধ্বনি করতে পারে সে। এদিকে ঘটল আরেক কাহিনি। নদী-দেবতা কিফিসস’য়ের ছেলে নার্সিসাস হরিণ শিকারে বেরিয়েছেন। দুপুর রোদে দুরন্ত এক হরিণকে ধাওয়া করার এক পর্যায়ে একো’র নজরে পড়েন তিনি। নার্সিসাসের প্রেমে পড়ে যান একো। তবে আত্ন-অহংকারী নার্সিসাস প্রত্যাখান করেন একোকে।

আর এতে প্রতিশোধের দেবতা নেমেসিস শাস্তি দিলেন এই অহংকারীকে। কী সেই শাস্তি?

শিকারের পেছনে ছুটে ক্লান্ত এবং তৃষ্ণার্ত নার্সিসাস এক ঝরনা কাছে এলেন। পানিতে নিজের প্রতিকৃতি দেখে এমনই সম্মোহিত হলেন যে, ওখানেই পড়ে রইলেন। তিনি বুঝতেই পারলেন না যে এটা তার নিজেরই চেহারা। একসময় ওখানেই ডুবে মরলেন। আর ওই জলের ধারে জন্ম নিল ফুলের এক গাছ। ফুলের নাম নার্সিসাস।

পুরানের এই ঘটনা থেকেই ইংরেজি নার্সিসিজম শব্দের জন্ম। এর মানে নিজের সৌন্দর্য আর সক্ষমতার অতিশায়িত অনুভূতি যা নিজের প্রতি নিমগ্নতা তৈরি করে। এক কথায় একে অতিশয় আত্নপ্রেম বলা যেতে পারে।

বিজ্ঞানীরা আরেক নতুন কথা শুনাচ্ছেন এখন। সেটি হল, ঘণ্টায় ঘণ্টায় যারা ফেইসবুকে সেলফি আপলোড করেন তারাও এক ধরণের নার্সিসিস্ট।

লাইফস্টাইলবিষয়ক একটি ওয়েবসাইটে নার্সিসিজমের কিছু লক্ষণ উল্লেখ করা হয়। ওই দিকগুলো এই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হল।

আকর্ষণের কেন্দ্রে থাকতে পছন্দ করেন!: সাইকোথেরাপিস্ট এবং ‘দ্য নারসিসিস্ট’ বইয়ের লেখক জোসেফ ব্রুগ, পিএইচডি বলেন, “কিছু মানুষ আছেন যারা নিজেদের নিয়ে কথা বলতে পছন্দ করেন। যে কোনো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে চান এবং বেশিরভাগ সময়ই কিছুটা বাড়িয়ে বলতে পছন্দ করেন। তারাই মূলত এ সমস্যায় ভুগছেন।”

উপদেশ দিতে পছন্দ করেন!: অন্যের উপকার করার চেষ্টা করলেও প্রতিনিয়ত উপদেশ দেওয়া খুব একটা ভালো লক্ষণ নয়। সব ক্ষেত্রে বিজ্ঞতার প্রদর্শণ করাও নার্সিসিজমের উপসর্গ।

ব্রুগ বলেন, “নার্সিস্টিদের মধ্যে সবজান্তা একটি ভাব রয়েছে। তারা সব বিষয়ের ভিতরের তথ্য জানেন এমন একটি ভাব নিয়ে থাকেন সব সময়।”

অপেক্ষা করতে অপছন্দ করেন: কোনো কিছুর জন্য অপেক্ষা করতে অথবা কেউ একবারেই আপনার ডাকে সাড়া না দিলে কি খুবই বিরক্তি অনুভব করেন!

নার্সিসিস্ট বিষয়ক দুটি বই ‘উইল আই বি গুড এনাফ?’ এবং ‘উইল আই এভার বি ফ্রি অফ ইউ?’-এর লেখক ক্যারিল ম্যাকবার্ড (পিএউচডি) বলেন, “যারা নার্সিসিজম সমস্যায় ভুগছেন, তারা যখন যা চান ঠিক ওই মুহূর্তেই তা পেতে চান। অপেক্ষা করা তাদের অতি অপছন্দের।”

উচ্চাকাঙ্ক্ষা: নার্সিসিজমে যারা ভুগছেন তারা আকাশচুম্বি স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসেন। নিজেকে অনেক সফল হিসেবে কল্পনা করা তাদের প্রিয় কাজ।

“নিজেদের ভবিষ্যতে অনেক সফল এবং প্রভাবশালী একজন ব্যক্তি হিসেবে কল্পনা করতে পছন্দ করেন নার্সিসিস্ট মানুষগুলো। তারা নিজেকে আর সবার থেকে বেশি ক্ষমতাবান এবং আলাদা ভাবতে ভালোবাসেন। তাছাড়া ধনী হওয়ার তীব্র ইচ্ছা থাকে এদের মধ্যে।” এমনটাই বলেন ম্যাকবার্ড।

প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব: সব ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতাভাবাপন্ন হয়ে থাকেন এ ধরনের মানুষগুলো। অফিসের কাজ, খেলাধূলা ছাড়াও নিজের ঘরে এবং বন্ধু মহলে সকলের সঙ্গে এক ধরনের প্রতিযোগিতা অনুভব করেন এরা। সকলের থেকে আলাদা করে নিজেকে উপস্থাপন করতে চান নার্সিসিজমে ভুগতে থাকা মানুষগুলো, জানান ব্রুগ।

তিনি এ বিষয়ে বলেন, “অন্যের থেকে নিজেকে আলাদা এবং বড় করে তুলে ধরতে সবসময় এক ধরনের প্রতিযোগি মনোভাব পোষণ করেন নার্সিসিস্টরা।”

ভুল মানতে নারাজ!: নিজের ভুল কখনও মেনে নিতে রাজি নন নার্সিসিজমে ভুগছেন এমন মানুষগুলো। নিজের কারণে কোনো ভুল হয়ে গেলে তা ঘুরিয়ে অন্যের উপর দায় চাপিয়ে দেন তারা। ‘তোমার কারণে আমি এমন করেছি’ এমন বাক্য তাদের মুখে প্রায়ই শোনা যায়।

সুবিধাবাদী: সব সময় অন্যকে দিয়ে কাজ করিয়ে নিতে পছন্দ করে নার্সিসিস্টরা। তবে অন্যকে সাহায্যের বেলায় বরাবরই পিছিয়ে যান তারা। অন্যকে নিয়ন্ত্রণ করতে পছন্দ করে থাকেন। কারণ সবসময় নিজের কথা ভাবতেই ভালোবাসেন এই রোগে ভুগতে থাকা মানুষগুলো।






মন্তব্য চালু নেই